শতবর্ষে যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চান ছাত্র-শিক্ষকরা

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
০২ জুন ২০১৮, ০১:১৭আপডেট : ০২ জুন ২০১৮, ০১:২১

আলোচনা সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর দুই বছর পর পদাপর্ণ করবে শতবর্ষে। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাক্ষী বিশ্ববিদ্যালয়টি বর্তমান অবস্থা আর সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরতে মতবিনিময় সভার আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি। ‘কেমন চাই আগামীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক, কর্মকর্তা, ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী, সাংবাদিক সমিতির সাবেক ও বর্তমান নেতৃবৃন্দ তাদের মতামত তুলে ধরেন।

আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা, গবেষণায় জোর দেওয়া, আবাসন সমস্যা সমাধান করা, ছাত্র সংগঠনগুলো সহাবস্থান নিশ্চিত করা, গেস্টরুম কালচার ও শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি বন্ধ করাসহ বেশ কিছু দাবি উঠে আসে। এসব দাবি পূরণসহ বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করে শতবর্ষপূর্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি বিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন সভায় অংশগ্রহণকারীরা।

আলোচনা সভায় উপস্থিত ঢাবি`র ভিসি, প্রো-ভিসি ও অন্যান্য শিক্ষকরা শুক্রবার সন্ধ্যায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) ক্যাফেটেরিয়ায় এই মতবিনিময় সভা ও ইফতার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শতবর্ষ নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রত্যাশা নিয়ে একটি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি আসিফ ত্বাসীন। প্রস্তাবনায় বলা হয়, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সর্বপ্রথম শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশের কথা বলেছে। তারা চান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে্‌ উঠবে। প্রশাসনের নেওয়া ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হবে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার ওপর জোর দিয়ে সংগঠনটি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে সহাবস্থান নিশ্চিত করা, আবাসন সংকট সমাধানের দাবি উঠে এসেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রস্তাবনায়। সংগঠনটির নেতৃবৃন্দের উদ্ধৃত দিয়ে প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, তারা ছাত্রদলের নেতারা এমন একটি ক্যাম্পাস চান, যেখানে সবাই নিরাপদে নিজেদের কথা বলতে পারবে, ক্রিয়াশীল সব ছাত্র সংগঠনের সহাবস্থান নিশ্চিত হবে ও ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারবে। তাদের দাবি মধ্যে শিক্ষার্থীদের আবাসনের সংকট দূর করা, গেস্টরুম কালচার ও সান্ধ্যকোর্স বন্ধ করা এবং শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি বন্ধ করারও দাবি জানান।

আলোচনা সভায় বক্তব্য ৭৩ এর আদেশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র অবস্থান, সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের দিকে জোর দেওয়া ও গেস্টরুম কালচার বন্ধ করার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের বিষয়ে গণমানুষের আগের প্রত্যাশা পূরণ করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে জনগণের পক্ষে যেসব কথা বলার সুযোগ থাকতো, শ্রমিক ও কৃষকের সন্তানেরা পড়তে পারতো, সেই ঐতিহ্যের দিকে ফিরে যেতে হবে।

মার্কসবাদী বাসদ সমর্থিত ছাত্র ফ্রন্টেরও চাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়টির হারানো ঐতিহ্যে আগে মনোনিবেশ করা। সাংস্কৃতিক চর্চা ও ছাত্রদের ভিন্নমতকে লালন করা। প্রশাসনিক স্বৈরতান্ত্রিকমুক্ত শিক্ষার গণতান্ত্রিক পরিবেশ চায় বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন। সংগঠনের নেতারা শতবর্ষে সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি থাকার প্রত্যাশা করেন। নতুন নতুন গবেষণার মাধ্যমে মানুষের জীবনযাপনকে আরও সহজ করে তোলারও প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।

জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগের চাওয়া ডাকসু আর প্রক্টরিয়াল বডিতে নারী সদস্য। একাডেমিকভাবে তারা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশে দেখতে চান। তাদের দাবি, দেশের প্রয়োজনীয়তা অনুসারে ছাত্র ভর্তি করতে হবে আর অপ্রয়োজনীয় বিভাগগুলো খুঁজে বন্ধ করে দিতে হবে। বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী শতবর্ষে একটি গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় আশা করছে, যেখানে অবশ্যই ছাত্র সংসদ থাকবে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাখাতে বরাদ্দ বহুগুণ বাড়ানোর প্রস্তাব তাদের।

ছাত্র সংগঠনগুলোর দাবি ও বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তাদের প্রত্যাশার বিষয়গুলোকে স্বাগত জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। মতবিনিময় সভার মাধ্যমে সব মতের মিলনের এই ঐতিহ্যকে ধারণ করার জন্য সাংবাদিক সমিতিকে তিনি ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সব সময় ভিন্নমত ও দর্শনের লালন করে। এই অনুষ্ঠানে সব দল ও মতের লোকজনের উপস্থিতিই এর প্রমাণ।  

আলোচনা সভা ও ইফতার আয়োজন উপাচার্য বলেন, 'আমরা ২০২১ সালে এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় চাই যা অত্যন্ত পরিকল্পিত, দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সামনের দিনগুলোতে বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করতে পারি। সেই নিরীখে সুপরিকল্পিত সমন্বিত কিছু পদক্ষেপ নিয়ে ২০২১ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিনির্মাণ করতে চাই। আমাদের বিগত সময়গুলোতে সুসমন্বিত দূরদর্শী উদ্যোগ না নিতে পারাটা দুঃখজনক। আমাদের মূল কাজ, মাস্টারপ্ল্যান তৈরি ও ভূমি জরিপ। সাংবাদিক সমিতির প্রস্তাবে গণতন্ত্রায়নের দিকে যাওয়ার যে কথা বলা হয়েছে, আমরা মূলত সেদিকেই এগুচ্ছি। আমরা এই মতামতগুলো বিবেচনায় নেব। ভিন্নমত গ্রহণ করেই অগ্রসর হওয়ার প্রত্যাশা করছি।'

মতবিনিময় সভায় উপ-উপাচার্য অধ্যাপক কবি মুহাম্মদ সামাদ বলেন, 'সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক, অভিভাবক ও সন্তানের সম্পর্ক, ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে আমরা কাজ করছি। এর মাধ্যমেই একটা দেশজ মূল্যবোধ গড়ে উঠেবে। মূল ধারার সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে। সত্য ও ইতিহাসের ওপর যদি সংস্কৃতি দাঁড়ায় তবে আমরা যে আগামীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলছি তার বাস্তবায়ন হবে।'

ছাত্র সংগঠনগুলোর দেওয়া প্রস্তাবনাকে স্বাগত জানিয়ে অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম বলেন, সহনশীল, ধৈর্য্যশীল, সংবেদশীল দেশ ও জাতি গঠনে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ কথা বললে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা চলে আসে সবার আগে। এখান থেকেই দেশের সবকিছু শুরু হয়েছে। আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে আছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষ্যে তাদের প্রথম দায়িত্ব হলো, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় যাতে আন্তর্জাতিক মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অধিষ্ঠিত হতে পারে।

সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার জন্য উন্নতমানের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি, লাইব্রেরি সুবিধা বাড়ানো, খাবার ও আবাসনের সুব্যবস্থা করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রব্বানী, বিজয় একাত্তর হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আ জ ম শফিউল আলম ভূইয়া, জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক অসীম সরকার, আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষকদের নীল দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ, বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত সাদা দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম প্রমুখ বক্তব্য দেন। এছাড়াও প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মকর্তারাও এখানে উপস্থিত ছিলেন।

মতবিনিময় সভা ও অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান নয়ন। অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি ইমরান হাবিব রুমন ও সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্স, মার্কসবাদী বাসদ সমর্থিত ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক স্নেহাদ্রী চক্রবর্ত্তী রিন্টু, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মোস্তফা ও সাধারণ সম্পাদক জাহিদ সুজন, বিসিএল ছাত্রলীগের সভাপতি শাহজাহান আলী সাজু ও সাধারণ সম্পাদক গৌতম শীল, জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি মাসুদ আহাম্মেদ, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি ফারুক আহমেদ রুবেল, বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি ইউনুস শিকদার, সাধারণ সম্পাদক সাদিকুর রহমান সুমন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার সিদ্দিকী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

 

 

আরজে/এসআইআর/আরএ/আপ-এসএসএ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ ও ৪ কমিশনারের পদত্যাগ
বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ ও ৪ কমিশনারের পদত্যাগ
দাম বৃদ্ধির একদিন পরই লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য রিভিউ আবেদন
দাম বৃদ্ধির একদিন পরই লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য রিভিউ আবেদন
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম