জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ার হোসেন বলেছেন, ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র রক্ষা করতে হলে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকতে হবে। কিন্তু এমনটা কেন হতে পারে না– ক্ষমতায়ও আছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এবং বিরোধী দলেও আছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি?’
দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজনে ‘কেমন হলো নির্বাচন’ শীর্ষক বৈঠকিতে তিনি এসব কথা বলেন। সাংবাদিক মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় মঙ্গলবার (১ জানুয়ারি) বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটে শুরু হয় বাংলা ট্রিবিউনের সাপ্তাহিক এই আয়োজন।
ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারি এবং বিরোধী দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা, তাদের মধ্যেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, তাদের মধ্যেই গণতন্ত্র– এটা কেন হতে পারে না? এই নির্বাচনের মধ্যে দিয়েই জামায়াত-বিএনপির অবস্থা মুসলিম লীগের মতো পরিণতির দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশে আমরা সেই অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে সরকারি ও বিরোধী দল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকবে। এবং সেটাই আমাদের কাম্য। সেখানে অবশ্যই গণতন্ত্র থাকবে। সামনের দিকে যে নির্বাচন, সেই নির্বাচন আমরা এবারের মতো চাই না। বাংলাদেশ একটি অসাধ্য সাধনের দেশ, তরুণ প্রজন্ম বসে থাকবে না।’
বৈঠকিতে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘ওবায়দুল কাদেরকে সবাই কর্মিষ্ঠ লোক হিসেবে জানেন। কারণ তিনি অনেক দৌড়াদৌড়ি করেন। তিনি কথার লোকও ভালো। তার দুটো জিনিসের প্রশংসা করতে হবে। একটা হলো, শেখ হাসিনার বরাত দিয়ে তিনি বলেছেন, বিজয় মিছিল না করতে। এটা শুধু বিনয় নয়, দূরদর্শিতাও বটে। দ্বিতীয়ত, তিনি নিজেও বোঝেন রাজনীতিতে জোয়ার-ভাটা আছে। সমস্যা অন্য জায়গায়। সমস্যা বিএনপির নয়। আমি ড. আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে ষোলআনা একমত, মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে থাকা উচিত না। জামায়াতকে আপনারা নিবন্ধনহীন করেছেন, হাইকোর্টের বরাত দিয়েছেন, কিন্তু সরাসরি নিষিদ্ধ করার মতো সাহস কেন দেখানো হচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন দেখা যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকও অন্যদিকে চলে যায়। বাংলাদেশে যদি বিরোধী দল না থাকে আমরা যে সংসদ পাবো সেটা হবে “হুক্কাহুয়া”। সকলে ঐকমত্য হলে আত্মহত্যার সিদ্ধান্তও নেওয়া যায়। আমরা যেন আত্মহত্যা না করি। আমাকে দেখতে হবে আমার দেশের জন্য কোনটা ভালো। আমি মনে করি, আমাদের দেশে সংসদের ভেতরে এবং বাইরে আলোচনা অব্যাহত রাখা উচিত এবং সমালোচনা করার অধিকার আমার থাকা উচিত। আমাদের যদি এরকম বিরোধী দল না থাকে, তাহলে বিরোধী দল তৈরি করতে হবে। কিন্তু এরশাদকে দিয়ে হবে না। তোষামোদির রাজনীতি থেকে আমাদের সরে আসা উচিত। অতিরিক্ত তোষামোদ কখনোই ভালো না।’
ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক আশিস সৈকত বলেন, ‘বাংলাদেশের সরকারি দল এবং বিরোধী দল দুই পক্ষকেই বাংলাদেশের মানুষের পক্ষের হতে হবে। ’৭০-এর নির্বাচনে যখন ভোট বিপ্লব হয়েছিল, তখন কিন্তু মানুষ বাংলাদেশের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। আমার কাছে মনে হয়, এবারও মানুষ বাংলাদেশের পক্ষে ভোট দিয়েছে। যেখানে বাংলাদেশ বিরোধীর কোনও ঠাঁই হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, জামায়াত নিবন্ধন হারালো ঠিকই কিন্তু বিএনপির ভালোবাসা হারাতে পারলো না। ফলে জামায়াত তাদের সঙ্গী। কিন্তু তরুণরা কখনোই স্বাধীনতার বিরোধীদের পক্ষে যাচ্ছে না। ফলে বিএনপির একটি নতুন মুখ দরকার হলো। কামাল হোসেন, কাদের সিদ্দিকীকে তারা মুখোশ হিসেবে আনলো এটা বোঝাতে যে, আমাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধারাও আছে। কামাল হোসেন তাদের শর্ত দিলেন “জামায়াত থাকলে যাবো না”। কিন্তু শেষে বিএনপি কামাল হোসেনের সঙ্গেও প্রতারণা করলো। মানুষ কিন্তু এখন সব খবরই রাখে। এই যে বিএনপির চালাকি– তারা জামায়াতের ভোট ছাড়তে চায় না, আবার মুখোশ হিসেবে কামাল হোসেনদের লাগে, এটা মানুষ বুঝে ফেলেছে। এসবের মধ্যে উন্নয়ন একটি বড় ফ্যাক্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে ভোটের ক্ষেত্রে। আমার কাছে মনে হয় জামায়াত ইস্যুতে একটা গণভোট হয়ে গেছে।’
ইলেকশন মনিটরিং ফোরামের ঢাকা মহানগরীর সাংগঠনিক সম্পাদক মিয়াজী পাপন বলেন, ‘আমরা মাঠে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করেছি। আমাদের দেশীয় পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সাতটি দেশের পর্যবেক্ষক দিয়েছি। কোনও জায়গা থেকে আমাদের কাছে অনৈতিক কিছু আবদার করা হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রধান ফোকাস ছিল, ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটদান করতে পারছে কিনা। কোনও রকমের সহিংসতা হচ্ছে কিনা, বাধা দেওয়া হচ্ছে কিনা। এজেন্টদের উপস্থিতির বিষয়টিও আমাদের পর্যবেক্ষণের মধ্যে পড়ে। এক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, কোনও কোনও দলের এজেন্ট নেই। আবার স্বতন্ত্র প্রার্থীর এজেন্ট ছিল। অনেক জায়গায় ঐক্যফ্রন্টের এজেন্ট পাওয়া যায়নি।’
বাংলা ট্রিবিউনের প্রধান প্রতিবেদক উদিসা ইসলাম বলেন, ‘গণভোট যে হলো, এই পরিমাণ ভোট যারা পান তাদের সতর্ক থাকা দরকার। কারণ এরকম ভোট পাওয়ার পর এক ধরনের ভরসা তৈরি হয়। ফলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকবে নাকি অন্যদিকে টার্ন করবে, সেই ভীতির জায়গাটা কিন্তু মানুষের মনে আছে। যে কারণে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দলের নেতাকর্মীদের বারবার বলছেন– সংযত আচরণ করুন। আগামীতে তারা সংযত আচরণ করবেন সেই প্রত্যাশা রাখছি।’
রাজধানীর পান্থপথে বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিও থেকে এ বৈঠকি সরাসরি সম্প্রচার করেছে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজ। পাশাপাশি বাংলা ট্রিবিউনের ফেসবুক ও হোমপেজে লাইভ দেখানো হয়েছে।








