‘এইবার হাতের রগ কাটছে,পরের বার কল্লা কেটে দেবে’

নুরুজ্জামান লাবু
১৫ অক্টোবর ২০২০, ১৫:৩১আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২০, ১৫:৪১

পুলিশের হাতে গ্রেফতার দাদা বাহিনীর দুই সদস্য মামুন ও পাটোয়ারি ‘তুই টাকা দিবি কিনা বল? এইবার হাতের রগ কাটছে, এর পরের বার কল্লা কেটে দেবে। পরের হিটে তুই থাকবি না। তুই নিজে ডিসাইড কর তুই কী করবি? তোরা চার ভাই কই থাকস আমি সব জানি। আমার লোক সব জানে। আমি তো বেশি চাই নাই। চার ভাইয়ে মিলিয়ে আমারে পাঁচ লাখ টাকা দিবি।’ দাদা বাহিনীর সদস্যরা এই হুমকি দিয়েছে ব্যবসায়ী গোলাম সারওয়ার বিপ্লবকে।

প্রথম দফায় দাবি অনুযায়ী চাঁদা না দেওয়ায় রাজধানীর কাওরান বাজারের ফল ব্যবসায়ীর ওপর হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। গোলাম সারওয়ার বিপ্লব নামের ওই ব্যবসায়ীর হাতের রগ কেটে দেওয়ার পর সন্ত্রাসীরা আবারও ফোন করে চাঁদার পাঁচ লাখ টাকা না দিলে জীবননাশের হুমকি দেয়। এ ঘটনায় ব্যবসায়ী গোলাম সারওয়ার বিপ্লব রাজধানীর তেজগাঁও থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলা নম্বর- ৩৬।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর তেজগাঁও এবং কাওরান বাজার এলাকায় নিয়মিত চাঁদাবাজি করে আসছে কথিত এক দাদাবাহিনী। ব্যবসায়ী বিপ্লবও জানান, তার কাছে চাঁদা চাওয়ার সময় অজ্ঞাত ওই ব্যক্তি নিজেকে তেজগাঁওয়ের দাদা হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। এলাকায় তার শতাধিক ক্যাডার রয়েছে বলেও ফোনে হুমকি দেয় অজ্ঞাত ওই সন্ত্রাসী। গোলাম সারওয়ার বিপ্লব  বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার কাছে পাঁচ লাখ টাকা চেয়েছিল। টাকা না দেওয়ায় হাতের রগ কেটে দিয়েছে। এবার মেরে ফেলবে বলেছে। আমি খুব ভয়ে আছি।’

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, কাওরান বাজারে এক সময় আশিক নামে এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর আধিপত্য ছিল। চুরি-ছিনতাই-খুন-চাঁদাবাজির সঙ্গে সম্পৃক্ত আশিক বর্তমানে ভারতে পালিয়ে রয়েছে। এরপর তার ক্যাডার বাহিনীর অনেকেই এককভাবে চাঁদাবাজি করে আসলেও ‘দাদা বাহিনী’ নামে নতুন করে চাঁদাবাজি শুরু হয়েছে। টেলিফোনে কথিত এই দাদা পরিচয়ধারী সন্ত্রাসী ব্যবসায়ী বিপ্লবকে হুমকি দিয়ে বলেছে— ‘তার ওপর কথা বলার মতো এমন কোনও নেতা নেই। এমনকি থানা পুলিশও তার কথা মতো চলে।’ থানা- পুলিশ কথা না শুনলে তিনি সংশ্লিষ্ট ওসিকে বান্দরবানে পাঠিয়ে দিতে পারেন বলেও হুমকি সম্বলিত ওই টেলিফোন রেকর্ডে তাকে বলতে শোনা গেছে।

কে এই দাদা?

তেজগাঁও ও কাওরান বাজার এলাকায় অজ্ঞাত এই দাদা এখন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাম না জানা এই ব্যক্তিকে নিয়ে রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে। যোগাযোগ করা হলে কাওরান বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী দাদা বাহিনীর দাদাকে নিয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। তবে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, কথিত এই দাদা স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে সে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে।

এই বাহিনীর সদস্যরা সম্প্রতি সামছুল আলম নামে এক ব্যবসায়ীর ওপরও হামলা চালায়। অজ্ঞাতনামা ওই দাদা তার কাছেও ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিল। চাঁদার টাকা না দেওয়ায় গত ৮ সেপ্টেম্বর দাদার লোকজন ব্যবসায়ী সামছুল আলমকেও কুপিয়ে আহত করে। দাদা বাহিনীর সন্ত্রাসীরা পরবর্তীতে ঢেউটিন ব্যবসায়ী শামছুল আলমকে ফোন করে বলে, ‘এটা স্যাম্পল দিলাম। চাঁদার টাকা না দিলে পরেরবার তোর জীবন যাবে।’

ব্যবসায়ী শামছুল আলম বলেন, ‘আমি অত বড় ব্যবসায়ীও না। ছোট একটা টিনের দোকান করি। এত টাকা দেওয়ার সামর্থ্যও আমার নেই। হামলার পর এখন ভয়ে-ভয়েই দোকান চালাচ্ছি।’

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ বলছে, তারা সম্প্রতি মামুন ও পাটোয়ারি নামে দাদা বাহিনীর দুই সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। গত ৯ অক্টোবর রাজধানীর কাওরান বাজার থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা দাদা বাহিনীর সদস্য হিসেবে চাঁদাবাজির কথা স্বীকার করেছে। প্রথম দফা রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করে আদালত তাদের কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) তাদের পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, দাদা বাহিনীর দাদা সম্পর্কে কিছু তথ্য তারা পেয়েছেন। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এছাড়া দাদা বাহিনীর হয়ে চাঁদাবাজি করা আরও কয়েকজন সন্ত্রাসীর নাম-ঠিকানাও পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে রিপন, সুমন, মজিদ উল্লেখযোগ্য। মামুন, সুমন ও রিপন এক সময় শীর্ষ সন্ত্রাসী আশিকের হয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজি করে বেড়াতো। ২০০৯ সালে কারকাওরান বাজারের কাঠপট্টিতে দিনের বেলায় তিন জনকে গুলি করে হত্যা মামলারও অন্যতম আসামি ছিল এই তিন জন। পলাতক থেকেই তারা আবারও দাদা বাহিনীর নামে সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজি কর্মকাণ্ড শুরু করেছে।

গোয়েন্দা তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহাদত হোসেন সুমন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা দাদা বাহিনীর আরও কয়েকজনের নাম-ঠিকানা পেয়েছি। তাদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে। একইসঙ্গে দাদা বাহিনীর দাদাকে শনাক্তেরও কাজ চলছে।’

ছিনতাই করা মোবাইল দিয়ে চাঁদাবাজি

পুলিশ জানায়, দুই ব্যবসায়ীর কাছে দাদা বাহিনীর চাঁদা দাবি ও মামলায় উল্লেখ করা মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। কিন্তু তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, চাঁদা দাবি করা মোবাইল ফোনটি ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোডের মেহেদী হাসান নামের এক ব্যক্তির। মাস তিনেক আগে মেহেদীর মোবাইলটি ছিনতাই হয়ে যায়। তবে এ ঘটনায় মেহেদী থানায় কোনও মামলা দায়েরও করেননি বা সিমটি বন্ধ করেননি। দাদা বাহিনীর সন্ত্রাসীরা ছিনতাইকৃ করা মোবাইল ফোন দিয়ে চাঁদাবাজি করছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (তেজগগাঁও বিভাগ) কর্মকর্তারা জানান, তারা তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় দুই ব্যবসায়ীকে হামলা, টাকা ছিনতাই ও চাঁদা দাবি করার ঘটনায় মামুন ও পাটোয়ারিকে শনাক্তের পর গ্রেফতার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মামুন ও পাটোয়ারি অনেক তথ্য দিয়েছে। তাদেরকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারলে এই বাহিনীর সবসদস্য ও শীর্ষ নেতাকেও গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।

 

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
হবিগঞ্জে নারীর মুখে এসিড নিক্ষেপ, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় প্রেরণ
হবিগঞ্জে নারীর মুখে এসিড নিক্ষেপ, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় প্রেরণ
বগুড়ায় দই বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা গুনলেন ব্যবসায়ী 
বগুড়ায় দই বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা গুনলেন ব্যবসায়ী 
৩৮ বছর বাড়ি ফিরে বিপদে জবেদ, স্ত্রী বললেন স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়
৩৮ বছর বাড়ি ফিরে বিপদে জবেদ, স্ত্রী বললেন স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়
বিপর্যয়ের মুখে সুন্দরবন
বিপর্যয়ের মুখে সুন্দরবন
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি