যে কারণে স্থবির ভূমি ডিজিটালাইজেশন

Send
এস এম আববাস
প্রকাশিত : ০৯:০০, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:২৭, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০

ভূমি সেবাই-নামজারি থেকে শুরু করে নরসিংদী জেলা সদরের ভূমি অফিসের সব সেবা ডিজিটাল করা হয়েছে বেশ কিছুদিন আগেই। কিন্তু এখনও এনালগ সদরের ভূমি নিবন্ধন অফিস (সাব-রেজিস্ট্রি অফিস) এবং সেটেলমেন্ট জোন অফিস। ফলে এখানকার সেবাগ্রহীতারা পুরো ভূমি সেবা ডিজিটালাইজেশনের সুফল পাচ্ছেন না। একইভাবে দেশের সব ভূমি অফিস ডিজিটাল করা হয়নি। উপজেলা/থানা ভূমি ই-নাম জারি চালু হলেও সার্বিক ভূমি ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল স্বপ্নই রয়ে গেছে, বাস্তবে রূপ নিচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে পুরো ভূমি ব্যবস্থাপনা ডিজিটালাইজেশন করতে হলে তিনটি প্রশাসনকে একযোগে কাজ করতে হবে। কিন্তু মন্ত্রণালয় আলাদা হওয়ায় তা সম্ভব হচ্ছে না। উপজেলা ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং সেটেলমেন্ট জোন অফিস পরিচালিত হচ্ছে সমান পদের আলাদা তিন কর্মকর্তা দিয়ে। এক কর্তৃপক্ষ অন্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিতে পারে না বা অনুরোধ না রাখলেও কিছু করার নেই।  ফলে যে যার মতো করে চলছে। কেউ ডিজিটাল আবার কেউ এনালগ।ভূমি সেবা

প্রসঙ্গত, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে উপজেলা ভূমি অফিস ও আইন মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন অধিদফতরের অধীনে ভূমি নিবন্ধন অফিস (সাব-রেজিস্ট্রি অফিস) পরিচালিত হচ্ছে। আর ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত জরিপ অধিদফতরের জোনভিত্তিক জরিপ অফিস পরিচালিত হচ্ছে স্বতন্ত্রভাবে। দুই মন্ত্রণালয়ের অধীনে আলাদা তিনটি কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব পালন করছে।

সংশ্লিষ্টদের সুপারিশ তিন প্রশাসনকে এক কর্তৃপক্ষের অধীনে আনলে এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে, অন্যথায় নয়। তবে ভূমি মন্ত্রণালয় বলছে ডিজিটালাইজ করা হচ্ছে। সব সেবা অনলাইনে আনতে কাজ করছে সরকার। 

মাঠ পর্যায়ে ভূমি নিবন্ধন এখনও এনালগ, অনলাইনে দলিল আপলোড হচ্ছে না এই পরিস্থিতিতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মাঠ প্রশাসন) প্রদীপ কুমার দাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইন মন্ত্রণালয় আর ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাজ এক রকম নয়, আমরা চেষ্টা করছি, সাব-রেজিস্টাররা রাজি হচ্ছে না। তবে আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক হবে। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন দুই মন্ত্রণালয়কে সিদ্ধান্ত নিতে। আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করে আমরা ব্যবস্থা নেবো।’ভূমি সেবা

তবে জানা গেছে দফায় দফায় চিঠি পাঠালেও আইন মন্ত্রণালয় ডিজিটালাইজেশনে উদ্যোগ নেয়নি।

ই-নামজারি চালু হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি সব জায়গায়। এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত সচিব প্রদীপ কুমার দাস বলেন, ‘মানুষকে এখনও সন্তুষ্ট করতে পারছি না। আমরা চেষ্টা করছি অনেক দূর এগিয়েছি।’ নরসিংদী সদরের ভূমি অফিসের মতো অন্যান্য উপজেলা ভূমি অফিসেও সব সেবা অনলাইনে করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. তসলীমুল ইসলাম বলেন, ‘নামজারি ও খতিয়ানগুলো অনলাইনে দেওয়ার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন অধিদফতর যদি অনলাইনে দলিলগুলো দেয় তাহলে জরিপের কাজের জন্য তথ্য যাচাই করতে পারি। ভূমি সংক্রান্ত সব দফতরের জন্যই তথ্যগুলো অনলাইনে থাকা প্রয়োজন, তাহলে জমি সংক্রান্ত তথ্য সবাই যাচাই করতে পারবে।’ দুই মন্ত্রণালয়ের তিন দফতরের কর্তৃপক্ষের কাজ সমন্বয় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মো. তসলীমুল ইসলাম বলেন, এক ছাতার নিচে তিনটি সংস্থা কাজ করলে ভালো হতো।ভূমি সেবা

জরিপ অধিদফতর ডিজিটালাইজেশনে কী কাজ করছে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ডিজিটাল মেশিনের মাধ্যমে নকশা তৈরি করছি। এছাড়া আমরা একটি সফওয়্যার তৈরি করেছি, তাতে খতিয়ান অনলাইনে দেখা যাবে। এই সফটওয়্যার ঢাকা, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে। খতিয়ান চূড়ান্ত হলে আমরা অনলাইনে দিয়ে দিচ্ছি। সারাদেশব্যাপী এই কাজ সম্পন্ন করতে আরও কয়েকমাস লাগবে। ঢাকাসহ ৩৪ জেলায় এই কাজ করা হচ্ছে।’

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে জেলা প্রশাসক সম্মেলনে ডিজিটাল পদ্ধতিতে রেকর্ড সংরক্ষণের ব্যবস্থা চান জেলা প্রশাসকরা।  এরপর ‘ভিশন ২০২১’ অর্জনের জন্যে ভূমি সেবাগুলোকে ডিজিটাইজেশনের অংশ হিসেবে ভূমি মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের ২ নভেম্বর থেকে ই-মিউটেশন (অনলাইনে নামজারি) কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু বাস্তবে কোনও অগ্রগতি না হওয়ায় নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে মুজিববর্ষে দেশের বিভিন্ন বিভাগের ৩০০টি উপজেলা ও সার্কেলে শতভাগ ই-নামজারি সেবা চালু করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়।ভূমি সেবা

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন উপজেলায় ই-নামজারি কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। তবে ই-নামজারি ছাড়াও ভূমি অফিসে বিভিন্ন সেবা রয়েছে, যা চলছে এনালগ পদ্ধতিতে। দেশের দু-একটি উপজেলায় অন্যান্য সেবা শুরুর চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে এখনও সম্ভব হয়নি। আর ভূমি অফিসের সব সেবা এখনও জিজিটাল হয়নি। তবে প্রথম ভূমি অফিসের সব সেবা ডিজিটাল করা হয়েছে নরসিংদী জেলা সদরের ভূমি অফিসে।

সরেজমিন নরসিংদী জেলা সদরের ভূমি অফিসে গিয়ে দেখা গেছে, ই-নামজারি, রেকর্ড রুম ও বাজার ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে অনলাইনে। ভূমি অফিসে স্থাপন করা হয়েছে ডিজিটাল তথ্য সেবা বোর্ড। ভূমি অফিসের দালালদের তালিকার বোর্ড করা হয়েছে, অনলাইনেও এই দালালদের নামের তালিকা দেওয়া হয়েছে।  অনলাইনে ভূমি সেবার সুযোগ সৃষ্টি করায় মিসকেসও পেন্ডিং নেই এই ভূমি অফিসে।

নরসিংদী জেলা সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহ আলম মিয়া বলেন, ‘জেলা সদরের ভূমি অফিসের সব সেবাই করা হয়েছে ডিজিটাল। কিন্তু ভূমি সংক্রান্ত সব সেবা এখানে নেই। জমি রেজিস্ট্রি অফিস, সেটেলমেন্ট অফিস এনালগ। ফলে এখানে ডিজিটাল সেবা দিলেও আরও দুটি পর্য়ায়ে সেবাগ্রহীতারা তা পাচ্ছেন না। দেশে প্রথম ভূমি অফিসের সব সেবা ডিজিটাল করে সবাইকে চমকে দেওয়ার ইচ্ছা ছিল আমার। কিন্তু উপজেলা/থানা ভূমি অফিস ডিজিটাল করলেই পরিস্থিতি বদলে দেওয়া সম্ভব নয়। আমি পরিশ্রম করে সব সেবা অনলাইনে করে গেলাম। যদি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস দলিল অনলাইনে না দেয়, সেটেলমেন্ট অফিস খতিয়ান অনলাইনে না দেয় তাহলে সেবাগ্রহীতারা অনলাইনে ভূমিসেবার সুফল পাবেন না।ভূমি সেবা

ভূমি নিবন্ধন

আইন মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন অধিদফতরের অধীনে ভূমি নিবন্ধন চলছে পুরোপুরি এনালগ। দলিল লেখকরা আগে কলমে লিখতেন। এখন একটি নির্দিষ্ট ফরমেটে কম্পিউটারে লিখে স্ট্যাম্পে প্রিন্ট নিয়ে পুরনো পদ্ধতিতেই নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। দলিল সংরক্ষণ করা হয় না অনলাইনে। ফলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে উপজেলা পর্যায়ে ই-নাম জারি করা হচ্ছে অনলাইনে। ই-নামজারির জন্য অনলাইনে আবেদন করতে হলে দলিলগুলো স্ক্যান করে সার্ভারে আপলোড করতে হয়। কিন্তু জরিপ অধিদফতরের কোনও ডকুমেন্ট এবং জমির দলিল অনলাইনে পাওয়ার কোনও সুযোগ নেই।

ডিজিটাল জরিপ

মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ডিজিটাল জরিপ সম্পর্কে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে সাভার ও নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় ডিজিটাল জরিপ করা হয় পাইলট কর্মসূচি হিসেবে। গত ১০ বছরে কোনও অগ্রগতি নেই। এছাড়া বাংলাদেশ-ভারত আন্তর্জাতিক সীমানার কয়েকটি সেক্টরে স্ট্রিপ ম্যাপ স্ক্যানিং, ডিজিটাইজিং ও চূড়ান্ত করার কাজ শুরু হয় ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সীমানা পিলারের ডাটা এন্ট্রির কাজ শেষ করা হয়। এছাড়া নতুন করে বেশ কিছু জেলায় অনলাইনে রেকর্ড আপলোড করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ভূমি জরিপ অধিদফতর।

/এফএএন/এমএমজে/

লাইভ

টপ
X