ব্যাংকের সামনের রাস্তায় অপেক্ষমাণ কালো গ্লাসের একটি মাইক্রোবাস। ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বের হওয়া ব্যক্তির গতিরোধ করে ডিবি পুলিশের জ্যাকেট পরা কয়েকজন। নিজেদের ডিবি পুলিশের সদস্য পরিচয় দিয়ে গতিরোধ করা ব্যক্তিকে বলে, আপনার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ আছে। অপেক্ষমাণ মাইক্রোবাস দেখিয়ে বলা হয়, গাড়িতে এসি স্যার (সহকারী কমিশনার) আছেন। আপনার সঙ্গে উনি কথা বলবেন। এভাবে টার্গেটেড ব্যক্তিকে মাইক্রোবাসের কাছে নিয়ে আসা হয় এবং গাড়িতে তুলে নিয়ে সঙ্গে থাকা টাকাসহ মূল্যবান জিনিস হাতিয়ে নেয়।
ডিবি পুলিশের জ্যাকেট, হ্যান্ডকাফ, ওয়াকিটকি, পিস্তলসহ অবস্থান নিয়ে থাকা ব্যক্তিরা কেউই পুলিশের সদস্য নন। তারা ভুয়া ডিবি সেজে ব্যাংক বা মার্কেটের সামনে থেকে টার্গেটেড ব্যক্তিদের অপহরণ করে লুট করে।
এই চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পশ্চিম বিভাগ। তারা হলেন- সাইদ মিয়া (৩৫), ফারুক মিয়া (৩০), মো. রানা (৪০) ও আবুল কালাম। রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এসময় তাদের কাছ থেকে একটি ওয়াকিটকি, ১টি হ্যান্ডকাফ, ১টি ডিবি লেখা জ্যাকেট, ১টি খেলনা পিস্তল উদ্ধার ও একটি মাক্রোবাস জব্দ করা হয়েছে।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ পশ্চিম বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার রাহুল পাটোয়ারী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এই চক্রের সদস্যরা প্রতিদিনই টার্গেটের খোঁজে বের হতো। তাদের টিমে রয়েছে একজন ভুয়া সহকারী কমিশনার (এসি) সাইদ মিয়া, দারোগা (এসআই) মো. রানা, বাকি দুজন কনস্টেবল। ভুয়া ডিবি সেজে অপহরণ করা এবং টাকা পয়সা লুটে নেওয়া এই চক্রের প্রতারণার কৌশল।
বেশি পরিমাণ টাকা উত্তোলন করছে এমন কোনও টার্গেট না পেলে, মাইক্রোবাসে যাত্রী তোলার নামে অপহরণ করত এই চক্রের সদস্যরা। গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা ডিবি কর্মকর্তাদের জানিয়েছে, সাধারণত অফিস থেকে ফেরার পথে রাজধানীর বিভিন্ন স্টপেজে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের তারা টার্গেট করত। তারা রাস্তার মোড়ে মাইক্রোবাস নিয়ে অপেক্ষা করতো আর গাড়ির ভেতরে যাত্রী সেজে বসে থাকে দুজন। ভেতরে যাত্রী আছে দেখে, ঘরমুখী মানুষ মাইক্রোবাসে ওঠে বসে। সর্বোচ্চ এক থেকে দুইজন যাত্রী গাড়িতে তোলা হয়। যাত্রী গাড়িতে প্রবেশের কিছু সময় পর টার্গেটেড যাত্রীর চোখমুখ বেঁধে ফেলা হয়। চলন্ত গাড়িতেই চলে মারধর। কেড়ে নেওয়া হয় সঙ্গে থাকা টাকা ও মূল্যবান জিনিস। এছাড়া সঙ্গে কোনও এটিএম কার্ড থাকলেও তার পিন নম্বর নিয়ে বুথ থেকে টাকা উত্তোলন করত তারা। সবকিছু লুটে নেওয়ার পর সুবিধামতো স্থানে যাত্রীকে নামিয়ে দিয়ে পালিয়ে যেত এই চক্রের সদস্যরা।
উল্লেখিত দুটি প্রক্রিয়া ছাড়াও রাস্তা থেকে জোর করে মাইক্রোবাসের ভেতর লোক তুলে তাদের টাকা পয়সা লুট করতো এরা বলে জানিয়েছেন ডিবি পুলিশের কর্মকর্তারা। একটু নির্জন পথে পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন এমন কাউকে পেলে টান দিয়ে তাদের মাইক্রোবাসে তুলে নেয় এই চক্রের সদস্যরা। এরপর এই মাইক্রোবাসে করেই শহরের বিভিন্ন জায়গায় তাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় ও সঙ্গে থাকা টাকা ছিনিয়ে নেয়। ভুক্তভোগীকে দিয়ে তার পরিবারের সদস্যদেরকে ফোন করা হয়। জরুরি প্রয়োজন বলে বিকাশে টাকা দিতে বলে। পরিবারের সদস্যরাও দ্রুত সময়ে নির্ধারিত নাম্বারে টাকা পাঠায়।
এ ধরনের ঘটনায় আশপাশে থাকা দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সহায়তা চাওয়ার পরামর্শ জানিয়েছেন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ পশ্চিম বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার রাহুল পাটোয়ারী। তিনি বলেন, প্রতারকরা গোয়েন্দা পুলিশের পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা করে। কেউ ডেকে নিতে আসলে, তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। আশপাশে দায়িত্বে থাকা পোশাকে পুলিশ সদস্যদের অবহিত করা যেতে পারে। সর্বোপরি সতর্ক থাকতে হবে।








