মেয়ের জন্ম ও বিয়েতে থাকতে পারেননি বঙ্গবন্ধু

Send
এমরান হোসাইন শেখ
প্রকাশিত : ০৯:০০, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৩৯, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০

বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা (ছবিটি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)

মানুষের জীবনে জন্ম ও বিয়ে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাবা জীবিত থাকলে এ দু’টি সময়ে তাকে পাশে পাবেন, এমন প্রত্যাশা থাকে সব সন্তানেরই। বাবারও ইচ্ছা থাকে এ সময়ে সন্তানের পাশে থাকার। তারও ইচ্ছে হয় জন্মের পর ‘সবার আগে’ সন্তানের মুখ দেখার। এক্ষেত্রে যদি প্রথম সন্তান হয়, তাহলে তো কথাই নেই। একইভাবে বিয়ের বেলাও এটি প্রযোজ্য। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবনের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাবা মুজিবুর রহমানকে কাছে পাননি। দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করতে গিয়ে সন্তানকে বঞ্চিত করতে হয়েছে জাতির জনককে।

স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম সন্তান শেখ হাসিনার জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় দাদাবাড়িতে তার জন্ম হয়। বিয়ের ১৪ বছর পর ২৭ বছর বয়সে প্রথম সন্তানের বাবা হন জাতির জনক। শেখ হাসিনার জন্ম হয়েছিল ভারত বিভক্তির পরপরই। আর ওই সময় বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে ব্যস্ত ছিলেন বাঙালি মুসলমানদের অধিকার আদায় নিয়ে। মূলত শেখ হাসিনার জন্মের পর বঙ্গবন্ধু স্থায়ীভাবে কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন।

শেখ হাসিনার জন্মের পর বঙ্গবন্ধুকে টেলিগ্রাম করে জানানো হলেও তিনি আসতে পারেননি। শেখ হাসিনার জন্মের প্রায় এক মাস পর টুঙ্গিপাড়ায় গ্রামের বাড়ি আসেন তিনি। এ বিষয়ে ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বইয়ে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘আমার বাবা শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতি করতেন। বেশিরভাগ সময় তাকে তখন জেলে আটকে রাখা হতো। আমি ও আমার ছোট ভাই কামাল মায়ের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে দাদা-দাদির কাছে থাকতাম। আমার জন্মের সময় বাবা কলকাতায় পড়তেন, রাজনীতি করতেন। খবর পেয়েও দেখতে আসেন বেশ পরে।’ সাংবাদিক, কলামিস্ট মরহুম বেবী মওদুদও তার একটি লেখায় এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

জন্মের সময়ের মতো শেখ হাসিনার বিয়ের সময়ও বঙ্গবন্ধু পাশে থাকতে পারেননি। ঐতিহাসিক ৬ দফা ঘোষণার কারণে ওই সময় বঙ্গবন্ধুকে কারাবন্দি থাকতে হয়েছে। ৬ দফা দেওয়ার পরপর প্রথমে কয়েক দফায় ৯০ দিন বঙ্গবন্ধুকে জেলে থাকতে হয়। এরপর ১৯৬৬ সালের ৮ মে তাকে গ্রেফতারের পর দীর্ঘদিন জেলে থাকতে হয়েছে। এ সময় দুই বছর আট মাসের বেশি সময় জেলে থাকার পর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তার মুক্তি হয়। কারাবন্দি হওয়ার পর বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিব মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন। বঙ্গবন্ধু জেল থেকে কবে ছাড়া পাবেন এবং পরিবারের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই এই তাড়াহুড়া ছিল। যা বঙ্গবন্ধু তার কারাগারের রোজনামচা বইয়ে উল্লেখ করেছেন। ওই বইয়ে একজন সিএসপি অফিসারের সঙ্গে শেখ হাসিনার বিয়ের প্রস্তাব আসার কথাও উল্লেখ রয়েছে। ১৯৬৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু তাঁর ডায়রিতে ওই প্রস্তাবের কথাটি উল্লেখ করে সার্বিক বিবেচনায় শেখ হাসিনাকে বিয়েতে রাজি হওয়ার জন্য বলেন। পরে অবশ্য বঙ্গবন্ধু রাজবন্দি হওয়ায় ওই সিএসপি অফিসারের পরিবারের লোকজন সরকারের চাপের আশঙ্কায় পিছুটান দেয়। এরপর ১৯৬৭ সালের আগস্টে লন্ডন থেকে পিএইচডি ডিগ্রি শেষ করে দেশে ফেরা বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে শেখ হাসিনার বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে নির্বাচিত হল ছাত্র সংসদের (ফললুল হক হল) একমাত্র নির্বাচিত সহসভাপতি ড. ওয়াজেদকে বঙ্গবন্ধু আগে থেকেই চিনতেন। হলের ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পর ছাত্রলীগ সভাপতি শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের মাধ্যমে ১৯৬২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ওয়াজেদ মিয়ার প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল। 

এমএ ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে শেখ হাসিনার বিয়ের বন্দোবস্তটা মূলত তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতারাই করেছিলেন। পরে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় ১৯৬৭ সালের ১৭ নভেম্বর শবে বরাতের রাতে ফজিলাতুননেছার তত্ত্বাবধানে শেখ হাসিনার বিয়ে হয়। আয়োজনটি ছিল খুব সাদামাটা। অতিথিদের সংখ্যা খুবই অল্প ছিল। ছেলেপক্ষ থেকেও স্বল্প সংখ্যক অতিথি বিয়ের সময় উপস্থিত ছিলেন। চট্টগ্রামের বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব এম এ আজিজ শেখ হাসিনার বিয়েতে অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন। বিয়ের পরে জেলগেটে ওয়াজেদ-হাসিনা নবদম্পতিকে দোয়া করেন বঙ্গবন্ধু। নতুন জামাইকে সে সময় তিনি একটি রোলেক্স ঘড়ি উপহার দেন বলে ড. ওয়াজেদ মিয়া তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন।

এদিকে ১৯৬৭ সালে ইডেন কলেজ ছাত্রী সংসদ নির্বাচনে ভিপি পদে শেখ হাসিনার জয়ের খুশির খবরটিও বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে থেকে জানতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ২৭ জুলাই যখন শেখ হাসিনার প্রথম সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্ম হয় তখনও পাকিস্তান কারাগারে বন্দি ছিলেন জাতির পিতা। নির্মম হলেও সত্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার বাবার লাশ দেখতে পারেননি। দেখতে পারেননি মা, ভাইসহ অন্যান্য আত্মীয়ের লাশ। ওই হত্যাকাণ্ডের আগে ২৯ জুলাই শেখ হাসিনা ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে স্বামী ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে জার্মানি যান। না হলে পিতা-মাতা ও ভাইয়ের মতো তাদেরও একই পরিণতি হতে পারতো।

/এসটি/এমএমজে/

লাইভ

টপ