খেটে খাওয়া মানুষ দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমাচ্ছিলেন। দিনের আলো ফুটতে আর কয়েক ঘণ্টা বাকি। ঠিক তখনই আগুন। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের চিৎকারে ঘুম ভাঙে সবার। আগুন আর ধোয়ায় আচ্ছন্ন পুরো বস্তি। প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছেন সবাই। অনেকেই এক কাপড়ে বেরিয়ে গেছেন ঘর থেকে। আগুন যখন ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ এনেছে, ততক্ষণে পুড়ে গেছে দেড় শতাধিক ঘর।
রবিবার (৬ জুন) দিবাগত রাত ৪টার দিকে মহাখালীর সাততলা বস্তিতে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
অবৈধ গ্যাস ও বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন। সোমবার (৭ জুন) সকাল ৭টায় ঘটনাস্থলে ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, ‘আমরা অগ্নিকাণ্ডের খবর পাই ভোর ৩টা ৫৯ মিনিটে। আমাদের প্রথম ইউনিট ৪টা ১২ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং তখন থেকে আমরা কাজ করছি। পরে ভোর ৬টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।’
সাততলা বস্তিতে বসবাসকারী মানুষ সবাই শ্রমজীবী। রিকশাচালক, শ্রমিক, দিনমজুর, পোশাক শ্রমিকসহ অসংখ্য নিম্ন আয়ের মানুষ বসবাস করেন এখানে। রবিবার (৬ জুন) দিনের কাজ শেষে সবাই ঘুমাচ্ছিলেন। হঠাৎ মানুষের চিৎকার ও পোড়া গন্ধে ঘুম ভাঙে পোশাক শ্রমিক আকলিমার। তিনি তার খালার সঙ্গে বস্তিতে থাকেন।
আকলিমা বলেন, ‘হঠাৎ আগুন। এত তাপ আগুনের, দুইশ গজ দূরেও দাঁড়ানো যাচ্ছিল না। কোনোরকম জান নিয়ে বের হয়ে এসেছি। ঘরের সব দামি জিনিস পুড়েছে। কিছু নিয়ে বের হতে পারিনি। আগুনের কারণে কিছু নিতে যে আর যাবো তাও সাহস করিনি। চোখের সামনে দেখেছি, সব পুড়েছে। মনে হলো কোনও কিছু দিয়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে কেউ।’
ফায়ার সার্ভিস প্রথমে বেশি পানির গাড়ি নিয়ে এলে এত ঘর পুড়তো না বলেও অভিযোগ করেছেন বস্তিবাসীদের কেউ কেউ। শাহ আলম নামে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমার ৯ বছরের সংসারের জিনিসপত্র সব পুড়েছে। কিছু বের করতে পারিনি। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রথমে কম ছিল। পরে বেড়েছে। আগেই যদি বেশি পানির গাড়ি নিয়ে আসতো, তাহলে এত ঘর পুড়তো না।’
তবে ফায়ার সার্ভিসের ডিজি বস্তিবাসীদের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘বস্তিতে টিনের ঘর, সেপারেশন বেশি হওয়াতে আমাদের আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আমাদের ১৮টি ইউনিট কাজ করেছে। আগুন আপাতত নিয়ন্ত্রণে আছে। এখন পর্যন্ত আগুনে কোনও হতাহতের ঘটনা আমাদের চোখে পড়েনি। এখন পর্যন্ত যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা বলা চলে একশ’র ওপরে ঘর পুড়ে গেছে। ঘরে থাকা আসবাবপত্র পুড়ে গেছে।’
অনেকে ঘর থেকে কিছু জিনিসপত্র বের করতে পারলেও তারা ভোর রাত থেকে সড়কে বসে আছেন। সকাল ৯টা পর্যন্ত কোনও ত্রাণ বা সহায়তা কেউ পাননি। অনেকেই আগুন নেভাতে গিয়ে দৌড়াদৌড়িতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। বিপুল নামে এক তরুণ জানান, তিনি বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে বের হয়েছেন। ঘরে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার ছিল, তা বের করতে পারেননি। তাদের পাশটাতেই আগুনের সূত্রপাত হয়।
আগুন কীভাবে লেগেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই ঘুমে ছিলাম, হঠাৎ দেখি আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে। কী করবো বুঝতে পারছিলাম না। কোনোরকম জান নিয়ে, বাবা-মাকে নিয়ে বের হয়েছি। মনে হলো আগুনে কোনও কিছু ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাই জ্বলছে।’ তিনিও বুজছেন না, কীভাবে আগুন হঠাৎ বেড়ে গেলো। তার সন্দেহ হয় বস্তি উচ্ছেদের জন্য কেউ আগুন দিয়েছে কিনা।
আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে ফায়ার সার্ভিস কী মনে করছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখানে প্রচুর পরিমাণে অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন রয়েছে। আমরা প্রাথমিকভাবে মনে করছি, এই দুইটার যেকোনও একটি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।’
২০১২ সালে এই বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এরপর ২০১৫, ২০১৬, ২০১৯ এবং ২০২০ সালেও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস তদন্তে করে প্রতিবারই আগুনের কারণ হিসেবে অবৈধ বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগকে দায়ি করেছে।








