রোটা ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। হাসপাতালে বাড়ছে রোগীদের ভিড়। আইসিডিডিআর-বি’র কলেরা হাসপাতালে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। রোটা ভাইরাসে আক্রান্ত শিশুরা রাজধানী ও আশপাশের জেলা থেকে এসে ভর্তি হচ্ছে।
আইসিডিডিআর-বি’র কলেরা হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন গড়ে ৬৫০ জন রোগী আসছে। এদের বেশিরভাগই শিশু।
হাসপাতালে ভর্তি মাইশা ইসলাম (১৪ মাস)।তার মা রুনা ইসলাম বলেন, ‘এখানে চিকিৎসকরা যা যা বলছে, তাই তাই ওকে খাওয়াচ্ছি।’ আরেক শিশু তৌসিফ হোসেন (১ বছর ২ মাস)। তার স্বজনরা জানায়, একদিন আগে থেকে বমি ছিল। ওমিডন খাওয়ানোর পর ওর পায়খানা শুরু হয়। এরপর হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। পায়খানা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তৌসিফকে ওরস্যালাইন খাওয়াতে বলেছেন চিকিৎসকরা।
পাঁচ মাস নয়দিন বয়সী ইউশরার মা সোনিয়া আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘১০-১২ দিন ধরে ওর ডায়রিয়া হয়েছে। এরপর আমরা হাসপাতালে এসেছি। রোগীর অবস্থা সিরিয়াস না হওয়ায় চিকিৎসকরা ছেড়ে দিয়েছে, তাই চলে যাচ্ছি। দুই ঘণ্টা অবজারভেশনে রেখেছিল এসময়ের মধ্যে মাত্র একবার পায়খানা হয়েছে, তাই ছেড়ে দিয়েছে।’
নরসিংদীর মাধবদী উপজেলার বাবুরহাট থেকে আসা আরেক রোগীর বাবা মো. শাহিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার ছেলে সিফাতকেও (১৪ মাস) দুই ঘণ্টা অবজারভেশনে রেখে বাসায় যেতে বলেছেন চিকিৎসকরা।’
আইসিডিডিআর-বি’র হাসপাতালে কর্তব্যরত একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করে জানান, একজন অভিভাবক তার শিশুকে হাফ লিটার পানিতে দুই প্যাকেট স্যালাইন দিয়েছে। আবার অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েছে চারটা। অথচ হাসপাতালে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুকে মাত্র দুটি অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। অন্যদিকে, আরেকজন মা মাত্র একশ’ গ্রাম পানিতে এক প্যাকেট ওরস্যালাইন গুলে ছেলেকে খাইয়েছেন। এরপরই ছেলের অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে এবং এখন সে আইসিইউতে আছে।
এই চিকিৎসক আরও জানান, কারও ডায়রিয়া হলে অবশ্যই তাকে ওরস্যালাইন খাওয়াতে হবে। এক প্যাকেট ওরস্যালাইন হাফ লিটার পানিতে মিশিয়ে খাওয়াতে হবে। ওরস্যালাইন গরম পানিতে দেওয়া যাবে না।
আরেক রোগী সোহান (৬ বছর) এর নানি জেসমিন নেসা (৪৪) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার নাতি সোহান আট দিন ধরে রক্ত আমাশয়ে ভুগছে।প্রথমে রাশমনো হাসপাতালে ভর্তি ছিল। সেখানে কোনও উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শে সোহানকে এই হাসপাতালে এনে ভর্তি করিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের ঘরের সবাই এই অসুখে আক্রান্ত হয়েছে। এটা কি ফুড পয়জনিং নাকি অন্যকিছু বুঝতে পারছি না।’
সোনারগাঁও উপজেলার গাওসিয়া থেকে ছেলেকে নিয়ে এসেছেন মা সুমাইয়া বেগম। তিনি বলেন, ‘ছেলে আরাফাত হোসেন (দেড় বছর)চারদিন ধরে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। তবে হাসপাতালে ভর্তির পর এখন ওর অবস্থা অনেকটা ভালো।’
জিসান আহমেদের (দেড় বছর) নানি আসিয়া বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার নাতির গায়ে জ্বর আছে, ঘনঘন পাতলা পায়খানা হচ্ছে। ওষুধে কাজ হচ্ছে না। জ্বর না কমায় দুশ্চিন্তায় আছি।’ তিনি বলেন, ‘জ্বরের জন্য সিরাপ খাওয়াতে বলেছিল। ওর সিরাপ কই পাবো বুঝতেছি না।’
গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে আসা রুনু আক্তার বলেন, ‘আমার ছোট মেয়ে তাসফিয়া আক্তারের (৯ মাস) নয় দিন ধরে ডায়রিয়া। ওর জ্বর আছে, আর পাতলা পায়খানা হচ্ছে।’
আইসিডিডিআর-বি’র মিরপুর রিজিওনের সিনিয়র ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট জামিলা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মিরপুর এলাকায় রোটা ভাইরাসে আক্রান্ত শিশু ও রোগীর সংখ্যা অনেকটা কমেছে। মিরপুরে বস্তি এলাকা বেশি এবং সেখানে বিহারিদের ক্যাম্প রয়েছে। ওদের পরিবেশটা অস্বাস্থ্যকর। ওখানে ডায়রিয়াও হয় বেশি। তবে কলেরার ভ্যাকসিন খাওয়ানোর পর রোগীর সংখ্যা অনেক কমে গেছে। আগে যে হারে রোগী আসতো সেই তুলনায় অনেক কমে গেছে। অনেকগুলো পিআর প্রজেক্ট ওখানে চলছে। ফলে উপকারিতা পাওয়া যাচ্ছে।’
তিনি বলেন,‘বিহারিরা ছাগল, মুরগি, কবুতর, মানুষ একসঙ্গে থাকছে। এটার একটা প্রভাব পড়ে। মানুষ যত বেশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে, তার ডায়রিয়া হওয়ার ঝুঁকি তত কম থাকবে।’
হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘এখন রোটা ভাইরাসের সিজন— এই কারণে রোগী বেড়েছে। যেসব রোগী আসছে তার ৯৫ ভাগই শিশু।’
ছবি: তাসকিনা ইয়াসমিন








