গত ৭ মে রাজধানীর আহম্মদ ফায়ার আর্মস কোম্পানিতে অস্ত্র কিনতে যান জাহিদুল ইসলাম। বৈধভাবে অস্ত্র কিনতে হলে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ও জাতীয় পরিচয়পত্র লাগে। দুটি কাগজই দেন জাহিদুল। কিন্তু সেগুলো যাচাই না করে জাহিদুলের কাছে ৭৭ রাউন্ড কার্তুজসহ অ্যাকশন শটগান বিক্রি করে আহম্মদ ফায়ার আর্মস কোম্পানি। এরপর বিধি অনুযায়ী অস্ত্র কেনার সময় দেওয়া ঠিকানায় ভেরিফিকেশনের জন্য গেলে এই নামে কোনও ব্যক্তিকে খুঁজে পায়নি পুলিশ। তার দেওয়া মোবাইল ফোন নম্বরও বন্ধ পাওয়া যায়। পুলিশ অস্ত্র বিক্রেতা কোম্পানির স্বত্বাধিকারী আহসান উদ্দিন আহম্মদকে এই তথ্য জানালে তিনি জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ওই ক্রেতার দেওয়া লাইসেন্স ও পরিচয়পত্র ভুয়া।
আহসান উদ্দিন আহম্মদ বাদী হয়ে গত ২৬ জুন পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পরে এ মামলায় গত ২৩ জুলাই শরীফুল ইসলাম নামে একজনকে গ্রেফতার পুলিশ। কিন্তু শরীফুলের আইনজীবীর দাবি, পুলিশ ভুল ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে। শরীফুলের বৈধ একটি লাইসেন্স রয়েছে বলেও জানান তার আইনজীবী।
এ বিষয়ে কথা বলতে মামলার বাদী আহসান উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ বিষয়ে কারও সঙ্গে কথা না বলতে পুলিশ থেকে তাকে নিষেধ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ৭ মে জাহিদুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি রাজধানীর আহম্মদ ফায়ার আর্মস কোম্পানি থেকে আগ্নেয়াস্ত্রের ভুয়া লাইন্সেস দেখিয়ে একটি একনলা বারো বোর পাম্প অ্যাকশন শটগান ও দুই পিস কার্তুজ কেনেন। পরের দিন ৮ মে আসামি আরও বারও বোর শটগানের ৭৫ রাউন্ড কার্তুজ কেনেন। দোকান মালিক বিধি মোতাবেক জেলা প্রশাসক, স্পেশাল ব্রাঞ্চ, সিআইডি ও পল্টন থানায় এই বিক্রির তথ্য পাঠান।
পরবর্তীতে গত ২৫ জুন পুলিশের সিটিএসবির এক কর্মকর্তা বাদীকে জানান, ওই লাইন্সেসধারী ব্যক্তির ফোন বন্ধ। উল্লেখিত ঠিকানায় তাকে ভেরিফিকেশনের জন্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। এতে বাদী আহসান উদ্দিন আহম্মদের সন্দেহ হয়। পরে ঢাকা জেলা প্রশাসকের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইন্সেস শাখায় তাৎক্ষণিক যোগাযোগ করে জানতে পারেন, জাহিদুল ইসলামের দাখিল করা লাইসেন্সে ব্যবহৃত স্বাক্ষর ও সিল জাল। জাতীয় পরিচয়পত্রও জাল। ওই ব্যক্তি প্রতারণার মাধ্যমে অস্ত্র ও গুলি কিনেছে।
এই মামলা তদন্ত করার জন্য প্রথমে পল্টন থানার এসআই আলী হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) টিমের পুলিশ পরিদর্শক ছায়েদুর রহমানকে।
পল্টন থানার অফিসার ইনচার্জ সালাহউদ্দীন মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মামলা প্রথমে তদন্তের দায়িত্ব ছিল আমাদের কাছে। পরে মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে সিটিটিসি ইউনিটকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা এখন এ মামলার তদন্ত করছে।
পরে এ মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের ইকোনমিক ক্রাইম অ্যান্ড হিউম্যান ট্রাফিকিং টিমের পুলিশ পরিদর্শক ছায়েদুর রহমান গত ২৩ জুলাই শরীফুল ইসলাম নামে একজনকে গ্রেফতার করেন। পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তিনিই এজাহারে উল্লেখিত আসামি জাহিদুল ইসলাম। আদালতে হাজির করে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তার ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত তাকে দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। দুই দিনের রিমান্ড শেষ হলে তদন্ত কর্মকর্তা আরও সাত দিনের রিমান্ড চান। পরে আদালত তাকে জেল গেটে একদিন জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দেন।
রিমান্ড শেষে আদালতে পুলিশের দেওয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আসামি জাহিদুল ইসলাম ওরফে শরীফুল ইসলাম তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলে অবৈধভাবে পুলিশের স্টিকার ব্যবহার করে এবং বিভিন্ন সময় নিজেকে পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) হিসেবে পরিচয় দেয়। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে প্রতারণামূলকভাবে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন লোকের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। সে পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) পদমর্যাদার ভুয়া আইডি কার্ড তৈরি করে নিজেকে পুলিশ অফিসার পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন প্রকার প্রতারণামূলক কাজ করে থাকে। তার কাছ থেকে পুলিশের ভুয়া একটি আইডি কার্ডও উদ্ধার করেছে পুলিশ।
এছাড়াও আসামি জাহিদুল ইসলাম ওরফে শরীফুল ইসলামের বিরুদ্ধে যশোরের কোতোয়ালি থানায় পেনাল কোডের ৪২০/৪৬৫/ ৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারায় একটি মামলা রয়েছে। সে মামলার এজাহারনামীয় আসামি সে। তার বিরুদ্ধে জিডির তথ্যও খুঁজে পাওয়া গেছে বলে পুলিশ জানায়।
আসামি পক্ষের আইনজীবী মাহবুব রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তিনি ২০১৪ সাল থেকে একটি বৈধ লাইসেন্সের মালিক। আমাদের যে আসামি তার নাম শরীফুল ইসলাম শরীফ। আর এজাহারে যার কথা উল্লেখ আছে তার নাম জাহিদুল ইসলাম। এখন আর্মস ব্যবসায়ী দাবি করছেন, শরীফুল ইসলাম নাকি জাহিদুল ইসলাম সেজে অবৈধ লাইসেন্স ব্যবহার করে অস্ত্র কিনেছেন। আর ফোন নম্বরের সূত্র ধরে শরীফুল ইসলামকে গ্রেফতার করেছে।
অস্ত্র বিক্রিতে আহম্মদ ফায়ার আর্মস কোম্পানি বিধি অনুসরণ করেনি বলে অভিযোগ করে আসামি পক্ষের আইনজীবী অভিযোগ করে বলেন, অস্ত্র ব্যবসায়ী অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে তার কিছু বিধান আছে, সে সেগুলো পালন করেনি। যার কাছে অস্ত্র বিক্রি করবে তার অরিজিনাল এনআইডি যাচাই করবে এবং তার একটা স্ক্রিনশট রাখবে বা ছবি রাখবে, কিন্তু তার কোনও কিছুই সে রাখেনি। আমার মক্কেল যদি এখানে জড়িত থাকে তাহলে তার স্ক্রিনশট থাকবে, সিসি টিভি ফুটেজ থাকবে। কিন্তু তার কিছুই নাই। তাহলে আমার মক্কেল এখানে কীভাবে জড়িত থাকতে পারে একটা ফোন নম্বরের কারণে।
তিনি আরও বলেন, আর আমার মক্কেল একজন ব্যবসায়ী। ২০১৪ সাল থেকে তিনি বৈধ লাইসেন্সধারী। তিন বছর পর পর তিন লাখ টাকা টেক্স দেওয়া লোক। সরকার যাচাই-বাছাই করে তাকে লাইসেন্স দিয়েছে। তাহলে তার কি এমন দরকার পড়েছে যে তিনি লাইসেন্স জাল করে শটগান কিনতে হবে? তিনি চাইলে তো এমনিতেই অস্ত্র কিনতে পারে।
আসামি শরীফুল ইসলামের বৈধ অস্ত্র পুলিশ নিয়ে এসেছে উল্লেখ করে আইনজীবী বলেন, শরীফুল ইসলামকে আটক করার সময় তার কাছে যে বৈধ অস্ত্র ছিল সেটাও পুলিশ নিয়ে এসেছে, কিন্তু তারা তা জব্দ তালিকায় উল্লেখ করেনি। আদালতেও তা দেওয়া হয়নি। আমরা যখন জব্দ তালিকা দেখার আবেদন করি তখন একটা জব্দ তালিকা দেওয়া হয়, সেখানে আমাদের বৈধ অস্ত্রের কথা কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। জব্দ তালিকা না দেওয়ায় আদালত তদন্ত কর্মকর্তাকে শোকজও করেছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছায়েদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এই মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে আমি কোনও মন্তব্য করতে পারবো না। আপনি আমাদের ডিসি স্যারের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বিস্তারিত বলবেন।
এ বিষয়ে ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের ডিসির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও জানান, তদন্ত চলাকালে কোনও মামলার বিষয়ে মন্তব্য করা যায় না।









