তিন দশক পর বাংলাদেশে সুদের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, তিন বছরের ব্যবধানে আমানতের ওপর সুদের হার কমেছে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ। ২০১২ সালে আমানতের ওপর সুদ ছিল সাড়ে ১২ থেকে ১৪ শতাংশ। ২০১৩ সালের জুলাই মাসে আমানতের গড় সুদের হার ছিল ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। এখন সেই হার নেমে গেছে সাড়ে ৬ শতাংশেরও নিচে। এ অবস্থায় ব্যাংকও উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে আগের মতো ১৬ শতাংশ হারে বা তারও বেশি হারে সুদ নিতে পারছে না। ব্যবসায়ীরা ঋণ নেওয়া থেকে বিরত থাকায় তিন বছরে ঋণের সুদের হার প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে ব্যাংকগুলো। বর্তমানে উদ্যোক্তাদের ঋণের সুদ গুনতে হচ্ছে ১১ দশমিক ২৭ শতাংশ হারে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিগত তিন দশক পরে সার্বিকভাবে এখন সুদের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। ১৯৮৫ সালের পর এখন সব চেয়ে কম সুদের হার। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণে সুদের হার কমা খুব জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঋণে সুদের হার কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। সামনে সুদের হার আরও কমবে বলে তিনি আশা করেন।
এদিকে, আমানতে সুদ হার কমার পরিপ্রেক্ষিতে ঋণেও সুদ কমে যাচ্ছে। সর্বশেষ নভেম্বর ২০১৫ পর্যন্ত ঋণে সুদ হার কমে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ২৭ শতাংশ। আগস্ট মাসে ছিল ১১ দশমিক ৩৫ শতাংশ, জুলাইতে ছিল ১১ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এ অবস্থায় আমানতেও সুদের হার কমে যাচ্ছে। বর্তমানে ৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ সুদে ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহ করছে। এর ফলে ব্যাংকে সঞ্চয় রাখা ব্যক্তিরা পড়েছেন বিপাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাংকগুলো গড়ে ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ সুদে আমানত নিয়েছে। যা আগস্ট শেষে ছিল ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ। তার আগের মাস জুলাইয়ে আমানত নিয়েছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ সুদে। তার আগের মাসে (জুন) আমানতে গড় সুদ ছিল ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ।
অন্যদিকে, সেপ্টেম্বরে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে ১১ দশমিক ৪৮ শতাংশ সুদে। যা আগের মাস আগস্টে ছিল ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ সুদে। এর আগের মাস জুলাইয়ে সুদহার ছিল ১১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। আর তার আগের মাসে (জুন) ঋণ বিতরণ করেছিল ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ সুদে। অর্থাৎ আমানতের পাশাপাশি ঋণের সুদহারও কমছে।
এ প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান-বিআইডিএসের গবেষক ড. জায়েদ বখত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমানতে সুদ হার কমার কারণে ঋণেও সুদ হার কমছে। এক্ষেত্রে আমানতকারীদের সরকারী সঞ্চয়পত্রের দিকে যাওয়া উচিত। বিশেষ করে যারা ব্যাংকে টাকা রেখে সংসার চালান। কারণ, বাণিজ্যিক ব্যাংক তো নিজের ক্ষতি করে কোনও আমানতকারীকে লাভ দেবে না। আর এই ধরনের আমানতকারীর সংখ্যাও খুব বেশি নয়। তিনি বলেন, সরকার ইচ্ছে করলে, যারা পেনশনভোগী, বিশেষ করে যাদের বয়স বেশি, তাদের একটি কাঠামোতে এনে বিশেষ বিবেচনায় বেশি সুদ দিয়ে সহযোগিতা করতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টার প্রেস নেটওয়ার্ক-আইপিএনের গবেষণায়ও দেখা গেছে, তিন বছরের ব্যবধানে ব্যক্তি-পর্যায়ে আমানতে সুদ থেকে আয় অর্ধেকে নেমে গেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিষ্ঠানটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২ সালে কোনও ব্যক্তি কোনও বাণিজ্যিক ব্যাংকে ১০ লাখ টাকা রাখলে, ব্যাংক তাকে প্রতি মাসে সুদ বাবদ ১০ হাজারেরও বেশি টাকা দিত। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংক ১০ লাখ টাকার বিপরীতে প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকাও দিতে পারছে না। বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভালো না থাকায় ব্যাংকের আয় কমে গেছে। যার ফলে ব্যাংকগুলো আমানতে সুদ কমাতে বাধ্য হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আইপিএনের গবেষক আনোয়ারুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মধ্যবিত্ত্ব শ্রেণির অনেকে আছেন, যারা ব্যাংকে টাকা রেখে সংসার পরিচালনা করেন। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অবসর নেওয়া অনেকেই ব্যাংকে টাকা রেখে তার বিপরীতে পাওয়া সুদের অর্থ দিয়ে সংসার চালান। বিনিয়োগ না থাকায় বর্তমানে ব্যাংকগুলোয় বিপুল অংকের টাকা ‘অলস’ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এ অবস্থায় ব্যাংক আমানতে সুদ হার কমিয়েছে। অধিকাংশ ব্যাংক এখন আমানতে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ হারে সুদ দিচ্ছে। এর ফলে যেসব ব্যক্তি ব্যাংকের সুদের ওপরে নির্ভর করতেন, তারা এখন আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
এদিকে, চলতি মাসের শেষে অথবা আগামী মাসে সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালীসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত সুদহার কমাবে। এ প্রসঙ্গে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার দত্ত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঋণে সুদহার কমানোর জন্য সোনালী ব্যাংক অনেক দিন ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছে। সোনালী ব্যাংকের বোর্ডও নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ফাইল তৈরি করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আশা করা যায়, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে সোনালী ব্যাংক কম সুদহার প্রয়োগ করতে পারবে।
জানা গেছে, সুদহার ঘোষণার সময় বেসরকারি ব্যাংকগুলো সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ সুদহার নিজেরাই ঘোষণা করে। এর ফলে গ্রাহক ভেদে তারা ভিন্ন সুদ নিতে পারে। বিশেষ করে যথাসময়ে ঋণ পরিশোধ করেন এমন উদ্যোক্তাকে কম সুদে ঋণ দেয়।
সূত্র জানায়, আমানতের সুদহার কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি বাজার থেকে টাকা তুলে নেওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। এতে করে কলমানির সুদের হারও অর্ধেক কমে গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তিন বছরের ব্যবধানে ঋণে সুদ হার কমেছে ৫ শতাংশের কাছাকাছি। ২০১২ সালে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে উদ্যোক্তাদের ১৬ শতাংশ বা তারও বেশি সুদে ঋণ নিতে হতো। আবার আমানতকারীদের সুদ দিতে হতো ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ হারে। এ কারণে ২০১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স ব্যাংলাদেশ (এবিবি) বেসরকারি ব্যাংকের জন্য চলতি মূলধন ও মেয়াদি ঋণে সর্বোচ্চ ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং আমানত সংগ্রহে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকও ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত সুদ হারের বাইরে আমানত ও ঋণের ওপর সুদ হার আরোপ না করার কঠোর নির্দেশনা দেয়। এই নির্দেশায় উল্লেখ করা হয়, সম্প্রতি দেখা গেছে—কোনও কোনও ব্যাংক স্থায়ী বা মেয়াদি আমানতের ওপর ঘোষিত সুদ হারের বাইরেও অধিক হারে সুদ বা মুনাফা দিচ্ছে। এ অবস্থায় এক কোটি বা তার বেশি অংকের স্থায়ী বা মেয়াদি আমানতের তালিকা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিনিয়োগ পরিবেশ ভালো না থাকা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের টানা ৫ বার নিয়ন্ত্রণমূলক মুদ্রানীতি প্রয়োগের ফলে ব্যাংকে অলস টাকার পাহাড় জমে। উদ্যোক্তাদের মধ্যেও আস্থার অভাব দেখা দেয়। এ সময়ে ঋণের চাহিদা কমে যায়। কিন্তু আমানতের সুদ দিতে গিয়ে বিপাকে পড়ে ব্যাংক। পরে বাধ্য হয়ে ব্যাংকগুলো আমানতের ওপর সুদের হার কমাতে থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক ঋণ বিতরণে গড়ে ১১ দশমিক ২৭ শতাংশ সুদ আদায় করলেও কিছু কিছু ব্যাংক ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করছে। ব্যাংকগুলোর ঋণ-তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বড় ও মাঝারি শিল্পের মেয়াদি ঋণে কয়েকটি ব্যাংক এখনও ১৫ শতাংশের বেশি হারে সুদ নিচ্ছে। একই অবস্থা চলতি মূলধনের বেলায়ও। বড় ও মাঝারি শিল্পের জন্য চলতি মূলধনের সুদহার রয়েছে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত। দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের মতো বাংলাদেশ ব্যাংকও মনে করে, দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির জন্য ঋণের সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
/এমএনএইচ/আপ-এনএস/







