দস্যুমুক্ত হচ্ছে সুন্দরবন, সুদিনের আশায় জেলেরা

রাফসান জানি, সুন্দরবন থেকে ফিরে
৩০ অক্টোবর ২০১৮, ২১:১২আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০১৮, ২১:২১


মাছ ধরতে গভীর সমুদ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি জেলেদের

সুন্দরবনে গত দুই বছরে আত্মসমর্পণ করেছে প্রায় আড়াইশ’ জলদস্যু। অস্ত্র জমা পড়েছে তিন শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্রসহ দুই হাজার গুলি। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী বৃহস্পতিবার (১ নভেম্বর) বাগেরহাট জেলা স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করবে আরও কয়েকটি দস্যু বাহিনী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করবেন। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে সুন্দরবন অঞ্চলে শান্তি ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এলাকার জেলেরা নির্ভয়ে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন।



তবে এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হলেও দস্যুদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের। তাদের ভাষ্য, দস্যুদের অস্ত্রসহ অন্যান্য সহযোগিতা দিয়ে যারা পৃষ্ঠপোষকতা করে, তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। অন্যথায় তাদের ছত্রছায়ায় নতুন করে দস্যুবাহিনী মাথা চাড়া দিতে পারে। সুন্দরবন আবারও ত্রাসের রাজত্বে পরিণত হতে পারে।
অবশ্য এই আত্মসমর্পণের খবরে স্বস্তি ফিরেছে স্থানীয় জেলেদের মনে। একইসঙ্গে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মাছ শিকার ও রাজস্ব অর্জনের আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
গত ৭ অক্টোবর থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। এরপর আবার মাছ ধরা শুরু করেছেন জেলেরা। সুন্দরবনের ছোট-বড় নদী, খালসহ ও গভীর সমুদ্রে মাছ ধরবেন তারা। তবে অন্য বারের তুলনায় এবার তারা সুন্দরবন এলাকা ও গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার ক্ষেত্রে নিজেদের অনেক নিরাপদ মনে করছেন। আগামী চার-পাঁচ মাস উপকূলের চরগুলোতে অবস্থান করে মাছ ধরা, শুকানো ও বিক্রি করবেন জেলেরা।
জেলেরা বলছেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার পাশাপাশি তাদের বড় ভয় ছিল জলদস্যুরা। জলদস্যুদের জন্য সাগরে নির্বিঘ্নে মাছ ধরা যেতো না। মাছ ধরতে গিয়ে দস্যুদের হাতে পড়লে আয় তো দূরের কথা, জাল-নৌকা সব হারাতে হতো। থাকতো প্রাণের ঝুঁকিও। মুক্তিপণ দিতে গিয়ে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ফিরতে হতো লোকালয়ে। সুন্দরবন এলাকা দস্যুমুক্ত হলে এমনটি আর হবে না। নিরাপদ বোধ করছেন তারা।
মোংলার জেলে ওয়াসিম শেখ বলেন, ‘এই খবরে আমরা আনন্দিত। আমরা অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করছি। আমরা নিরাপদে মাছ ধরতে পারবো।’
জেলে জাহেদুল বলেন, ‘আমাদের জন্য বড় ভয় ছিল ডাকাত (দস্যু)। ডাকাত না থাকলে আমাদের আর কোনও ভয় নেই।’
জেলেদের মাছ ধরার প্রস্তুতি

এবার সাগরে মাছ ধরা নিরাপদ হবে বলে মন্তব্য করেন বরগুনা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তফা চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘অন্য বার ডাকাতের ভয় ছিল। এবার ডাকাত নেই। নিরাপদে জেলেরা মাছ ধরতে পারবে। আমরা চাই সব সময় যেন এমন পরিবেশ বজায় থাকে।’
খুলনা র‌্যাব-৬-এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার হাসান ইমন আল রাজীব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আগামী ১ নভেম্বর সকাল ১০টায় বাগেরহাট জেলা স্টেডিয়ামে দস্যুদের শেষ আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান হবে। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। সঙ্গে বনমন্ত্রী, জেলার সব সংসদ সদস্য, প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন। সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তার কার্যালয় থেকে অংশ নেবেন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই ঘোষণা দেবেন, ‘আমি সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত ঘোষণা করলাম।’”
আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালসহ স্থানীয় সংসদ সদস্য, বন বিভাগের কর্মকর্তা,  র‌্যাব ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত থাকবেন।
সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে প্রায় এক দশক সময় ধরে কাজ করছেন যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি মোহসীন-উল হাকিম। ঘূর্ণিঝড় আইলায় উপকূলীয় অঞ্চল আক্রান্ত হওয়ার পর সেখানে সংবাদ সংগ্রহে যান তিনি। জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, তাদের জন্য বড় বাধা দস্যুরা। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে পারলে স্বাভাবিক ও নিরাপদ পরিবেশ ফিরে পাবেন জেলেরা।
২০০৯ সাল থেকে জলদস্যুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার কাজ শুরুর পর তার হাত ধরে প্রথম সাফল্য আসে ২০১৬ সালের ৩১ মে। র‌্যাবের কাছে প্রথম আত্মসমর্পণ করে মাস্টারবাহিনীর সদস্যরা। এরপর একে একে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে ‘মজনু’, ‘ইলিয়াস’, ‘জাহাঙ্গীর’ ‘নোয়াব’, ও ‘বড় ভাই’ বাহিনীর মতো বড় বড় দস্যুবাহিনী।
দস্যুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া ও শুরু সম্পর্কে যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি মোহসীন-উল হাকিম বলেন, ‘আইলার পর আমি যখন সাতক্ষীরায় কাজ করতে যাই তখন ওখানকার জেলেরা বলছিলেন, তাদের কাছে সবচেয়ে বড় সমস্যা দস্যু। তখন বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করলাম। দেখলাম আসলেই দস্যুমুক্ত করতে পারলে সুন্দরবনের এই বিশাল জনগোষ্ঠী নিরাপদে জীবনযাপন করতে পারবে। এককথায়, বেঁচে যাবে তারা। সেখান থেকে ২০০৯ সালে কাজ শুরু। উদ্দেশ্য ছিল যেসব জেলে আক্রান্ত হয়, চাঁদা দিতে হয়, মুক্তিপণ দিতে হয় তাদের কীভাবে জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করা যায়।’
তিনি বলেন, ‘সুন্দরবন গহীন বন। সেখানে গিয়ে অভিযান পরিচালনা করা সত্যিই অসম্ভবের মতো ব্যাপার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তো চেষ্টা করছেই, তাদের পাশাপাশি যদি দস্যুদের সারেন্ডার করানো যায়, সে লক্ষ্যে কাজ শুরু। কেননা, অভিযানে তো পুরো বাহিনী ধরা পড়ে না। আবার সব অস্ত্রও পাওয়া যায় না। দুর্গম এলাকা হওয়ায় ঘেরাও দিয়ে অভিযান চালানোও সম্ভব না। কাজেই তাদের যদি বুঝিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা যায় তাহলে দস্যুবাহিনীগুলো বিলুপ্ত হবে, অস্ত্র-গুলিও জমা হবে।’
জলে জেলেদের নৌকা

সবার সহযোগিতায় সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করার পর আর যেন কোনও দস্যুবাহিনী গড়ে উঠতে না পারে সেজন্য সরকারকে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন এই সাংবাদিক।
মোহসীন-উল হাকিম বলেন, ‘সবার সহযোগিতায় এই সফলতা আসতে যাচ্ছে। এই পরিবেশটা দীর্ঘস্থায়ী করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যারা দস্যুতার পৃষ্ঠপোষক তাদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা শুনছি। কিন্তু দৃশ্যমান কোনও পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। কিছু ব্যবসায়ী নানাভাবে দস্যুদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। যেটা সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর। সবকিছুর মূলে তারা। কিছু ব্যবসায়ী আছে যারা সুন্দরবনে মাছের ব্যবসা করেন। তারা নিজেদের স্বার্থেই এই দস্যুদের লালনপালন করেন। সুন্দরবনে আবার দস্যুতা শুরু হবে কিনা, সেজন্য তারাই বড় হুমকি। তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।’
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মো. আমির হোসাইন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দস্যুমুক্ত করতে পারাটা সবার জন্য একটা বড় সাফল্য। বিশেষ করে এলাকার মানুষের জন্য। আগামী বৃহস্পতিবার আরও কিছু দস্যুর সারেন্ডার প্রোগ্রাম আছে। সেই দিক থেকে সুন্দরবন এখন অনেকটাই নিরাপদ বলতে হয়। যদিও ছোটখাটো বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা এখনও আছে। তবে আগে যে দস্যুদের মেজর একটা থ্রেট ছিল আমাদের জেলে, মাওয়ালীদের জন্য, এখন আর সেটা নেই। এখন অনেক স্বাভাবিক পরিবেশ বিরাজ করছে। আগে যেরকম হুমকি ছিল, জেলেদের মধ্যে ভয় ছিল, সেই পরিবেশটা এখন আর নাই।’
দুবলার চর এলাকায় মাছ ধরার মৌসুম শুরু হওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর আমাদের যেসব জেলে ফিসিং করেন তারা দুবলার চরের উদ্দেশ্যে চলে গেছেন। এখন তাদের প্রস্তুতি নিতে কিছুটা সময় লাগবে। থাকার স্থান থেকে শুরু করে অন্যান্য যেসব সরঞ্জাম আছে সেগুলো রেডি করতে হবে। দুবলার ফিসিং চলবে আগামী বছরের মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত।’
আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব অর্জন করা সম্ভব হবে বলে মন্তব্য করেন আমির হোসাইন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এখানে দুইটা বেরিয়ার (বাধা) জেলেদের সবসময় কাজ করে। এক. জলদস্যু, আরেকটা প্রতিকূল আবহাওয়া। কারণ, প্রতিকূল আবহাওয়ায় জেলেরা সমুদ্রে মাছ ধরতে পারে না। জলদস্যুরাও আত্মসমর্পণ করায় এবার পরিবেশ ফিসিংয়ের জন্য অনুকূলে আছে। আবহাওয়া যদি অনুকূলে থাকে তাহলে আমরা এবছর দুবলার ফিসিংয়ে কাঙ্ক্ষিত মাছ ও রাজস্ব অর্জন করতে পারবো।’


/এইচআই/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ঈদুল আজহা: ১৩ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২৮১
ঈদুল আজহা: ১৩ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২৮১
এবছরই সব স্কুলে ফিডিং চালুর পরিকল্পনা, পাঠ্যক্রমে খেলাধুলা: শিক্ষামন্ত্রী
এবছরই সব স্কুলে ফিডিং চালুর পরিকল্পনা, পাঠ্যক্রমে খেলাধুলা: শিক্ষামন্ত্রী
দুই দল গ্রামবাসীর সংঘর্ষে ৬২ জন আহত
দুই দল গ্রামবাসীর সংঘর্ষে ৬২ জন আহত
বাংলাদেশ সফরের ব্যাখ্যা দিলো আইসিসি
বাংলাদেশ সফরের ব্যাখ্যা দিলো আইসিসি
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান