যে কারণে ইভিএমে ভোটের হার কম

Send
এমরান হোসাইন শেখ
প্রকাশিত : ২৩:১৬, অক্টোবর ১৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:১০, অক্টোবর ১৮, ২০২০

ইভিএমইভিএম এবং কাগুজে ব্যালটে ভোট কাস্টিংয়ে বিস্তর ফারাক। ব্যালটের তুলনায় ইভিএমে ভোট পড়ার হার অর্ধেকেরও কম। ইভিএমে রাজধানীতে ভোট পড়ার হার খুবই কম। শনিবার ঢাকা-৫, নওগাঁ-৬ আসনসহ করোনাকালে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনে ভোটের হার পর্যালোচনা করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) ইভিএমে অনুষ্ঠিত নওগাঁ-৬ আসনের ভোটের হার কিছুটা সন্তোষজনক হলেও ঢাকা-৫ আসনের ভোটের হার কম। ঢাকা-৫ আসনে চার লাখ ৭১ হাজার ৭১ ভোটের মধ্যে কাস্ট হয়েছে ৪৯ হাজার ১৪১ ভোট। ভোট পড়েছে মাত্র ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এদিকে নওগাঁ-৬ আসনে তিন লাখ ছয় হাজার ৭২৫ ভোটের মধ্যে ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ। ভোটের হারের দিক থেকে নওগাঁ-৬ আসনে কিছুটা সন্তোষজনক হলেও করোনাকালে ব্যালট পেপারে অনুষ্ঠিত যে কোনও আসনের তুলনায় এর হার অনেক কম। করোনাকালে ব্যালটে অনুষ্ঠিত ভোটের মধ্যে সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে বগুড়া-১ আসনের ৪৫ দশমিক ৬ শতাংশ। করোনা সংক্রমণের পাশাপাশি নির্বাচনের সময় সেখানে প্রবল বন্যাও ছিল।

ইভিএমে ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট পড়া  নওগাঁ-৬ আসনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৮১ দশমিক ৩৬ শতাংশ ভোট পড়েছিল।

ইভিএমে তুলনামূলকভাবে কম ভোট পড়ার বিষয় নির্বাচন কমিশন বলছে, ফিঙ্গারপ্রিন্টে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে এমন তথ্য প্রচারের ফলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করেছে। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক করেছে সেই বৈঠকেও এ বিষয়টি আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে অভিযোগ করা হয়, স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কার করার কারণে ঢাকা-১০ আসনে ভোটাররা ভোট দিতে আসেননি। এজন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেও দায়ী করা হয়। অপরদিকে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জালভোটসহ কারচুপির বেশি সুযোগ থাকার কারণে ব্যালটে বেশি ভোট পড়েছে। সেই তুলনায় ইভিএমে এই সুযোগ কম থাকায় কাস্ট কম হয়েছে।

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের শুরুর দিকে ২১ মার্চ ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন ১৫ হাজার ৯৯৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। বিএনপির প্রার্থী শেখ রবিউল আলম ধানের শীষ প্রতীকে পান ৮১৭ ভোট এবং জাতীয় প্রার্থীর হাজী মো. শাহজাহান ৯৭ ভোট পান। ওই আসনের ভোটসংখ্যা ৩ লাখ ২১ হাজার ২৭৫। ভোট পড়ে মাত্র ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ। একইদিনে গাইবান্ধা-৩ ও বাগেরহাট-৪ আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ব্যালট পেপারে অনুষ্ঠিত ভোটে  যথাক্রমে ৬০ ও ৬৯ শতাংশ ভোট পড়ে।

করোনা সংক্রমণের মধ্যে ১৪ জুলাই যশোর-৬ এবং বগুড়া-১ আসনের উপনির্বাচন হয়। এ আসন দুটিতে ভোট হয় ব্যালট পেপারে। যশোর-৬ আসনে মোট দুই লাখ ৩ হাজার ১৮ জন ভোটারের মধ্যে এক লাখ ২৯ হাজার ৬৭ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। এর মধ্যে বাতিল হয়েছে এক হাজার ৩৭৪ ভোট। নির্বাচনে ভোট পড়ে ৬৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ। একই দিনে অনুষ্ঠিত বগুড়া-১ আসনে ভোট পড়ে ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ। দুটি আসনে গড় ভোটের হার ৫৫ শতাংশ।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর পাবনা-৪ আসনের উপনির্বাচনে তিন লাখ ৮১ হাজার ১১২ ভোটারের মধ্যে দুই লাখ ৫০ হাজার ৬৮৪ ভোট পড়ে। এর মধ্যে দুই হাজার ৭১টি ভোট বাতিল হয়। গড়ে ভোট পড়ে ৬৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

করোনা সংক্রমণের আগে এ বছর ১৩ জানুয়ারি চট্টগ্রাম- ৮ উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ইভিএমে অনুষ্ঠিত ওই ভোটে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৪শ' ৮৫ ভোটের মধ্যে ২২ দশমিক ৯৪ শতাংশ  কাস্ট হয়।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মোট ভোট পড়েছিল ৮০ দশমিক ২০ শতাংশ। ওই নির্বাচনে ছয়টি আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছিল সেখানে ভোট পড়েছিল ৫১ দশমিক ৪২ শতাংশ। পক্ষান্তরে অন্য ২৯৪টি আসনে, যেখানে ব্যালট পেপার ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে এ হার ছিল ৮০ দশমিক ৮০ শতাংশ। অর্থাৎ ইভিএমের তুলনায় ব্যালট পেপার ব্যবহৃত আসনগুলোর ভোটের হার ছিল ২৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেশি।

ইভিএমে চট্টগ্রাম-৯ আসনে ৬২ দশমিক ৮৭ শতাংশ ভোট পড়েছিল। সবচেয়ে কম ঢাকা-১৩ আসনে পড়ে ৪৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ এ ছাড়া রংপুর-২ আসনে ভোট পড়ে ৫২ দশমিক ৩১ শতাংশ, খুলনা-২ আসনে ৪৯ দশমিক ৪১ শতাংশ, সাতক্ষীরা-২ আসনে ৫২ দশমিক ৮২ ও ঢাকা-৬ আসনে ৪৫ দশমিক ২৬ শতাংশ। অপরদিকে ব্যালট পেপারে ২১৩টি আসনে শতভাগ ভোট পড়ে।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ইভিএমে ভোটের কাস্টিং প্রমাণ করে দেশের মানুষের ভোটের প্রতি আগ্রহ কম। তবে ইভিএমে ভোট পড়েছে সেটা যে পুরোপুরি প্রকৃত কাস্টিং বলে মনে করি না। এখানেও সীমিত হলেও মেনুপুলেশনের সুযোগ রয়েছে। কেন্দ্রের নির্বাচনি কর্মকর্তাদের ১/২ শতাংশ ভোটারের আঙুলের ছাপ না মিললেও ভোট প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া হয় এটি ১/২ শতাংশের পরিবর্তে ১০ বা ২০ শতাংশ দেয়া হয় কিনা সেটা তদন্তের বা যাচাইয়ের সুযোগ আমাদের নেই। ফলে এখানে মেনুপুলেট করার একটি জায়গা রয়ে গেছে।

ব্যালটে ভোট এ হার এত বেশি হওয়ার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভোটের সময় গণমাধ্যমে জাল ভোট দেওয়া, কেন্দ্র দখল করে সিল মারা, আগের রাতে ভোট দেওয়ার যে তথ্য আমরা দেখতে পাই সেটাই তার কারণ বলতে পারেন। ব্যালটে একজনের ভোট অন্যজন দেওয়ার সুযোগ রয়েছে যার কারণে ভোটের হার বেশি হচ্ছে।
নির্বাচনর কমিশনার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঢাকায় ইভিএমে ভোটের হার কম এটা সত্য তবে ঢাকার বাইরে যে খুব একটা কম তা বলা যাবে না। ঢাকায় ভোটের হার কম হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, আপনারা গণমাধ্যমে এবং বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়েছেন ইভিএমে স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। সেটা বড় কারণ।  বিশেষ করে ঢাকায় এর প্রভাব বেশি পড়েছে। তাছাড়া এটা অস্বীকার করছি না এখনো কিছু মানুষের মধ্যে ইভিএম ভীতি রয়েছে। বিশেষ করে যারা বয়স্ক এবং অশিক্ষিত তাদের মধ্যে ভয় কাজ করে। তবে আস্তে আস্তে সচেতনতা বাড়ছে। আশা করি শিগগিরই মানুষের মধ্যে এই ভীতিটা কেটে যাবে।

অনেকে মনে করেন ব্যালট পেপারে কারচুপির সুযোগ রয়েছে যার কারণে ভোটের হার ইভিএম এর তুলনায় ব্যালট পেপারে বেশি হয় এমন অভিযোগের জবাবে রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের ছবিসহ ভোটার তালিকা তা ২০০৮ সালের। ওই সময়ের ছবিতে ভোটারদের চিহ্নিত করা খুবই কষ্টসাধ্য। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে পোলিং এজেন্ট থাকে না। এই সুযোগে জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টা করে কেউ কেউ সফল হয়। এতে ভোটের হার কিছুটা বাড়তে পারে। তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়।

/এমআর/

লাইভ

টপ
X