‘দখলদার যেই হোক ছাড় দেওয়া হবে না’

শাহেদ শফিক
০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:১৪আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:১৭

বুড়িগঙ্গার তীরে ভেঙে ফেলা অবৈধ স্থাপনা বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে ব্যাপক অভিযান শুরু করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। এরইমধ্যে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, সংসদ সদস্য এমনকি সরকারি মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের স্থাপনাও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির এবারের অভিযান নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রভাশালী ব্যক্তিদের অবৈধ স্থাপনা ভাঙার মধ্যদিয়ে অন্যান্য দখলদারদের কাছেও ‘রক্ষা না পাওয়া’র বার্তা পৌঁছে গেছে। এদিকে নিজেদের অবৈধ স্থাপনা রক্ষা করতে অনেকেই সরকারের উচ্চমহলে দেনদরবারও শুরু করেছেন। তবে বিআইডাব্লিউটিএ বলছে, দখলদার যে-ই হোক, কাউকে এবার ছাড় দেওয়া হবে না।

বিআইডব্লিউটিএ-র ঢাকা নদীবন্দর সূত্র জানিয়েছে, সদরঘাট থেকে গাবতলী হয়ে বালু নদীর কিছু অংশ পর্যন্ত নদীর দুই তীরে গড়ে ওঠা অবৈধ সব স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার (২৯ জানুয়ারি)  সকাল ৯টায় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার কালীগঞ্জ তেলঘাট এলাকা থেকে শুরু হওয়া অভিযানটি চলবে আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সপ্তাহের মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার অভিযান পরিচালিত হবে। সম্প্রতি বুড়িগঙ্গা নদীকে ঘিরে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে বিআইডাব্লিউটিএ। ওই প্রকল্পের জায়গা উদ্ধার করার জন্যই এ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।

অভিযানে স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলামের একটি সাত তলা ভবন ও স্থানীয় কেরামত আলী মেম্বারের একটি ভবনও ভাঙা হয়েছে। এছাড়া, ঢাকা-৭ আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিমেরও একটি বহুতল ভবন ভেঙে ফেলা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিটিসিএল’র একটি অবৈধ স্থাপনাসহ কামরাঙ্গীর চর ও খোলামোড়া গুদারাঘাট এলাকার ৪৪৫টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়।

অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে চলছে উচ্ছেদ অভিযান এই অভিযানের প্রথম তিন দিনে নদী তীরের প্রায় এক কিলোমিটার জায়গা অবৈধ দখলমুক্ত করা হয়েছে। তৃতীয় দিন বৃহস্পতিবার (৩১ জানুয়ারি) অভিযান চালানো হয় খোলামোড়া ঘাটের পূর্ব দিকের নাসিরাবাদ এলাকায়। এদিন আল-হেরা কমিউনিটি সেন্টার সংলগ্ন প্রায় দুই ডজন স’মিল ভেঙে দেওয়া হয়। এই অভিযানে অবৈধ ৫৬টি বহুতল ভবনসহ প্রায় ৯০৬টি স্থাপনা ভেঙে ফেলার  পরিকল্পনা রয়েছে।

শুক্রবার (১ ফেব্রুয়ারি) সকালে ওই এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সদর ঘাট থেকে কামরাঙ্গীর চরের খোলামোড়া গুদারাঘাট এলাকা পর্যন্ত অভিযান শেষ হয়েছে। ভেঙে দেওয়া বহুতল স্থাপনাগুলোও। দখলদারদের নিয়োজিত শ্রমিকরা  ভেঙে ফেলা ভবনের  ইটপাথর, দরজার-জানালাসহ বিভিন্ন অংশ খুলে নেওয়ার কাজ করছেন। এদিন কোনও অভিযান পরিচালিত না হলেও ভাঙা ভবনগুলো দেখতে উৎসুক জনতার ভিড় ছিল।

দুপুরে গুদারাঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ৮১৮ নম্বর রওশন এছাক টাওয়ার নামে সাত তলা একটি ভবনের কিছু অংশ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ভবনটিতে কোনও ভাড়াটিয়া বা বসবাসকারীকে দেখা যায়নি। তবে বাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা সমির উদ্দিন নামে একব্যক্তি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভবনটি যখন দুই তলা পর্যন্ত   নির্মাণ করা হয়, তখন বিআইডব্লিউটিএ-র লোকজন এসে ভবন নির্মাণ না করার জন্য বারণ করেছিল। কিন্তু বাড়ির মালিক তা শোনেননি। আমরা কল্পনাও করিনি এত বড় বাড়ি এভাবে ভেঙে দেওয়া হবে।’

বিআইডব্লিউটিএ’র উচ্ছেদ অভিযানে ভেঙে ফেলা অবৈধ স্থাপনা রফিকুল ইসলাম নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, এবারের অভিযানে তার বাড়িও ভেঙে ফেলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিআইডব্লিউটিএ, সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের লোকজন প্রতিবারই এসব ভবন ভাঙতে এসে আবার চলে যায়। এমন জানলে এত টাকা খরচ করে বাড়িটি নির্মাণ করতাম না। আমার বাড়ি তৈরিতে তিন কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। আমি তো এখন পথের বিখারি।’

স্থানীয় একটি মসজিদের খাদেম সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা নদী দখলকেন্দ্রিক অনেক অভিযান দেখেছি। কিন্তু গত দুই দিনের মতো এমন অভিযান আর দেখিনি। অনেক শক্তিশালী ব্যক্তির স্থাপনায়ও অভিযান চালানো হয়েছে। আমরা আশা করি, এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

এদিকে, অভিযান চলতে দেখে অনেক অবৈধ দখলদার সরকারের উচ্চ মহলে তদবিরের চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে। সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিম বৃহস্পতিবার সংসদ ভবনে তার দালান ভেঙে ফেলার বিষয়ে নৌ-পরিবহনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলে মন্ত্রী কর্ণপাত করেননি বলে জানা গেছে। মুহূর্তে এই খবর স্থানীয় অন্যান্য দখলদারদের কাছে পৌঁছে গেলে তারা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটি-’র যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা সদর ঘাট থেকে গাবতলী হয়ে বালু নদীর কিছু অংশ পর্যন্ত এই অভিযান পরিচালনা করবো। আমাদের কাছে নদী তীরের ৯০৬টি অবৈধ স্থাপনার একটি পরিসংখ্যান রয়েছে। তবে আমরা সরেজমিনে গিয়ে দেখেছি, এই সংখ্যা আরও  বাড়বে। গত তিন দিনের অভিযানে ৪৪৫টি স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এতে একতলা থেকে সাত তলা পর্যন্ত ভবন রয়েছে। এই দখলদারদের তালিকায় কলকারখানা থেকে শুরু করে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে।’

তিনি আরও  বলেন, ‘এবছর আমরা অন্যান্য বছরের মতো উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছি না। এবার নদীর জায়গায় নির্মিত অবৈধ  ভবনগুলো উচ্ছেদের পাশাপাশি মাটি ওলটপালট করে দেওয়া হচ্ছে।’ ভেঙে ফেলা স্থাপনার মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে বলে তিনি জানান।

উচ্ছেদ অভিযানে কোনও বাধা আসছে কিনা, জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘ আমাদের এসব দেখা বিষয় নয়। আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে— দখলদার যে-ই হোক অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হবে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা অবৈধ সব ভবন উচ্ছেদ করে নদীর পাড় দখল মুক্ত করবো।’

এই কর্মকর্তা জানান, এরইমধ্যে বিআইডব্লিউটিএ-র পক্ষ থেকে বুড়িগঙ্গার দুই পাড়ে একটি ওয়াকওয়ে নির্মাণসহ নদীকে দূষণমুক্ত করতে প্রায় সাড়ে আট কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।’

এর আগেও নদী তীরের অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে একাধিক অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু কিছু দূর যেতে না যেতেই সেই অভিযান থেমে যায়। নদীর জায়গা আবারও দখলদারদের দখলে চলে যায়। সেজন্যই এবারের অভিযান ব্যর্থ হতে দেওয়া হবে না বলে দাবি করেন বিআইডব্লিউটিএ-র কর্মকর্তারা।

 

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: সবচেয়ে বেশি চাপে মধ্যবিত্ত
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: সবচেয়ে বেশি চাপে মধ্যবিত্ত
দেশে ফিরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
দেশে ফিরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
মূল্যস্ফীতির আগুনে পুড়ছে মানুষ, বাড়ছে বিদ্যুতের দাম এরপর কী
মূল্যস্ফীতির আগুনে পুড়ছে মানুষ, বাড়ছে বিদ্যুতের দাম এরপর কী
থানায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে নির্যাতনের অভিযোগ, পুলিশের তদন্ত কমিটি
থানায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে নির্যাতনের অভিযোগ, পুলিশের তদন্ত কমিটি
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম