অপরাধ ঢাকতে বিভিন্ন ধরনের ছলচাতুরির আশ্রয় নেয় অনেক অপরাধী। ঘটনার পর কেউ পালিয়ে যায় আবার কেউ নিজেকে নির্দোষ দেখাতে ঘটনাস্থলেই অবস্থান করে। বিভিন্ন ঘটনা তদন্তে এবং সন্দেহভাজন অপরাধীকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় কাউন্সেলিংকে গুরুত্ব দিচ্ছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনা তদন্তে আটক আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় কাউন্সেলিং করে সাফল্য পেয়েছে তারা। এই মোটিভেশন ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে অনেক ঘটনার জট খুলে অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসছে সংস্থাটি। বাহিনীর নিজস্ব কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কিংবা সাইকিয়াট্রিস্ট না থাকলেও তদন্তকারী কর্মকর্তারা নিজেরাই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সফলতা পাচ্ছেন।
সম্প্রতি এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় লাশ উদ্ধারের ক্ষেত্রে কাউন্সেলিংকে গুরুত্ব দিয়ে সফলতা পেয়েছে পিবিআই’র তদন্তকারী কর্মকর্তারা। পিবিআই বলছে, চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান শ্বশুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে শরীয়তপুর যাওয়ার কথা বলে বের হবার পর নিখোঁজ হন স্বর্ণ ব্যবসায়ী অনুপ বাউল (৩৪)। খোঁজাখুঁজির পর তাকে না পেয়ে তার ছোট ভাই বিপ্লব বাউল সিরাজদিখান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় একটি মামলা করেন তিনি। থানা পুলিশ তিন মাস তদন্তের পরও এর কোনো অগ্রগতি না থাকায় মামলাটির দায়িত্ব দেওয়া হয় পিবিআই, ঢাকা জেলাকে। দায়িত্ব পেয়ে এসআই সালেহ ইমরান মামলাটির তদন্ত শুরু করেন। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক সমস্যা, পূর্ব শত্রুতার জের এসব বিষয় মাথায় রেখে তিনি মামলাটির তদন্ত শুরু করেন।
তদন্ত করতে গিয়ে এবং বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে তার ব্যবসায়িক পার্টনার নয়নকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তিনি। এছাড়াও এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে রিপন পীযূষ দিলীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে প্রথমে অনুপ বাউল নিখোঁজের ঘটনার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেন তারা। তবে তদন্ত কর্মকর্তার মোটিভেশন এবং কাউন্সেলিংয়ের কারণে জিজ্ঞাসাবাদে তারা এক পর্যায়ে এ হত্যাকাণ্ডের কারণ এবং লাশ কোথায় রাখা হয়েছে সে তথ্য দেয়।
আসামিদের বরাত দিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সালেহ ইমরান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আসামিরা এমনভাবে মাটিতে লাশ পুঁতে রেখেছিল যে না দেখিয়ে দিলে কেউ জানতে পারবে না। এ ঘটনায় পার পেয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তারা অনেকটা নিশ্চিত ছিল। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কোনভাবেই এই ঘটনার কথা বা তথ্য কোন বাহিনী বা অন্য কাউকে তারা দেবে না। পরে তাদেরকে বুঝিয়ে এবং কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে এ ঘটনার জট খুলতে সক্ষম হই আমরা।
আমাদের কাছে হত্যার কারণ ও হত্যার বর্ণনা দিয়েছে তারা। এছাড়া আদালতেও এ ঘটনার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। আদালতকে তারা জানিয়েছে, এ ঘটনার জন্য তারা অনুতপ্ত। জিজ্ঞাসাবাদে একসময় তারা তাদের পরিবার সম্পর্কে ভেবেছে। একটা সময়ে গিয়ে তারা খুব অস্বস্তিতে পড়ে যায়। তাদের আচরণগত অনেক অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, আট বছর ধরে অনুপ বাউলের ব্যবসায়িক পার্টনার নয়ন। আর এই নয়নের মাধ্যমে বিভিন্ন সময় টাকা-পয়সা ধার নিতো রিপন। মূলত পাওনা টাকার জন্যই বিরোধ শুরু হয় তার ব্যবসায়িক পার্টনার নয়নের সাথে। আর এই কারণেই নয়ন তারই চাচাতো ভাই রিপন, পীযূষ ও দিলীপকে নিয়ে অনুপকে খুনের পরিকল্পনা করে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী খুন করে। খুন করার পর লাশ ড্রামে ভরে বালুর মাঠে নিয়ে ভেকু দিয়ে ১৬ ফিট গভীর করে মাটি চাপা দেয়। পরে তাদের কাছ থেকে তথ্যের ভিত্তিতে লাশ উদ্ধার করা হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআই ঢাকা জেলার এসআই সালেহ ইমরান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তদন্তের ক্ষেত্রে রহস্য উদঘাটনে আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় কাউন্সিলিং এবং মোটিভেশনকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। কাউন্সেলিংকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের ক্ষেত্রে অনেকগুলো মামলার সফলতা পেয়েছি।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআই’র মহাপরিচালক বনজ কুমার মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, একটি অপরাধ সংঘটিত হলে সে অপরাধের বিভিন্ন দিক থাকে। তদন্তের ক্ষেত্রে যখনই সবদিক বিবেচনা করা হয়, তখনই সে ঘটনার তদন্তের ক্ষেত্রে সফলতা পাওয়া যায়। এবং অপরাধীর কাছ থেকে কথা বের করার জন্য অপরাধীকে বিভিন্ন সময়ে কাউন্সেলিং এবং মোটিভেশন দেওয়া হয়। আর এই কাউন্সেলিং বা মোটিভেশনের মাধ্যমে অনেক মামলায় আমরা সফলতা পাচ্ছি।
পিবিআই ঢাকা মেট্রোর (দক্ষিণ) পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যেসব মামলার রহস্য উন্মোচন করা যাচ্ছে না সেগুলো আসে পিবিআইয়ের কাছে। সেসব মামলা আমরা আমলে নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এবং মামলাগুলোর মোটিভ সম্পর্কে জানার পর তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি আমাদের কাছে থাকা মামলাগুলোর সঠিক তদন্ত এবং এ ঘটনার সাথে জড়িত সকল অপরাধীকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার। অপরাধের মোটিভ বুঝে আমরা অপরাধীদের জিজ্ঞাসাবাদের ধরন নির্ধারণ করি। যদি মনে হয়, আসামিকে কিংবা অপরাধীকে মোটিভেশন কিংবা কাউন্সিলিং করলে তার কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার সম্ভব— আমরা সে প্রক্রিয়া অনুসরণ করি।
পিবিআই সিলেট জেলার পুলিশ সুপার মো. খালেদ উজ জামান বলেন, অপরাধীকে যখন আইনের আওতায় নিয়ে আসি তখন তাদের কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য ভেরিফাই করি আমরা। তারা বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দিচ্ছে কিনা যাচাই-বাছাই করি। মামলার মোটিভ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করি। জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সর্তকতা অবলম্বন করে থাকি। মামলার তদন্ত করতে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে মোটিভেশন কিংবা কাউন্সেলিং অনেক ক্ষেত্রে সফলতা এনে দিচ্ছে।







