অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদন, ফেসবুকে ‘বিরুদ্ধাচরণ’ করে স্ট্যাটাস, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে যায়— এমন প্রতিবেদন শেয়ার দিলে ‘অনুভূতিতে আঘাত’ শব্দ ব্যবহার করে মামলা হয় ৫৭ ধারায়। গত ছয় মাসে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হওয়া আইসিটি আইনের ৫৭ ধারার মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ‘অনুভূতিতে আঘাত’-এর ব্যবহার হয়েছে বিভিন্নভাবেই। এমনকি সাংবাদিক ও শিক্ষকতার মতো পেশায় সহকর্মীর বিরুদ্ধে সহকর্মীর মামলাগুলোতেও ‘মিথ্য তথ্য’ দিয়ে ‘মানহানি’ মতো বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। অনলাইন বিশ্লেষক ও আইনজীবীরা বলছেন, এই শব্দগুলোর যথাযথ ব্যাখ্যা না থাকা নিয়ে শুরু থেকে তারা এর বিরোধিতা করে আসছিলেন। আর সাংবাদিকরা অনলাইনে লেখালেখি করেন বলে তাদের বিরুদ্ধে অনেকভাবেই এই ধারা প্রয়োগের চেষ্টা হতে পারে।
সহকর্মীদের মামলা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ফাহমিদুল হকের বিরুদ্ধে মামলা করেন একই বিভাগের শিক্ষক আবুল মনসুর আহমেদ। তার অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক একটি ফেসবুক গ্রুপে ফাহমিদুল হক তার (মনসুরের) বিরুদ্ধে ‘সম্মানহানিকর’ বক্তব্য দিয়েছিলেন।
খুলনার ডুমুরিয়ায় মন্ত্রীর বিতরণ করা ছাগল মারা যাওয়ার খবর ফেসবুকে দেওয়ার অভিযোগে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করেন আরেক সাংবাদিক। সাংবাদিক লতিফ মোড়ল ফেসবুকে স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন ‘প্রতিমন্ত্রীর সকালে বিতরণ করা ছাগলের রাতে মৃত্যু’। এরপরই ৫৭ ধারায় মামলা করেন যশোর থেকে প্রকাশিত দৈনিক স্পন্দন পত্রিকার ডুমুরিয়া প্রতিনিধি সুব্রত ফৌজদার। এরপর আব্দুল লতিফ মোড়লকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
অন্যের ‘মানহানিতে’ মামলা
যমুনা টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার মো. নাজমুল হোসেনস গত ২৩ জুন ‘বিচারপতির লাল সিঁড়ি ও দেলোয়ারের ক্র্যাচ’ শিরোনামে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। ‘অসৎ উদ্দেশ্যে’ বিচারপতি, বিচারক ও বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ও মর্যাদা হেয় করার চেষ্টায় নাজমুল ‘মানহানিকর’ ও ‘অশালীন’ এই স্ট্যাটাস পোস্ট করেছিলেন বলে মামলার বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়। একইভাবে স্থানীয় সংসদ সদস্য রুস্তুম আলী ফরাজির বিরুদ্ধে করা একটি প্রতিবেদন ফেসবুকে শেয়ার করায় গত শুক্রবার মঠবাড়িয়া থানায় ডা. রুস্তম আলী ড্রিগ্রি কলেজের প্রভাষক ফারুক হোসেন এই মামলা করেন।
গত ২২ জুন ‘খুনের মামলার আসামিরা হাছান মাহমুদের ক্যাডার’ শিরোনামে একটি প্রতিবদেন প্রকাশ করায় দৈনিক সমকালের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধানসহ তিন জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক ইকবাল হোসেন চৌধুরী। মিথ্যাও বানোয়াট তথ্য দিয়ে নেতা ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে মনে করে মামলাটি দায়ের করেন বাদী।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে ফেসবুকে ‘উস্কানিমূলক মন্তব্য’ করার অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদের বিরুদ্ধে মামলা করেন শফিকুল ইসলাম নামে খাগড়াছড়ির এক বাসিন্দা। তার অভিযোগ, ইমতিয়াজ মাহমুদ সম্প্রতি তার ফেসবুক আইডিতে পাহাড়ের ইস্যুতে বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। এর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারীদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়ানো হয়েছে। বাঙালি জাতিকে হেয় করে সেটলার আখ্যায়িত করা হয়েছে।
এদিকে, ফেসবুকে আপত্তিকর স্ট্যাটাস দিয়েছেন— এমন অভিযোগে রাঙামাটি ছাত্র ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক সম্পাদক চায়না পাটোয়ারিকে গ্রেফতার করে কোতয়ালী থানা পুলিশ। প্রথমে তাকে নিরাপত্তা হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে এক ছাত্রলীগকর্মীর দায়ের করা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয় বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় ছাত্র ইউনিয়ন নেতাকর্মী ও চায়না পাটোয়ারির পরিবারের সদস্যরা।
মিথ্যা ও অশ্লীল, নীতিভ্রষ্টতা, মানহানি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে এ বছরের প্রথম ছয় মাসে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় দেশের বিভিন্ন জেলায় কমপক্ষে ৩০টি মামলা হয়েছে।
আইসিটি আইনের ৫৭ ধারার ১ উপ-ধারায় বলা আছে, কোনও ব্যক্তি যদি ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনও ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ পড়লে, দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হয়; রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এ ধরনের তথ্যের মাধ্যমে কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে প্রদান করা হয়, তাহলেণ তার এই কাজ অপরাধ বলে গণ্য হবে।
ব্যারিস্টার তানজিবুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা যারা এই মামলাগুলো নিচ্ছে থানায়, তারা নৈর্ব্যক্তিকভাবে আইনটি প্রয়োগ করলে আলাদা কোনও ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতো না। ৫৭ ধারায় নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে কাউকে উদ্বুদ্ধ করার মতো যেসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো এই ধারাতেই প্রথম ব্যবহার করা হয়নি। একই ধরনের ভাষা পেনাল কোডের অনেক ধারাতেও ব্যবহার করা হয়েছে। মূল বিষয় হলো আইনটি ঠিকমতো প্রয়োগ করলে এই ভাষা একটি গাইডলাইন হিসেবে কাজ করতে পারত। নীতিভ্রষ্ট হওয়া বা হওয়ার সম্ভাবনাকে কিন্তু ব্যাখ্যা দিয়ে সব সিচুয়েশন কাভার করা সম্ভব না।’
ব্যারিস্টার তানজিব আরও বলেন, ‘‘৫৭ ধারার শুরুতে বলা আছে, ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ কেউ কোনও কাজ করলে তার জন্য পরবর্তী সম্ভাবনাগুলো তৈরি হলে সেটি তার অপরাধ হবে। তাই কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনও কাজ করলেও যদি বাকি সম্ভাবনাগুলো তৈরি হয়, তাহলে এটা কিন্তু তার কোনও অপরাধ না। এই বিবেচনাটি গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনও আইন তৈরি করার সময়ই এটা ধরে নেওয়া হয়, আইনটি নৈর্ব্যক্তিকভাবে প্রয়োগ করা হবে, এর অপপ্রয়োগ হবে না। আমরা যদি আইন প্রয়োগে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিচক্ষণতার ওপর নির্ভর করতে পারতাম, তাহলেই আর এই সমস্যা হতো না।’
প্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তি আইনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের সঙ্গে ৫৭ ধারাটি একেবারেই সঙ্গতিহীন। এ ধারার মধ্যে অপব্যবহারের সুযোগ যেমন আছে, তেমন অপব্যবহার হয়েছেও। এ নিয়ে সমালোচনা-বিতর্কও কম হয়নি।’ বিভিন্ন রকমের ও মাত্রার অপরাধের একই শাস্তি হতে পারে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আইনটি করা হয়েছিল ডিজিটাল স্বাক্ষর ও ইলেকট্রনিক সার্টিফিকেটের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিষয়ের জন্য। এখন ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নামে নতুন যে আইন হতে যাচ্ছে, সেখানে এই সমস্যাগুলো থাকবে না।’
আরও পড়ুন-
কারা করছেন ৫৭ ধারার মামলা?








