বাবার লাশ আর সাদা হাতাকাটা গেঞ্জিই একমাত্র স্মৃতি: তাপস

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ০৬:৩০, আগস্ট ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৫২, আগস্ট ১৫, ২০২০

শেখ ফজলুল হক মনি (ছবি: সংগৃহীত)

১৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেটের আঘাতে সপরিবারে শহীদ হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিন অন্যসব শিশুদের মতো ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে সেই বাড়িতে বাবা শেখ ফজলুল হক মনি ও মা আরজু মনি’র কোলে ঘুমিয়ে ছিলেন দুই শিশু শেখ ফজলে নূর তাপস ও শেখ ফজলে শামস পরশ। কিন্তু ঘাতকের বুলেটের আঘাত থেকে এই দুই শিশু প্রাণে বেঁচে গেলেও শহীদ হন পিতা শেখ ফজলুল হক মনি ও মা আরজু মনি। সেই বিভীষিকাময় কালো রাত্রির স্মৃতি নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। তিনি এখন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র।

বাংলা ট্রিবিউন: ১৫ আগস্ট আপনার বাবা মাসহ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে শাহাদাত বরণ করেন। সেদিনকার কোনও স্মৃতি আপনার মনে পড়ে কি?

ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস: তখন আমার বয়স ছিল পৌনে চার বছর। আমি এবং আমার বড় ভাই রাতে বাবা-মায়ের সঙ্গে একই খাটে ঘুমিয়ে ছিলাম। সেই হত্যাকাণ্ডের কোনও স্মৃতি আমার নেই। এমনকি বাবা মায়ের সঙ্গেরও কোনও স্মৃতি ঠিক মনে পড়ে না। আমার আবছা একটি স্মৃতি মনে পড়ে। সেটা হলো- বাবার লাশ। তিনি সাদা হাতকাটা একটি গেঞ্জি পরা ছিলেন। গলায় একটি খতের দাগ ছিল এবং উনাদের দুজনকে যখন নিয়ে যাওয়া হয় নিচে রক্ত জমাট ছিল। এর বেশি কিছু স্মরণ করতে পারি না। অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও আমরা ঘুমিয়ে ছিলাম। যখন গুলির শব্দে আমাদের ঘুম ভাঙে আমরা চিৎকার করি। বাবা মাকে ডাকি। তাদের খুঁজি। আমি এবং আমার বড় ভাই কোনও দিন বাবা মাকে পাইনি। সেই দুর্বিষহ সময়টার কথা যখনই চিন্তা করি তখন বেদনা বাড়ে। বিশেষ করে আগস্ট মাসটা যখন আসে মনটা ভারী হয়ে উঠে। ১৫ আগস্ট আসলে আমাদের কষ্টের দিন কাটে।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি তো তখন হাটতে পারতেন। কম বেশি কথাও বলতে পারতেন। সেদিন কি আপনার দুই ভাই আপনাদের বাবা মায়ের দাফন কাফনে অংশ নিতে পেরেছিলেন? পরিবেশটা কেমন ছিল?

মেয়র ফজলে নূর তাপস (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস: না। আমরা তো আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম। এরপর বাবা-মায়ের লাশ নিয়ে যাওয়া হলো হাসপাতালে। সেখানেও আক্রমণ করা হলো। যারা শাহাদাত বরণ করেছেন তাদের সবাইকে বনানী কবরস্থানে এক সঙ্গে দাফন করা হয়েছে। যারা খুনি ছিল তারাই সেখানে ছিল। এতে পরিবারের কেউ অংশগ্রহণ করতে পারেনি। সেখানে স্বাভাবিক কোনও জানাজা যা দাফন কিন্তু হয়নি। এমনকি বঙ্গবন্ধুকেও নিয়ে যাওয়া হলো টুঙ্গিপাড়াতে। কেউ যেন জানতে না পারে এবং জানাজায় অংশগ্রহণ করতে না পারে। সেখানেও কিন্তু একটি আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছিলো। সেই আতঙ্কের মধ্যেই তাকে দাফন করা হয়েছে। সেই সময় ওখানকার যারা ছিলেন তারা কোনও রকম তাকে একটি…। তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তিনি জাতির পিতা কিন্তু তাকে একটি সাধারণ সাবান দিয়ে কোনও রকম গোসল দিয়ে দাফন দেওয়া হয়েছিলো। তাতে অংশ নেওয়ার কোনও পরিস্থিতি ছিল না। জীবন বাঁচানোর জন্য আমাদেরকে অন্যান্য জায়গায় আশ্রয় নিতে হয়েছে। পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। বাসা ছেড়ে দিতে হয়েছে। আমাদের অস্বাভাবিক, আতঙ্কের এবং ঝুঁকিপূর্ণ জীবন ছিল। সেই দিনকার বিষয়টা যদি বলি তারা হামলা করে হত্যা করে চলে যায় ঠিকই কিন্তু পরক্ষণে তারা আবার ফিরে আসে এবং আবার আক্রমণ করে আমাদেরকে জীবন বাঁচানোর জন্য পালিয়ে যেতে হয়। আমাদের চাচাদেরও পালিয়ে যেতে হয়। বাসার পাশে অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনারের বাসা ছিল তারা কিন্তু আমাদেরকে আশ্রয় দেন। যার কারণে আমরা প্রাণে বেঁচে যাই। না হলে কিন্তু পরবর্তীতে তারা যখন আরও আক্রমণ করছিলো যদি সেখানে পেতো, যেমনি শিশু রাসেলকে হত্যা করা হয়েছিলো তেমনি আমাদেরকেও হত্যা করা হতো। এমন একটি দুর্বিষহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছিলো। পরিবারের যাকেই পাবে তাকেই হত্যা করা হবে। কোনও নারী বা শিশু সে বিষয়টিও বিবেচনায় আনা হয়নি। যেমনি লক্ষ্য করেছেন বঙ্গমাতাকেও হত্যা করা হয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: বাবা মাকে ছাড়া কীভাবে বেড়ে উঠেছেন?

ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস: অনেক কষ্ট, যন্ত্রণা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে আমাদের সময় কেটেছে। দাদি আমাদের দুই এতিম ভাইকে লালন-পালন করেছেন। আমাদের সান্ত্বনা দিয়ে বলা হতো, বাবা-মা বিদেশে কাজে গেছেন। কয়েকদিন পর তারা চলে আসবেন। এভাবেই দিন যাচ্ছিল। একটা সময় বুঝলাম, বাবা-মা আর কোনও দিন আসবেন না।

সেই সময়গুলোতে বিভিন্ন আত্মীয়ের বাড়িতে লুকিয়ে লুকিয়ে থাকতে হতো। সব সময় ভয় আর আতঙ্কের মধ্যে থাকতাম। একটা পর্যায়ে দাদি আমাদের নিয়ে ভারতে চলে যান। বছর দুয়েক পর যখন ঢাকায় ফিরে আসি তখনও ঘাতকরা সক্রিয়। ঢাকায় তখনও বঙ্গবন্ধুর পরিবার, আত্মীয়স্বজনের ওপর নানা রকমের চাপ ছিল। আমাদের বাড়ি ভাড়া দিতে চাইত না। কোনও স্কুল আমাদের বেশি দিন রাখতে চাইত না। ভর্তিও নিতো না। স্কুলের শিক্ষকদের ডেকে নিয়ে হুমকি দেওয়া হতো। স্কুল কর্তৃপক্ষও আমাদেরকে নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে থাকতো।

বাংলা ট্রিবিউন:   আজ আপনি সেই শহরের পিতা, বিষয়টা কীভাবে দেখছেন?

ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস: দেখুন যে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে সেটি ইতিহাসের জঘন্যতম অধ্যায়। আমরা প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধের বিষয় কখনও চিন্তা করিনি। আমরা চিন্তা করেছি সুষ্ঠুভাবে যাতে এই হত্যাকাণ্ডের ন্যায় বিচারটা হয়। পরবর্তীতে সেই ন্যায় বিচারের পথও আইন করে রোধ করে রাখা হয়েছিলো। তথাকথিত একটি আইন দিয়ে একটি বিচার বন্ধ করার নজির সারাবিশ্বে আর নেই। তো সেটাও করা হয়েছিলো। জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসার পরে ১৯৮১ সালে ধীরে ধীরে সংগ্রাম আন্দোলন ও ঘাত প্রতিঘাতের মাধ্যমে তার দৃঢ়তা ও ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে এই প্রতিকূলতা অতিক্রম করেছেন। ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর আমার বাবা মাসহ জাতির পিতা হত্যার বিচার কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। আমাদের জীবনে একটি বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল সেই বিচারটা যেন হয়। জাতির পিতার হত্যার বিচারটা আমরা যেন দেখে যেতে পারি। আমাদের অনেক মুরুব্বি ও অভিভাবক, যাদের আশা ছিল বিচারটি দেখে যাওয়ার। আমার সৌভাগ্য আমি সেই বিচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পেরেছি। আমার আইনজীবী হওয়ার পেছনে এটিও বড় ভূমিকা পালন করেছে। আমি আইনজীবী হিসেবে পড়াশোনা করে যখন ঢাকায় আসলাম তখন সেই বিচারের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আমি সেটার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছি। এটা আমার জীবনের একটি বড় প্রাপ্তি। জীবনের একটি আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই আমাদের ফুফু শেখ হাসিনা ও দাদি সব সময় আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন জাতির পিতার আদর্শ পালন করা, তার স্বপ্নগুলো পূরণ করা। আমি মেয়র নির্বাচিত হওয়ায় ঢাকাবাসীর সেবা করার যে সুযোগ হয়েছে সেটা যদি করতে পারি সেটাই হবে বড় প্রাপ্তি। তাদের আত্মা তখনই শান্তি পাবে আমরা যদি জনগণের জন্য কিছু করতে পারি। মূলত তারা তাদের জীবনটাই উৎসর্গ করে গেছেন বাংলার জনগণের জন্য। সেই বাংলার জনগণের জন্য যদি কিছুটা অবদান রাখতে পারি সেটাই হবে তাদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও শান্তি কামনা। এতে তারা শান্তি পাবেন। সেভাবেই আমরা বড় হয়েছি সেভাবেই আমরা শিক্ষা পেয়েছি।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি তো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার অন্যতম একজন আইনজীবী ছিলেন। এই মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে কোনও বাধার সম্মুখীন বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছিল কিনা?

ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, ছবি: সাজ্জাদ হোসেনব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস: অবশ্যই। আপনাদের হয়তো বা খেয়াল আছে ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পরে প্রধানমন্ত্রী প্রথমে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করেন। সেটা না হলে মামলাটি করা যাচ্ছিল না। সেখানে সাক্ষী পাওয়াটা খুব কঠিন ছিল। একটি কুচক্রী মহল কখনও চায়নি এই বিচারটি হোক। সব সময় আইনগত, সামাজিক ও রাজনৈতিকসহ সব রকম বাধার সৃষ্টি করেছিল। শেখ হাসিনার দৃঢ় সংকল্পের কারণে বাধাগুলো অতিক্রম করা হয়েছে। সেখানে সাক্ষী থেকে আরম্ভ করে মামলার সব বিষয়ে বাধা ছিল। ২০০১ সাল পর্যন্ত মামলাটা পরিচালিত হলো। আমরা নিম্ন আদালতে রায় পেলাম। হাইকোর্টের অনেকগুলো বেঞ্চ কিন্তু বিব্রত বোধ করলো। তারা শুনানি করতে চাইলো না। মামলাটি ফেরত দিয়ে দিল। কাল বিলম্ব করা হলো। তখন অন্য সরকার আসলো তারা এই মামলাটিকে আবার চাপা দেওয়ার চেষ্টা করলো। ২০০৯ সালে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবার নির্বাচিত হওয়ার পরেই কিন্তু মামলাটা সম্পন্ন হয়েছে। রায় কার্যকর করা গেছে। আমার সৌভাগ্য যে মাত্র পড়াশোনা শেষ করে মামলায় লড়ার সুযোগ পেয়েছি। মামলার প্রধান কৌশলী সিনিয়র অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক সাহেবের নেতৃত্বেই আমার আইনাঙ্গণে হাতেখড়ি। এই মামলার মাধ্যমেই আমার আইনাঙ্গণে পদার্পণ হয়। পরে হাইকোর্টের আপিলেট ডিভিশনেও আমি আনিসুল হক (বর্তমান আইন মন্ত্রী) সাহেবের সঙ্গে ছিলাম। এই মামলাটিও একটি ইতিহাস। দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় এতো দূর এসেছে। এর ওপরে অবশ্যই লেখা হবে। জনগণ জানতে পারবে।

বাংলা ট্রিবিউন: বাবা মাকে কোন সময়টাতে সব চেয়ে বেশি মনে পড়ে?

ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস: আসলে বাবা মায়ের কথা সব সময়ই মনে পড়ে। বিশেষ করে একটি সন্তানের কোনও অর্জন প্রাপ্তির সময় কিন্তু তাদের সান্নিধ্য সন্তান চায়। আমরা কিন্তু সেটা পাইনি। সেই শিক্ষাজীবন থেকে শুরু করে পড়াশোনার সময় ক্লাসে যদি ভালো করলাম, কিছু ভালো অর্জন হলো, খেলাধুলাতে ভালো করলাম, হয়তো বা কোনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করলাম, কিন্তু বাবা মায়ের সান্নিধ্য পাইনি। এই শূন্যতার মাঝেই বড় হতে হয়েছে। আমার সঙ্গে আমার বন্ধু-বান্ধবরা যেমন তাদের বাবা মাকে পাচ্ছে তাদের সঙ্গে আলিঙ্গন করছে, তাদের হাসি কান্নার স্মৃতি হচ্ছে। এগুলো কিন্তু আমরা পাইনি। সব সময়ই একটা শূন্যতা থাকতো।

 

 

/এমআর/এমওএফ/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ