‘তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গঠিত মন্ত্রিসভা সফল হবে’

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
০৮ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:১৪আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:২৩

সাংবাদিক মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিওতে সাপ্তাহিক আয়োজন বৈঠকিতে আলোচকরা নতুনরা নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে আসে। আর পুরনোরা অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সেগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাই তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গঠিত মন্ত্রিসভা সফল হবে বলে আশা করছেন বিশিষ্টজনেরা। দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজনে ‘তরুণ মন্ত্রিসভা’ শীর্ষক বৈঠকিতে এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারা। সাংবাদিক মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় মঙ্গলবার (৮ জানুয়ারি) বিকালে শুরু হয় বাংলা ট্রিবিউনের সাপ্তাহিক এই আয়োজন।

বৈঠকিতে সমাজ গবেষক অধ্যাপক মেজবাহ কামাল বলেন, ‘আমি অভিজ্ঞতাকে অবহেলা করার পক্ষে নই। আমি অবশ্যই তারুণ্যের জয়গান গাইব। তারুণ্যই আমাদের পথ দেখাবে। সেই প্রত্যাশায় আমরা থাকি। কিন্তু পথ দেখিয়ে এতদিন পর্যন্ত যারা নিয়ে এসেছেন, তারা তো সবাই বিপথে চলেননি। অনেকে সুপথেও চলেছেন। তা না হলে তো বাংলাদেশ এই জায়গায় আসতো না। আমি আরেকটু খুশি হতাম যদি এখানে আরও কিছু সিনিয়র সদস্য থাকতেন। অভিজ্ঞতার একটি মূল্য আছে সব জায়গায়। যদি অভিজ্ঞতাকে তারুণ্যের সঙ্গে সমন্বয় করা যায় তাহলে ভালো হয়। তারুণ্য এবং অভিজ্ঞতার যথাযথ ভারসাম্য থাকাটা সাফল্যের চাবিকাঠি। এক্ষেত্রে আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রী একটু ঝুঁকি নিয়েছেন। ভুল কিংবা সঠিক, তা বলার সময় এখনও আসেনি।’

অধ্যাপক মেজবাহ কামাল তিনি আরও বলেন, ‘আমি আস্থা রাখতে চাই। কিন্তু এখন মিডিয়ার যুগ, উপজেলার নেতাদেরকে কিন্তু আমরা সেই বদৌলতে চিনি। প্রধানমন্ত্রী একটা চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন। সে জায়গায় তিনি অনেক ক্ষেত্রে সফল হবেন, কোনও কোনও ক্ষেত্রে সফল নাও হতে পারেন। তবে যেটা হতে পারে তা হলো– নতুন সংযুক্ত হতে পারে, আবার অন্তর্বর্তী পরিবর্তন হতে পারে। তাতে করে নতুন নতুন জায়গাগুলো আসতেই পারে। তাছাড়া সিনিয়রদের মধ্যে কিন্তু অনেক যোগ্য মানুষ আছেন। যারা ইতোমধ্যে মন্ত্রী হননি, তারাও কিন্তু সিনিয়র হয়ে আসতে পারেন।’    

অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ জেবতিক বলেন, ‘পুরনো মন্ত্রিরা কেন বাদ পড়লেন? এই কথাটি চিন্তা করলে বোঝা যাবে, এখনকার রাষ্ট্র কিংবা সরকার ব্যবস্থা কোন দিকে যাচ্ছে। আমরা মানি বা না মানি, এটি অনেকটাই এক ধরনের করপোরেট ম্যানেজমেন্টের দিকে যাচ্ছে। সারা দুনিয়া যাচ্ছে, আমরাও যাচ্ছি। আগে রাজনীতির ভিত্তি ছিল। সে কারণে রাজনীতিবিদ তৈরি হয়েছে। এখন কিন্তু সংসদ সদস্য বদলাচ্ছেন। আগে আইন প্রণেতারা সংসদ সদস্য হতেন। এখন ব্যবসায়ীরা হচ্ছেন। ম্যানেজমেন্টের জায়গাগুলো থেকে এখন মন্ত্রণালয় সেদিকে যাচ্ছে। সেটা যাওয়ার কারণে যিনি সব সময় রাস্তায় আন্দোলনে ছিলেন, তৃণমূল থেকে এসেছেন– এই কমপ্লেক্স ম্যানেজমেন্ট তার পক্ষে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। কিছু কিছু জায়গা আছে যেখানে সাবেক আমলাদেরকে মন্ত্রী করা হয়। যেহেতু তারা আমলাতন্ত্রটা বোঝেন, তাই  তারা এক ধরনের সাফল্য পান। এসব ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদদের কমপ্লেক্স ম্যানেজমেন্টটা শিখতে হয়, তাই তারা অনেকেই সাফল্য পান না। আবার অনেকে বেশ ভালো করেন।’

আরিফ জেবতিক তিনি আরও বলেন, ‘করপোরেট জগতে একটি কথা চালু আছে, “একজন লোকের একই পজিশনে তিন বছর থাকার পর আর কিছু দেওয়ার থাকে না।” এজন্য করপোরেট জগৎ বলে, তিন বছর পর পজিশন পরিবর্তন করা উচিত। সেক্ষেত্রে একজন মন্ত্রীর পক্ষে তিন বছর পরে নতুন কোনও ডায়নামিক আইডিয়া দেওয়া সম্ভব হয় না। তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে মন্ত্রিসভা বদল করা উচিত বলে আমি মনে করি। তাতে দেখা যাবে নতুনরা আরও  নতুন আইডিয়া নিয়ে আসবেন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাশেদা রওনক খান বলেন, ‘রাজনীতির মাঠে যখন মনোনয়ন নিয়ে কথা হচ্ছিল তখন আমরা অনেকেই বলেছিলাম, রাজনীতির মাঠটি অনেকটা বাণিজ্যিকীকরণ হয়ে গেছে। কারণ মনোনয়ন বাণিজ্য, সেটা যে দলেরই হোক। এই নির্বাচনে সম্ভবত ৬১ শতাংশ প্রার্থী ব্যবসায়ী। সেই জায়গা থেকে মন্ত্রিসভাকে ব্যবসামুক্ত রাখা কিন্তু একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা দেখেছি, নির্বাচন করেছেন অনেকেই কিন্তু মন্ত্রিসভায় তৃণমূল পর্যায়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এই পরিবর্তন কিন্তু একটা বড় ব্যাপার। ২৮ বছর ধরে সিলেটের বাইরে অর্থমন্ত্রী হননি কেউ। সেটি এবার কুমিল্লা পেয়েছে। এই পরিবর্তনগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরিবর্তন আনার সাহস তৈরি হলেই পরিবর্তন আসবে। পরিবর্তন কিন্তু হেঁটে আসার বিষয় নয়, তাকে টেনে আনতে হবে।’

রাশেদা রওনক খান বাংলা ট্রিবিউনের প্রধান প্রতিবেদক উদিসা ইসলাম বলেন, ‘একটি আদর্শ সমাজের বাস্তবতার মধ্যে আমরা নেই। এই না থাকার কারণ, আমাদের চাওয়া ও বাস্তবতার মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক। সুশাসনের কথা বলা হচ্ছে, সেটা আসবে যখন রাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি অঙ্গ সক্রিয় থাকবে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে গণমাধ্যম। এবং রাষ্ট্র যা করছে “এটা তো আমরা জানতাম” এই কথাটি না বলে “আমি দেখছি” এটা যেমন বলা জরুরি, তেমনি এটাও জরুরি যাদেরকে নজরদারি করছি তারা আমলে নেন কিনা। বিগত মন্ত্রিসভায় এমন মানুষও ছিলেন যাদের জন্য জনমানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল এবং চেয়েছে যে তারা আর না থাকুক। সেই সময় সরানো হয়নি। সরানো হলে জনমনে এমন আস্থা তৈরি হতো– “আমি চাই না বলে তাকে সরানো হয়েছে। আমার চাওয়ার একটা গুরুত্ব আছে।” আগামীর কথা বলতে গেলে, সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে গণমাধ্যমকে সক্রিয় হতে হবে এবং তা আমলে নিতে হবে। কিছু না শোনার ভঙ্গি এ সময়ে আর করা যাবে না।’

উদিসা ইসলাম তিনি আরও বলেন, ‘অভিজ্ঞতা কিন্তু আমাদের কাজ করতে করতে হয়ে যায়। আমরা আসলে জানি না আমাদের পেছনে থাকা নতুন প্রজন্ম নিজেদের অভিজ্ঞ করে তুলেছে। যেমন আমরা এর মধ্যে দেখেছি, স্কুলের ছেলেমেয়েরা রাস্তায় নেমে এসেছে। আমরা ভাবতেও পারিনি, যে আমার বাসার বাচ্চাটি এভাবে ভাবে। ওই অভিজ্ঞতাগুলোকে আমরা পাত্তা দিইনি কখনও। ওই জায়গাতেও আমাদের ভাবার আছে যে, অভিজ্ঞ না ভেবে তাদেরকে নিয়ে আমরা শঙ্কিত হবো কিনা। সেই শঙ্কার জায়গা বোধহয় আপাতত নেই। সুশাসনের জন্য গণমাধ্যমকে মুক্ত করা এবং তাদের কথা শোনা জরুরি।’

বাংলা ট্রিবিউনের বিশেষ প্রতিনিধি শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরের মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। আমার মনে হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার যে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন, সেখানে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকটি মানুষকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও নির্দেশ এবং দলের প্রধান হিসেবে যা যা প্রয়োজন সেটি করার অধিকার রাখেন। কারণ হচ্ছে, বিগত মন্ত্রিসভায় এমন কিছু মানুষ ছিলেন, যারা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। যত-যাই বলা হোক না কেন, ওই মানুষগুলোর সামনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাকে কোনও কড়া কথা বলতে তার বিবেকে লাগে। এজন্য অনেক সিনিয়র মন্ত্রীর যেসব কাজ সরকারকে বিব্রত করেছে, সেগুলো তাকে হজম করতে হয়েছে। এমনকি সিনিয়র মন্ত্রী তার ছেলে কিংবা মেয়েকেও ব্যক্তিগত সহকারী বানিয়েছেন– এই বিষয়গুলো মানুষ ভালোভাবে নেয়নি।’

শফিকুল ইসলাম তিনি আরও বলেন, ‘যথেষ্ট সুশানের অভাব ছিল বলেই প্রধানমন্ত্রীকে এবারের নির্বাচনে বেশ কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে। তৃণমূলের একজন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিকে তিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় তুলে নিয়ে এসেছেন। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) শিখিয়ে দেবেন, কীভাবে মন্ত্রণালয় চালাতে হয়। এভাবে যোগ্য নেতা তৈরি করার চেষ্টাই তো দলনেতা করবেন। তার মধ্যে থেকে যারা সততার পরীক্ষা, ত্যাগের পরীক্ষা, দক্ষতার পরীক্ষায় ফেল করবেন, কোন হেড মাস্টার তাকে পরের ক্লাসে উন্নীত করবেন?’

রাজধানীর পান্থপথে বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিও থেকে এ বৈঠকি সরাসরি সম্প্রচার করেছে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজ। পাশাপাশি বাংলা ট্রিবিউনের ফেসবুক ও হোমপেজে লাইভ দেখানো হয়েছে এই আয়োজন।

 

/এসও/এমএএ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
হবিগঞ্জে নারীর মুখে এসিড নিক্ষেপ, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় প্রেরণ
হবিগঞ্জে নারীর মুখে এসিড নিক্ষেপ, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় প্রেরণ
বগুড়ায় দই বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা গুনলেন ব্যবসায়ী 
বগুড়ায় দই বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা গুনলেন ব্যবসায়ী 
৩৮ বছর বাড়ি ফিরে বিপদে জবেদ, স্ত্রী বললেন স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়
৩৮ বছর বাড়ি ফিরে বিপদে জবেদ, স্ত্রী বললেন স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়
বিপর্যয়ের মুখে সুন্দরবন
বিপর্যয়ের মুখে সুন্দরবন
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি