‘মধ্যস্বত্বভোগীরা শুধু পাটশিল্পের নয়, দেশেরও ক্ষতি করছে’

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২০:০৬, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:১১, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০

BT-New‘ভালো দাম পেলে কৃষক পাটচাষে আরও আহগ্রী হয়ে উঠবেন, এটি এই শিল্পের জন্য সহায়ক। কিন্তু বর্তমানে এর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষকের কাছ থেকে অল্প দামে পাট কিনে স্টক করছে। তারা অতি মুনাফার আশায় আমাদের শিল্পের ক্ষতি করছে। এর মাধ্যমে তারা শুধু শিল্পের নয়, দেশেরও ক্ষতি করছে।’ শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজনে ‘সংকটে পাট’ শীর্ষক বৈঠকিতে এসব কথা বলেন আলোচকরা। মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিকালে শুরু হয় বাংলা ট্রিবিউনের সাপ্তাহিক এই আয়োজন।

৩বৈঠকিতে পাটের সংকট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. জাহিদ মিয়া বলেন, ‘শুনেছি একসময় এদেশে নিম চাষ হতো, কিন্তু কখনও দেখিনি আমরা। আমরা চাই না পাটের ক্ষেত্রেও এমন হোক। আগামী প্রজন্ম যাতে বলে, “বাংলাদেশে পাট নামে একটি কৃষিপণ্য চাষ হতো”– আমরা সেই পর্যায়ে যেতে চাই না। আমরা জানতে পেরেছি, ভারতেও এবার ১৫-২০ শতাংশ উৎপাদন কম হয়েছে। আমাদের আইনেও নেই যে বিদেশ থেকে আমরা কাঁচা পাট আমদানি করতে পারবো। যার ফলে আমরা একটা ঘাটতির মধ্যে পড়বো। কাঁচা পাট রফতানি যদি নিরুৎসাহিত না করতে পারি তাহলে ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আমাদের এখানে শ্রমিকসহ ব্যাংকও বিপদে পড়ে যাবে।’

কৃষকরা সরাসরি মিলের কাছে পাট বিক্রি করতে পারেন না। মাঝখানে একটি গোষ্ঠী থাকে যারা কৃষকদের কাছ থেকে তা কিনে মিলে দেয়। মিলে দেওয়ার আগে তারা যদি মজুত করে রাখে এবং দাম বাড়িয়ে দেয় তাহলে কী হবে? বাংলা ট্রিবিউন সম্পাদক জুলফিকার রাসেল জানতে চাইলে জাহিদ মিয়া বলেন, ‘পাট একটি পরিবেশবান্ধব পণ্য। বিশ্বব্যাপী এর চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে যে, প্রতিটি জিনিসের একটি সীমা আছে। এটা পরিবেশবান্ধব বলে যেই দাম চাইবো সেই দামে সবাই নিতে বাধ্য হবে এমন নয়। এটা অন্যান্য পণ্যের মতো চাহিদামূলক না। আমাদের দেশ থেকে পাটের পণ্য হিসেবে সুতা রফতানি হয়। আমাদের পাটের দামের ঊর্ধ্বগতি-নিম্নগতি চলতে থাকলে ক্রেতারাও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাবেন। আমাদের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য ইতোমধ্যে ৩০-৪০ শতাংশ ক্রেতা অন্য পণ্যে চলে গেছে। এ বছর ভালো উৎপাদন, অন্য বছর খারাপ উৎপাদন– এই কথা শুনতে শুনতে তারা বিরক্ত হয়ে গেছে।’

৪বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, ‘আমরা চাই এই বছর যে ক্রাইসিস তৈরি হয়েছে তাতে পাট রফতানি নিরুৎসাহিত করা হোক। আমাদের যারা ট্রেডার আছে তারা তো মিলের কাছেই পাট বিক্রি করতে পারে। আর ভ্যালু অ্যাডিশনের দিকে আমাদের ভাবতে হবে, এক টন কাঁচা পাট রফতানি করলে চার-পাঁচ জনের কর্মসংস্থান হয়। অন্যদিকে, এক টন পাটপণ্য রফতানি করে আমরা ৭০-৮০ জনের কর্মসংস্থান তৈরি করি। সুতরাং আমাদের দেশের স্বার্থের কথা চিন্তা করে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’   

পাটের বর্তমান সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের নিজেদের শিল্পে ব্যবহারের মতো পাট নেই। এক্ষেত্রে তিন-চার মাসের জন্য আমাদের ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আমাদের এই শ্রমিক থাকবে না। এতে এই শিল্পে আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। আমরাই একমাত্র কাঁচা পাট রফতানি করি। ভারত কিন্তু কাঁচা পাট রফতানি করে না। তারা তাদের প্রয়োজনে বাংলাদেশ থেকে উন্নতমানের পাট আমদানি করে, যেটা তাদের দেশে হয় না। আমাদের পাট উদ্বৃত্ত থাকে বলেই আমরা রফতানি করি। কিন্তু এই বছরেই আমরা ব্যতিক্রম দেখতে পাচ্ছি। আমরা আশঙ্কা করছি, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির পরে যদি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে আমাদের জুটমিলগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। সরকারই জুটমিল ইতোমধ্যে বন্ধ করেছে। আমাদের বলা হয়েছিল দাম কমালে দেশের ক্ষতি হবে। এবার দেখা গেছে উল্টো হয়েছে। মিল বন্ধ হয়ে গেলে আগামী মৌসুমে পাট আসলেও আমরা তা হুট করে চালু করতে পারবো না। আমাদের মিল চালু করতে পাঁচ-ছয় মাস লাগবে। তখন কিন্তু পাটের চাহিদা অনেক কমে যাবে। আমরা হয়তো মনে করছি, কৃষক লাভবান হচ্ছে কিন্তু হয়তো আগামী বছর গিয়ে দেখা যাবে কৃষকরা অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।’

১গাজী টেলিভিশনের এডিটর ইন চিফ সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, ‘পাটের দুরবস্থার জন্য প্রথমত দায়ী হলো বিজেএমসি এবং তাদের মিলগুলো। তাদের ক্রমাগত লোকসান, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, অদক্ষতা সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের পাট খাতকে একদম খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত সরকারকে অনেক ঝুঁকি নিয়ে এই পাটকলগুলো বন্ধ করতে হয়েছে।’

২সরকারের পাটকল বন্ধ করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর এই শিল্পে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে অর্থায়ন করতে গিয়ে আর্থিক খাত একটি বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। একটা বড় অর্থ চলে যেত বেতন-ভাতায় এবং আমাদের সাধারণ ট্যাক্সপেয়ারদের পকেট থেকে দেওয়া ব্যাংকের টাকা সেখানে দিতে হতো। শেষ পর্যন্ত যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে। আমি মনে করি, এটা একটি ভালো সিদ্ধান্ত। সরকার আর পাটের ব্যবসা করবে না। কিন্তু প্রত্যাশার জায়গা যেটি ছিল, সরকারি মিলগুলো যখন বন্ধ করা হয়েছে তখন বেসরকারি মিলগুলো উজ্জ্বল ছিল, তারা কেন এখন সংকটে। এর একটি বড় কারণ, মধ্যস্বত্বভোগীরা পাট নিয়ে নতুন একটা কারসাজি শুরু করেছে। এখানে নজরদারির ব্যাপার গুরুত্বপূর্ণ। বেশি টাকার লোভ দেখিয়ে সেই টাকা না দিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে সস্তায় পাট কিনে মিলকে বেশি দামে দিয়ে পুরো বাজারটাকে অস্থির করার চেষ্টা করা হচ্ছে। রফতানি খাতকে নষ্ট করার চেষ্টা কর হচ্ছে।’ 

এ বৈঠকি সরাসরি সম্প্রচার করে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজ।  

 

/এসও/এমএএ/

লাইভ

টপ