প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া ‘হঠকারী হলিউডি ইভেন্ট’: কাবেরী গায়েন

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১৩:৪৫, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৪৫, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৬

 

কাবেরী গায়েন

বাংলাদেশে নারীবাদী আন্দোলন এখনও আন্দোলনের রূপ পায়নি বলে মনে করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ড. কাবেরী গায়েন। তিনি মনে করেন, নারীবাদ হলো নারীকে মানুষ হিসেবে মর্যাদাশীল দেখার নৈতিক জমিন প্রস্তুত করা সংগ্রাম। কাবেরী বিশ্বাস করেন, সাংস্কৃতিক বিপ্লব একদিনে ঘটার বিষয় না।

সাম্প্রতিক সময়ে ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবস’কে সামনে রেখে প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার অধিকার নিয়ে উপমহাদেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। এ প্রশ্নে তিনি মনে করেন, ‘যিনি এধরনের ইভেন্ট খুলে অনলাইনে আক্রমণের শিকার হয়েছেন, রাষ্ট্র তাদের বিচার করবেন।’ তবে প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার বিষয়টিকে সমর্থনও করেন না তিনি। কাবেরী বলেন, দলবেঁধে চুমু খাওয়া জাতীয় ইভেন্ট যিনিই খুলে থাকুন, তিনি দেশের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-নান্দনিক বিষয়গুলো অনুধাবন করেন না। বাংলাদেশের নারীবাদী আন্দোলন, নারীপ্রশ্নে সমসাময়িক নানা বিষয়ে বাংলাট্রিবিউনের পক্ষে কথা হয় এই অধ্যাপকের সঙ্গে।

সাম্প্রতিক অনলাইন এক্টিভিটিজ দিয়ে শুরু করিপ্রবাসী দুই বাংলাদেশি ফেসবুকে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে ভারতে চুমুর ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে ঢাকায় প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া নিয়ে একটা ইভেন্ট করেনএর পর শুরু হওয়া বিতর্কে একদল বলছে, চুমু খাওয়া অধিকার; আরেকদল তাদের আক্রমণ করছেএমনকি ইভেন্টটি যে নারী খুলেছেন তাকে ধর্ষণের হুমকিও দেওয়া হয়েছেপুরো বিষয়টায় নারীর অধিকার প্রশ্নে কোন ভুল ধারণা তৈরি করবে বলে মনে করেন? লড়াইয়ে আরও সাবধানী হওয়ার দরকার আছে কিনা?

চুমু খাওয়ায় কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু 'পুলিশি প্রহরায় দলবেঁধে চুমু খাওয়া' জাতীয় ইভেন্ট যিনিই খুলে থাকুন, তিনি দেশের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-নান্দনিক বিষয়গুলো অনুধাবন করেন না,  সেটাই মনে হয়। প্রথমত, আমি বাণিজ্যিক ভালোবাসা দিবসের বিপক্ষে। ভালোবাসা নিশিদিন যত্ন করার জিনিস। দ্বিতীয়ত, এই দিনটা স্বৈরাচার বিরোধী প্রতিরোধ দিবস। যেদিনে অনেক মানুষ শিক্ষার অধিকার রক্ষার জন্য, মজিদ খানের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন এবং হাজারে হাজার গ্রেফতার হয়েছেন। তৃতীয়ত, এখনও এদেশে বিয়ের পরে মেয়ে পড়তে চাইলে স্বামী আঙুল কেটে দেন, কালো মেয়ে হলে বিয়ের সময় যৌতুক, বিয়ের পরে গঞ্জনা এমনকি খুন পর্যন্ত হতে হয়।

সেখানে এই জাতীয় হঠকারী হলিউডি ইভেন্ট মেয়েদের বাইরে পড়তে আসার, কাজে আসার জায়গাগুলো আরও সংকুচিত করে ফেলবে। যাদবপুরের ইভেন্টের ফলাফল কিন্তু ভালো হয়নি। নারী-পুরুষ শিক্ষিত হলে, কাজের পরিবেশ মুক্ত হলে হয়তো একদিন অনায়াসেই আসবে চুমু।

একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলে-মেয়েরা পাশাপাশি বসতো না, কথা বলতো না। একদল ছেলেমেয়ে  জোর করে পুলিশ পাহারায় কখনও বলেনি, আজ থেকে পাশাপাশি বসবো। মজার ব্যাপার হলো, যারা ইভেন্টটির ডাক দিয়েছিলেন, তারাতো কিছুদিন আগেও দেশে ছিলেন, বিদেশে গিয়েই কেন এই ইভেন্ট ডাকতে হলো? ডাকতে হলো কারণ, দেশে বসে এই ডাক দেবার ভরসা তারা করতে পারেননি। আমি মনে করি, সাংস্কৃতিক বিপ্লব একদিনে হয় না। এটা দীর্ঘ বিপ্লব। তার জন্য জমিন প্রস্তুত করতে হয়, নিড়ানি দিতে হয়, বীজ বুনতে হয়। অপেক্ষা করতে হয়। একইসঙ্গে, যারা ইভেন্ট আয়োজনকারীদের ধর্ষণের হুমকি দিয়েছেন, তাদের জন্য ঘৃণা, ধিক্কার যথেষ্ট নয়, তাদেরকে রাষ্ট্র যেনো শাস্তির ব্যবস্থা করে আইডি ধরে, সেই অনুরোধ রাখছি।

 কাবেরী গায়েন

তাহলে এই যে একটা ধরন গড়ে উঠছে নারীবাদের অনুসারী নামে, যারা সমাজ বিচ্ছিন্ন, যারা জানেনও না আর দশজন নারীর জন্য ক্ষতিকর কিছু করে ফেলে সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার বদলে রোজ নারীর জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে সেটার জন্য আসলে কোনও করণীয় আছে কিনা!

আছে। নারীর প্রকৃত শত্রু দুটো- ধর্মীয় মৌলবাদ এবং বাজার মৌলবাদ। ধর্মীয় মৌলবাদ নারীকে রান্নাঘরে আর সন্তান জন্মদানে দেখতে চায় শুধু। আর বাজার মৌলবাদ নারীকে সমাজের সঙ্গে তার আর সব সম্পর্ককে উচ্ছেদ করে কেবল যৌনাবেদনময়ী দেখতে চায়। দুই পক্ষই ধারণা দেয় যে, তারাই শ্রেষ্ঠ। সেজন্যই বলছি মৌলবাদ। এই দুই যাঁতাকলের মধ্যে পড়ে নারীর মানুষ-অবয়ব হারিয়ে গেছে। তার যুদ্ধ, প্রতিদিনের জীবন-যাপন, তার অবয়ব এই দুই নজরদারির মধ্যে বাঁধা পড়ে গেছে। পশ্চিমের বাজার নারীকে যেভাবে দেখাতে চায়, আমাদের তথাকথিত অনেক নারীবাদী সেভাবেই নারীবাদ বোঝেন। আমাদের করণীয় হলো, এই দুই মৌলবাদ থেকেই নিজেদের রক্ষা করা।

বাংলাদেশে নারী পুরুষ সমতা প্রশ্নে নারীর এবং পুরুষের স্বচ্ছ ধারণা কেন তৈরি করা যায়নিসমতা মানে যে পুরুষ যা করবে আমাকে তাই করতে হবে বা একজন নারী যা করবেন তাই পুরুষকে করতে হবে তাতো নাকিন্তু এই ভ্রান্তধারণা তৈরি হলো কিভাবে?

আমাদের সমস্ত ইতিহাসে পুরুষই মানদণ্ড। পাশ্চাতের নারীবাদ এই ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়েছে অনেকটাই। আমাদের তো আসলে নারীবাদ নিয়ে চর্চাটা সেভাবে হয়নি। আমরা কিছু ইস্যুতে রাস্তায় নামি, যার তাত্ত্বিক জায়গাটা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। আমরা পুরুষকে, কিংবা সাদাদের শ্রেষ্ঠ ভেবে অভ্যস্ত। তাই তারা যা করে, সেইভাবে করতে পারলেই আমাদের মুক্তি-এমনটাই শিখেছি।

অথচ নারী-পুরুষের কিছু ভিন্ন বৈশিষ্ট্যসহ সমান মানুষ মনে করলে আর ওই বিপত্তি হতো না। তসলিমা নাসরিন লিখেছেন, ছেলেরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করে, মেয়েরা কেন করতে পারবে না? আর আমার বক্তব্য হলো, নারী-পুরুষ কেউই যেনো রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রস্রাব না করেন।

যেহেতু পুরুষতন্ত্র অনুযায়ী পুরুষ আগে বাইরে গেছে, জয় করেছে (আসলে ধবংস করেছে প্রকৃতি)-তাই পুরুষই শ্রেষ্ঠ লেখা হয়েছে পুরুষের গ্রন্থে। নারী ওই গ্রন্থ পাঠ করেই বড় হয়েছে। তাই নারীও আসলে পুরুষবাদী। এই পুরুষবাদী মানস কাঠামোই পুরুষকে যেমন, তেমনি নারীকেও পুরুষের সাপেক্ষেই নিজেকে তুলনা করতে শেখায়।

বাংলাদেশে নারীবাদ চর্চায় একধরনের ঘাটতি আছে বলে দৃশ্যত মনে হয়নব্বইয়ের পর থেকে তসলিমা নাসরিনকে দিয়ে মানদণ্ড তৈরির এক ধরনের চেষ্টা আছে, আপনার কি মনে হয় তাতে করে নারীবাদ বিষয়ে একধরনের ভুল বার্তা মানুষের মনে ঢুকেছে?

শুরুতে মহিলা পরিষদ ছাড়া, নারীর আন্দোলন হয়েছে মূলতঃ এনজিওধারায়। অবশ্য মহিলা পরিষদও পরে এনজিও হয়ে যায়। তার আগে পর্যন্ত মহিলা পরিষদ ছিলো বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির অঙ্গ সংগঠন। ফলে তখন কমিউনিস্ট পার্টির একটা প্রভাব ছিলো নারী আন্দোলনে। সারা পৃথিবীতেই তখন সমাজতন্ত্রী নারীরা ছিলেন নারী আন্দোলনের পুরোধা।

তারপর আর সেভাবে থাকেনি। অন্যদিকে বাংলাদেশে এনজিও যখন নারীবাদের কথা বলেছে তখন দাতাদের কাছ থেকে ফান্ড আনার জন্য এমন কিছু কর্মসূচির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে, যা হয়তো ওই মূহুর্তের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সমস্যা ছিলো না। তাই মনে হয়, এদেশে নারীবাদী আন্দোলন এখনো তেমন একটা হয়নি। আমি নারীবাদ বলতে বুঝি নারীদের নিজস্ব সমস্যায় নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা আর চিন্তার সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে মানুষ হিসেবে সমান অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার পথ খোঁজা।

তসলিমার বিষয়টা ইন্টারেস্টিং। তিনি ব্যক্তি নারীর দৈহিক মুক্তির জন্য যতোটা লিখেছেন (যা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ), নারীর আর্থ-সামাজিক মুক্তির প্রসঙ্গে সামান্যই লিখেছেন। তিনি শুধু পুরুষ-সমাজকে দায়ী করেছেন। আর দায়ী করেছেন মোল্লাদের। যে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এইসব ঘটে সেই কাঠামোর বিরুদ্ধে কোনওদিন সোচ্চার হননি। পুঁজিবাদী কাঠামোর ফাঁদে নারীর অধঃস্তনতা নিয়ে কোনওদিন ভাবেননি। ফলে একটা পর্যায়ে গিয়ে তার লেখা পুরুষ-বিদ্বেষী বলে মনে হয়। তাই এদেশে নারীবাদকে যারা তসলিমা নাসরীনের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন, তারা নারীবাদকে নারী বনাম পুরুষের যুদ্ধ বানিয়ে ফেলবেন, সেটাই স্বাভাবিক।

/টিএন/

লাইভ

টপ