গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়ে। পরের মাস আগস্টে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হন। অবশ্য চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে নেমে এসেছে। তবে মঙ্গলবার (২৪ সেপ্টেম্বর) থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় পুনরায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, মশকনিধন কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে, মানুষ সচেতন থাকলে ডেঙ্গু আর মাথাচাড়া দেবে না। মশকনিধন কার্যক্রম বন্ধ হলেই কেবল ডেঙ্গু বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাস বলছে, এ মাসের বাকি কয়েকদিনই সারাদেশে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, এ বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে মশকনিধন কার্যক্রমও জোরদার করা হয়। ফলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। সেইসঙ্গে সাধারণ মানুষ সচেতন হয়েছে। তাই মানুষ সচেতন থাকলে এবং মশকনিধন কার্যক্রম চলমান থাকলে বৃষ্টিতেও ডেঙ্গু বাড়ার শঙ্কা নেই।
তবে এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন গবেষকরা। তারা বলছেন, বৃষ্টি হলে ডেঙ্গু বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তা হয়তো প্রাদুর্ভাবের মতো হবে না।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখন আর ডেঙ্গু বাড়বে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ, মশকনিধন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে মশকনিধন কার্যক্রম বন্ধ করলে বাড়তে পারে।’
গবেষকরা বলছেন, থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় কন্টেইনার, ডাবের খোসা, ফুলের টপসহ ছাদ বা খোলা জায়গায় পানি জমতে পারে। সেসব জায়গায় মশা ডিম পাড়বে। তবে নিয়মিত পানি পরিষ্কার করলে এবং ওষুধ ছেটালে ডেঙ্গু বাড়ার আশঙ্কা নেই।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘মনে হয় না ডেঙ্গু আর বাড়বে। মশা তো অনেকটা কন্ট্রোলে এসেছে। মশা নিয়ন্ত্রণের ফলে তাই এডিসের বংশবৃদ্ধি হবে না। মশার প্রকোপ না বাড়লে ডেঙ্গুও বাড়বে না।’
জনগণ সচেতন হয়েছে মন্তব্য করে ডা. আব্দুল্লাহ বলেন, ‘যদিও কিছুটা ঝুঁকি থেকে যায়। কিন্তু মশকনিধন কার্যক্রম যেভাবে হচ্ছে, সেভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে আর মশার বংশবৃদ্ধি হবে না। তাহলে আর ডেঙ্গু বাড়বে না বলে আশা করছি।’
স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তারেরও মতে, ডেঙ্গু বাড়বে না। কারণ, মানুষ এখন সচেতন হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এডিস মশা কোথায় কোথায় বংশবৃদ্ধি করে, সেসবই এখন মানুষের জানা। অপরদিকে সরকারিভাবে মশকনিধন কর্মসূচি চলছে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় বিশেষ গাইড লাইন অনুযায়ী চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিচ্ছেন।’
তবে এর সঙ্গে দ্বিমত করেন আইসিডিডিআর,বির সাবেক গবেষক আতিক আহসান। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি হলে ডেঙ্গু বাড়বে। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেশি থাকে। কারণ, এসময় বৃষ্টি হয়।’ বৃষ্টি হওয়ার সঙ্গে ডেঙ্গুর বাড়া-কমার খুবই স্ট্রং কোরিলেশন আছে দাবি করে তিনি বলেন, বৃষ্টি হলেই মশার ডিম থেকে বাচ্চা বের হবে।
আতিক বলেন, ‘সবাই ঠিকঠাক মতো যার যার ভূমিকা পালন করলেও বাড়বে। কারণ, মশার সংখ্যা বাড়বে। যেহেতু বৃষ্টির সঙ্গে এটা কানেক্টেড।’
তিনি বলেন, ‘গত কিছুদিন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমছে। কারণ, বৃষ্টি হয়নি। যেহেতু বৃষ্টি হচ্ছে তাই বলা যায়, থিউরিটিক্যালি এটা বাড়বে।’
তবে তিনি এ-ও বলেন, আবার বৃষ্টি হলে হয়তো ঢাকায় ডেঙ্গু বাড়বে না। কারণ, ঢাকায় ডেঙ্গু ছড়ায় এডিস ইজিপ্টাই। কিন্তু গ্রামে এডিস ছড়ায় এডিস অ্যালবোপিকটাস। অ্যালবোপিকটাস থেকে সংক্রমণ হয়ে ঢাকার বাইরে বাড়বে। তাই পানি জমার পাত্র পরিষ্কার করতে হবে, মশকনিধন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।
প্রায় একই কথা বলেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু কিছুটা বাড়তে পারে, কিন্তু অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা কম। কম এজন্য যে, ইতোমধ্যে মশার পপুলেশন কমে গেছে।’
ডা. মাহমুদুর বলেন, তবে বাড়ার সম্ভাবনাও আছে। কারণ, বৃষ্টি হচ্ছে। তবে প্রাদুর্ভাবের পর্যায়ে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনা দেখছেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি।








