ই-টিকিটিংয়ে অনীহা বাস মালিকদের, যাত্রীদের ক্ষোভ

মাহফুজ সাদি
২১ অক্টোবর ২০২২, ১০:০০ আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২২, ১০:০০

রাজধানীর গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে আটটি পরিবহন কোম্পানিতে পরীক্ষামূলকভাবে ই-টিকিটিং চালুর পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া এসেছে। এই ব্যবস্থায় লাভ কম হওয়ায় বাসের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন মালিকরা। এদিকে স্বাভাবিকের চেয়ে উল্টো বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করে ভোগান্তি বাড়ার কথা জানিয়েছেন যাত্রীরা। সবমিলিয়ে বাসের ই-টিকিটিং এখন কাঠগড়ায়!

উত্তরা থেকে নিয়মিত শ্যামলী যাওয়া মো. আতাউল্লাহ বলছেন, আগে ৪০ টাকা নিতো। এখন ই-টিকিটিং-এ নিচ্ছে ৫০ টাকা। আবার ভাংতি নেই বলে ২-৩ টাকা বেশিও নিচ্ছে টিকিট বিক্রেতারা। এই ব্যবস্থায় ঝামেলা বেশি। এই রুটে বাসের সংখ্যা কমে যাওয়ায় আসনের তুলনায় অনেক বেশি যাত্রী যাতায়াত করছেন। সব মিলিয়ে ই-টিকিটিংয়ে যাত্রীদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে। রহিমা বেগম নামের আরেক যাত্রী বলেন, ভিড়ের মধ্যে পুরুষরা তো হুড়োহুড়ি করে গাড়িতে উঠতে পারেন, নারীরা পড়েন বিপাকে। আবার গাড়িতে ওঠার পরে সিট পান না তারা। তবে তারা দুইজনই বলেছেন, ই-টিকিটিং ব্যবস্থা ভালো হলেও পরিবহনের অব্যবস্থাপনায় সুফল মিলছে না।

ভাড়ায় অনিয়মের অভিযোগ করে ই-টিকিটিংকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে জোবায়ের আহমেদ নামে একজন যাত্রী বলছেন, মিরপুর লিংক পরিবহনে মিরপুর-১১ নম্বর থেকে ধানমণ্ডি-৩২ নম্বরের আগের ভাড়া ছিল ৩০ টাকা। ই-টিকিটিংয়ে ৮ টাকা বাড়িয়ে এখন নেওয়া হচ্ছে ৩৮ টাকা। টিকিটের জন্য ৪০ টাকা দিলে ‘খুচরা নেই’ বলে বাকি দুই টাকাও দেওয়া হয় না অনেক সময়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো- যারা টিকিট ছাড়া গাড়িতে ওঠেন, তাদের কাছে থেকে ৩০ টাকাই ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে ঢাকা মহানগরীতে চলাচল করা আটটি কোম্পানির বাসে ই-টিকিটিং চালু রয়েছে। চলতি মাসে আরও ১৬টি পরিবহনের বাসে এই ব্যবস্থা চালুর প্রক্রিয়া চলছে। তবে আগে যত সংখ্যক গাড়ি সড়কে চলাচল করতো, ই-টিকিট চালু হওয়ার পর সেই সংখ্যা কমেছে। প্রায় প্রতিটি কোম্পানির বেশ কিছু বাস কোনও কারণ ছাড়াই এই ব্যবস্থায় আপত্তি থাকায় বসিয়ে রাখা হচ্ছে। ই-টিকিটিংয়ে চলা বাসে দূরত্বের ব্যবধান অনুযায়ী স্বাভাবিকের চেয়ে ৫-১০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

পরিস্থান পরিবহনের অন্তত তিন জন ড্রাইভার ও হেলপার বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, চুক্তিভিত্তিকের চেয়ে ই-টিকিটিংয়ে মালিকদের লাভ কম হওয়ায় কেউ কেউ বাস রাস্তায় নামাচ্ছেন না। কেউ কেউ বাসের পরিবহনের নাম পাল্টে অন্য নামে চালাচ্ছেন। অনেক মালিক অনিহা থাকা সত্ত্বেও বাস নামিয়েছেন সড়কে। ই-টিকিটিংয়ে বাড়তি আয় বন্ধ হয়ে গেছে পরিবহন শ্রমিকদেরও। সব মিলিয়ে এই ব্যবস্থায় উৎসাহী নন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। যার প্রভাব এরইমধ্যে পড়তে শুরু করেছে। ফলে যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়েছে।

প্রজাপতি পরিবহনের একজন বাস মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় ই-টিকিটিং ব্যবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছেন তারা। কম ভাড়ার টিকিট কেটে বেশি দূরত্বে যাচ্ছেন যাত্রীরা। এই ব্যবস্থায় আয় কমেছে তাদের। যাত্রীরা লাইনে না দাঁড়িয়ে হুড়োহুড়ি করে গাড়িতে উঠছেন। তাতে ভোগান্তি হচ্ছে। যারা পুষিয়ে উঠতে পারছেন না, তারা বাস বন্ধ রাখছেন। যারা ই-টিকিটিংয়ের আওতায় নেই তারাই ভালো আছেন। এই ব্যবস্থা হয় সবার জন্য বাধ্যতামূলক করতে হবে, নাহলে ব্যবস্থাটি বাদ দেওয়া উচিত। অন্যথায় এভাবে চলতে থাকলে সমস্যা আরও বাড়বে।

বাস মালিক ও শ্রমিকদের দেওয়া তথ্যমতে, আগে চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থায় প্রতিদিন বাসপ্রতি ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা বা এর কাছাকাছি মতো পেতেন মালিককরা। ই-টিকিটিংয়ে এখন ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা বা এর কাছাকছি পাচ্ছেন তারা। আগে প্রতি ট্রিপে চালক, কন্ডাকটর ও হেলপার ৩৫০ টাকা করে পেতেন। সঙ্গে ছিল ‘ধান্দার’ বাড়তি আয়। এখন তিন ট্রিপে ১৬০০ থেকে ১৯০০ টাকা পাচ্ছেন তারা, ধান্দা বন্ধ।

ই-টিকিটিং চালুর উদ্যোগ নেওয়া ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির দুইজন নেতার দাবি, ভালোভাবেই চলছে এই ব্যবস্থা। কিছু বাস মালিক-শ্রমিক অসহযোগিতা করলেও তা ঠিক হয়ে যাবে। ই-টিকিটিংয়ে বাস না চালাতে কিছু মালিক গাড়ির নাম পাল্টানোর চেষ্টা করলে চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। তবে সব গণপরিবহনে এই ব্যবস্থা চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত কিছু সমস্যা থাকবেই।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক আইনজীবী মাহবুবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ভাড়া নির্ধারিত চার্টের বেশি নেওয়ার বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নেবো। বিষয়টি সত্যি হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাস্তায় গাড়ি কম নামানোর বিষয়টি হচ্ছে– অনেক মালিক ১৫০০-২০০০ টাকাও পাচ্ছে না প্রতিদিন। ফলে না পোষানোর কারণে গাড়ি নামাচ্ছে না কেউ কেউ। আমরা সব গাড়িতে ই-টিকিটিং চালুর চেষ্টা করছি। তাহলে সমস্যগুলো সমাধান হয়ে যাবে আশা করি। 

জ্বালানি তেলের দাম কমায় গত ৩১ আগস্ট গণপরিবহনের মালিকদের সঙ্গে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করতে বৈঠকে বসে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। পরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে ই-টিকিটিং চালুর ঘোষণা আসে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহর কাছ থেকে। এই ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে সব বাসে বাধ্যতামূলক হবে বলেও জানান তিনি।

সে অনুযায়ী, বাস মালিকদের সঙ্গে কথা বলে শেষমেশ ২২ সেপ্টেম্বর পরীক্ষামূলকভাবে চারটি কোম্পানির বাসে ই-টিকিটিং চালুর উদ্যোগ নেয় ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। এতে নির্দিষ্ট দূরত্ব অনুযায়ী কিলোমিটারপ্রতি সরকার নির্ধারিত হারে ভাড়া নেওয়ার কথা বলা হয়। এটিকে শুরুতে অনেকে ভালো উদ্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও এখন উল্টো ভাড়া বেশি নেওয়ার অভিযোগ করছেন যাত্রীরা। সেইসঙ্গে ভোগান্তি বেড়েছে উল্লেখ করে রীতিমতো ক্ষোভ জানিয়েছেন তারা।

/এফএস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ডেঙ্গু রোগী সামাল দিতে ফিল্ড হাসপাতালের পরিকল্পনা
ডেঙ্গু রোগী সামাল দিতে ফিল্ড হাসপাতালের পরিকল্পনা
ব্যাংকের কার্ড-এটিএম সেবা বন্ধ, লাখ লাখ গ্রাহক ভোগান্তিতে
ব্যাংকের কার্ড-এটিএম সেবা বন্ধ, লাখ লাখ গ্রাহক ভোগান্তিতে
তিন ছিনতাইকারীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ সমাজের প্রতি মেসেজ: পর্যবেক্ষণে বিচারক
তিন ছিনতাইকারীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ সমাজের প্রতি মেসেজ: পর্যবেক্ষণে বিচারক
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচ দেখবেন যে উপায়ে
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচ দেখবেন যে উপায়ে
সর্বাধিক পঠিত
একসঙ্গে ১৯ ব্যাংকের কার্ড-এটিএম সেবা বন্ধ, ভোগান্তিতে পড়তে পারেন গ্রাহক
একসঙ্গে ১৯ ব্যাংকের কার্ড-এটিএম সেবা বন্ধ, ভোগান্তিতে পড়তে পারেন গ্রাহক
জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি, আজ গুলি করে হত্যা: বাঁচাতে পারেনি পুলিশ
জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি, আজ গুলি করে হত্যা: বাঁচাতে পারেনি পুলিশ
কোয়েল মল্লিক কত টাকার মালিক, জানা গেলো হলফনামায়
কোয়েল মল্লিক কত টাকার মালিক, জানা গেলো হলফনামায়
‘৫ লাখ টাকাই লাগবে, এটা ভিপি নুরের নির্দেশ’ অডিও ভাইরাল: যুব অধিকারের সভাপতি বহিষ্কার
‘৫ লাখ টাকাই লাগবে, এটা ভিপি নুরের নির্দেশ’ অডিও ভাইরাল: যুব অধিকারের সভাপতি বহিষ্কার
বিশ্বমঞ্চে চমক দেখালেন সাতক্ষীরার মেয়ে পারমিতা, মা বললেন ‘আনন্দ প্রকাশ করার মতো নয়’
বিশ্বমঞ্চে চমক দেখালেন সাতক্ষীরার মেয়ে পারমিতা, মা বললেন ‘আনন্দ প্রকাশ করার মতো নয়’