বঙ্গবন্ধু তখন আর নেই

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ০৮:০০, আগস্ট ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১৯, আগস্ট ১৫, ২০২০

জজজ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। দিনটি ছিল শুক্রবার। অন্যান্য দিনের মতোই স্বাভাবিকভাবে ঘরে ঘরে পত্রিকা গেছে। সংবাদপত্রের পাতাজুড়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগের দিন (১৪ আগস্ট) এবং সেদিনের কর্মসূচির খবর। ১৫ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। সেই খবর প্রতিটি পত্রিকার প্রথম পাতায় পাঠকরা যখন দেখেছেন, তখন আর পৃথিবীতে বেঁচে নেই তিনি। তাকে ভোররাতে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু তখন দেশের রাষ্ট্রপতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে ১৫ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। এ নিয়ে সেদিন দৈনিক বাংলার শেষের পাতায় ছিল বিশেষ আয়োজন। বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানাতে ঢাবি কী কী প্রস্তুতি নিয়েছিল সেই বিবরণ ছিল পাতাটিতে। এর মধ্যে লেখা ছিল–আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল দিন। জাতির পিতা রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর তিনি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আরও একবার এসেছিলেন, সেদিন শুধু ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ঘটনার সঙ্গে আজকের সূচির অনেক তফাত রয়েছে। তিনি আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখবেন। তার সম্মানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভাষণ দেবেন। দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণার পর নতুনভাবে ছাত্রসমাজ যখন তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা সম্পর্কে ভাবছেন, তখন তাদের কাছে আসছেন জাতির পিতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা, দ্বিতীয় বিপ্লবের বিষয়ে ঢাবি’র সংগ্রামী ছাত্রসমাজের সামনে কথা বলবেন তিনি। আজ ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আসছেন।’

চচ১৯৭৫ সালের ১ আগস্ট থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি শুরু হয়। এ নিয়ে শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে বিপুল সাড়া পড়ে যায়। সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বিভিন্ন ছাত্রাবাসে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দুই দিন আগে বুধবার (১৩ আগস্ট) বিকালে নীলক্ষেত ক্যাম্পাস এলাকায় অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে সবাই গার্ড অব অনারের প্রস্তুতি দেখেছে। কলাভবনের চারতলা ভবন দূর থেকে দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। সাদা রঙের দেয়ালের লাল অক্ষরে বিন্যস্ত বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক, দেয়ালে দেয়ালে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি এবং ছাত্রসমাজের জন্য উচ্চারিত তার অমূল্য বাণী। বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানাতে সারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত কিছু নতুন রঙে সাজানো, পরিচ্ছন্ন আন্তরিকতা ও গভীর শ্রদ্ধায় যেন অপেক্ষমাণ। কিন্তু তাঁর শাহাদাত বরণে সেই অপেক্ষা থেকে গেলো চিরকালের।117901715_756469881845616_252416807231120400_n

বঙ্গবন্ধুর বিস্তারিত কর্মসূচি প্রকাশ

১৫ আগস্ট প্রকাশিত একটি খবরে বলা হয়, ‘জাতির জনক রাষ্ট্রপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ শুক্রবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করবেন। ঢাবি আচার্য হিসেবে এটি হবে সরকারিভাবে তাঁর প্রথম সফর। বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা জানাতে উন্মুখ হয়ে আছেন ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মচারীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদ শিক্ষকদের মাজার জিয়ারত করবেন বঙ্গবন্ধু এবং পুষ্পমাল্য অর্পণ করবেন শহীদদের মাজারে। এরপর কলাভবনে যাবেন, সেখানে স্কুলের ছোট ছেলেমেয়েরা বঙ্গবন্ধুকে পুস্পমাল্য দিয়ে বরণ করবে। তিনি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের জাদুঘর ঘুরে দেখবেন। তারপর সায়েন্স এনেক্স ভবন পরিদর্শন শেষে বঙ্গবন্ধু পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটের তথ্যাদি প্রক্রিয়ার ইউনিটে যাবেন। এরপর কার্জন হল পরিদর্শন করে টিএসসিতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মচারীদের সমাবেশে ভাষণ দেবেন বঙ্গবন্ধু।’

BT-Newবঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের অগ্রগতিতে সোয়াং চুং বিমুগ্ধ

১৫ আগস্টের পত্রিকার তথ্যানুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষ দূত সোয়াং চুং বলেছিলেন–রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের মানুষ কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি লাভ করেছে তা দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। সফর শেষে দক্ষিণ কোরিয়ায় ফিরতে রওনা হওয়ার সময় দেশটির এই বিশেষ দূত বাংলাদেশের অগ্রগতি সম্পর্কে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন।

বাসসের খবর বলছে, জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সুখী-সমৃদ্ধ জীবনের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশের মানুষ বর্তমানে যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, সেজন্য দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষ দূত সোয়াং চুং উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিজের বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশের জনগণের উদ্যোগে ভবিষ্যতে সোনার বাংলা বাস্তবায়িত হবে।’ এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের বিপুল জনশক্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান কোরীয় প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং হি’র কাছে পাঠানো বাণীতে দেশটির জাতীয় দিবস উপলক্ষে সেখানকার জনগণ ও সরকারকে ঐকান্তিক অভিনন্দন জানান।117609615_645370656108808_2241986236482414152_n

ভারতের স্বাধীনতা দিবসে বঙ্গবন্ধুর শুভেচ্ছা বাণী

১৫ আগস্টের পত্রিকায় ভারতের ২৮তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ভারতের রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলী আহমেদের কাছে পাঠানো রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এক বার্তার কথা প্রকাশিত হয়। বঙ্গবন্ধু ভারত সরকার ও জনগণকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য প্রকাশিত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল। বঙ্গবন্ধু দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের কল্যাণে উপমহাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখার জন্য এই দুই দেশের মধ্যকার বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা আরও সুসংহত হবে। ভারতের রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সুস্বাস্থ্য এবং ভারতের জনগণের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন বঙ্গবন্ধু।

১৬ আগস্ট বিকালে গণভবনে জেলা গভর্নর ও সম্পাদকদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু মিলিত হবেন বলেও একটি প্রতিবেদন ছিল সেদিনের পত্রিকায়। খবরটিতে বলা হয়, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান ও রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আগামীকাল বিকালে গণভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্নর ও বাকশালের জেলা সম্পাদকদের সঙ্গে সমাবেশে মিলিত হবেন। এতে নবগঠিত জেলাগুলোর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সুপাররা থাকবেন বলে জানানো হয়। কিন্তু সব অসম্পূর্ণ থেকে গেলো জাতির জনকের চিরবিদায়ে।

/জেএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ