রাজশাহীর বাগমারায় আহমাদিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার আগেই লাশ দাফন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। কেউ কেউ জানতে চেয়েছেন লাশ দাফনে পুলিশের তাড়াহুড়োর কারণ। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, কোনও তাড়াহুড়ো করা হয়নি। খরচ বাঁচানোর জন্য লাশটি দাফন করা হয়েছে। একটি লাশ শনাক্ত করার জন্য যেসব আলামত সংগ্রহ করতে হয়, তা সব করা হয়েছে।
গত শুক্রবার জুম্মার নামাজের সময় বাগমারা উপজেলার মচমইল সৈয়দপুর এলাকার চকপাড়ায় আহমাদিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালায় অজ্ঞাত এই যুবক। ঘটনাস্থলেই বোমা বিস্ফোরণে ওই যুবক নিহত হন। এতে আহত হন অন্তত দশজন। তবে আত্মঘাতী হামলাকারীর পরিচয় নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। তার পরিচয় নিয়ে এখনও অন্ধকারে পুলিশ। তবে হামলাকারীর দ্রুত লাশ দাফন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এলাকাবাসী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। আর পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের পর হামলাকারীর লাশ রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে রাখা ছিল। সেখান থেকে রবিবার দুপুর ১২টার দিকে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ফাউন্ডেশনের অর্গানাইজার এনায়েত কবীর মিলন লাশ বুঝে নেন। এরপর দুপুর ২টার দিকে বেওয়ারিশ হিসেবে লাশটি দাফন করা হয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাজশাহীর বাগমারায় একেবারে বর্ডার এলাকায় মসজিদে আত্মঘাতী হামলার ঘটনা ঘটল। হামলাকারীর কোনও পরিচয় পাওয়া যায়নি। এটা আরও উদ্বেগের বিষয়। তার ছবি পত্রিকায় প্রকাশ করা উচিৎ ছিল। যাতে কেউ তাকে চিনতে পারে কিনা। তা করা হলো না। আমরা তো সন্দেহ হচ্ছে সে বর্ডারের ওপার থেকে আসছে। কারণ ভারত সরকার বলেছে জেএমবির বড় একটি শক্তিশালী ঘাটি তাদের বর্ডারকেন্দ্রিক। রাজশাহীর সঙ্গে ভারতের বড় একটি সীমান্ত এলাকা রয়েছে। সীমান্তের ওই পাশ থেকেও আসতে পারে। কারণ আমাদের কোনও পরিচয়পত্র নেই। পরিচয়পত্র তৈরি করা হয়েছে। তবে তা এখনও বাধ্যতামূলক করা হয়নি। তাই মানুষ সঙ্গে পরিচয়পত্রও রাখে না। পরিচয়পত্রগুলো আমাদের বাধ্যতামূলক করা উচিৎ।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই লোকটাকে যদি আমাদের দেশের কেউ না চেনে তাহলে এটা নতুন দিক হবে। চিনবে কি করে সেতো বাইরের লোক। বাহির থেকে আরও লোক আসবে। বর্ডারে এরকম লোক ধরা পড়ছে না। ধরা পড়ছে নিরীহ মানুষ। এরা দেশের ভেতরে ছড়িয়ে পড়েছে। এরা বর্ডারের বাহির থেকে আসছে।’
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘কিছুদিন আগেও ভারত সরকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বলছে। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গুরুত্ব দেয়নি। তারা যে কোনটাকে গুরুত্ব দেয় তাও বোঝা যাচ্ছে না।’
বাগমারা উপজেলার সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে মচমইল বাসস্ট্যান্ড। মূলসড়ক থেকে কাঁচা রাস্তা ধরে আধা কিলোমিটার পথ অতিক্রম করলে আত্মঘাতী বোমা হামলা স্থানে পৌঁছানো যাবে। এখানে ১২ হাত দূরত্বে দুটি মসজিদ রয়েছে। একটি আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ও অপরটি আহলে হাদিস অনুসারীদের।
আহমাদিয়া সম্প্রদায়ের মুসল্লিরা জানিয়েছেন, শুক্রবার জিনস প্যান্ট ও কালো জ্যাকেট পরিহত এক যুবক মসজিদে প্রবেশ করেন। অর্ধশতাধিক আহমদিয়া সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষের মধ্যে এই যুবকটি ছিলেন অপরিচিত। কেউ জানে না কেন এই যুবকটি মসজিদে এসেছিলেন। বিষয়টি তাদের প্রথমে নজরে আসে জুম্মার নামাজের আজানের পরপরই।
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাহেব আলী জানালেন, আত্মঘাতী হামলাকারীকে অপরিচিত দেখে জিজ্ঞাসা করি। জবাবে তিনি বলেন, বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে এসেছি। বাড়ি মোহনপুর। রাজশাহী পলিটেনিক ইন্সটিটিউটে পড়ালেখা করি।’ সাহেব আলীর আলাপচারিতায় অন্যরা তার দিকে তেমন নজর দেয়নি। মসজিদের ইমাম ও আহমদিয়া মুসলিম জামাত বাগামারার সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘খুদবা দেওয়ার সময় বহিরাগত ছেলেটিকে সাহেব আলীর সঙ্গে আলাপ করতে দেখি। এরপর আমি তার আত্মীয় ভাবতে শুরু করি।’
বেওয়ারিশ লাশ দাফনের বিষয়ে পুলিশ ও আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সূত্রে জানা গেছে, বেওয়ারিশ লাশ দাফনের ক্ষেত্রে সাধারণত তিনদিন অপেক্ষা করা হয়। যদি লাশ গলিত, অর্ধগলিত, ক্ষতবিক্ষত হয় তাহলে তা দ্রুত দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। এক্ষেত্রে লাশের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। তারপর দাফন করা হয়। তবে আদালতের কোনও নির্দেশনা থাকলে লাশ হিমাগারে রাখা হয়। এছাড়া লাশ দাফনের বিষয়টি পুলিশের ওপরই নির্ভর করে।
এদিকে লাশ দাফনের বিষয়ে রাজশাহীর বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মতিয়ার রহমান বলেন, ‘বেওয়ারিশ লাশ দাফনের বিষয়ে কোনও টাইমফ্রেম নেই। লাশ হিমাগারে রাখলে আমাদের অনেক খরচ হয়। নিহতের পরিচয় শনাক্ত করতে যেসব আলামত সংগ্রহ করতে হয় তা সব রাখা হয়েছে। তার ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনার সঙ্গে কে বা কারা জড়িত তা বের করার চেষ্টা চলছে। তদন্তের স্বার্থে এর বেশি কিছু বলা যাবে না।’
বাগমারায় আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী পরিচয় চিহ্নিত হয়নি বলে জানিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘হামলাকারী চিহ্নিত না হওয়ায় পর্যন্ত এ হামলার সঙ্গে কে বা কারা জড়িত তা স্পষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে বাগমারা অঞ্চলে এক সময় যেহেতু জেএমবি আধিপত্য ছিল, সেজন্য জেএমবি’র বিষয়টি মাথায় রেখে তদন্ত কাজ এগিয়ে চলছে।’
তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়ে আর কিছু জানাতে রাজি হননি পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
এদিকে গত চারদিনেও এ ঘটনায় কেউ আটক অথবা গ্রেফতার না হওয়ার স্থানীয়দের মধ্যে সেই আতঙ্ক আরও বেড়েছে। এখন পর্যন্ত মসজিদটি তালাবদ্ধ রয়েছে। তবে পুলিশ পাহারায় মুসল্লীদের নামাজ আদায় করতে দেখা গেছে।
/এআরআর /এএইচ /
/আপ: আরএ/








