দায়িত্ব পালন শুরু করতে না করতেই সংবর্ধনার মেলা এবং নানাবিধ বক্তব্য দিয়ে সাংবিধানিক বিচারিক পদকে প্রশ্নবিদ্ধ করায় অভিযোগ এনে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে ইউনাইটেড লইয়ার্স ফ্রন্ট (ইউএলএফ)।
মঙ্গলবার (৩ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির দক্ষিণ হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। ইউএলএফ এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
এ সময় লিখিত বক্তব্যে ফ্রন্টের কনভেনর ও বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘লুণ্ঠিত ভোটাধিকার, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, আইনের শাসন, স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা, খালেদা জিয়াসহ সব গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক, পেশাজীবী ও মানবাধিকার কর্মীর মুক্তি, মিথ্যা মামলা ও ফরমায়েশি রায় বাতিলের দাবিতে আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়ে ইউএলএফ’র আন্দোলন চলমান আছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, খুলনা, রাজশাহী, বগুড়া ও বরিশালসহ প্রায় সব বিভাগীয় বার সমিতিতে আইনজীবী সমাবেশ ও পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘গত ২৫ সেপ্টেম্বর বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি গত ১২ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসানকে দেশের ২৪তম প্রধান বিচারপতি হিসাবে নিয়োগ দেন। তিনি শপথ গ্রহণ করেন ২৬ সেপ্টেম্বর। সুপ্রিম কোর্ট বারের আইনজীবীসহ দেশের সব শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ প্রত্যাশা করেছিল, প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বিচারালয়ের সর্বোচ্চ চেয়ারের মর্যাদা, ভাব গাম্ভীর্য এবং দীর্ঘ দিন ধরে গড়ে উঠা বিচারিক প্রথা বজায় রাখবেন। যদিও রাজনৈতিক অতীত এবং বারে আইনজীবী থাকাবস্থায় বর্তমান সরকার ও সরকারি দলের সব ধরনে কর্মকাণ্ডের সঙ্গে প্রশ্নাতীতভাবে তার নিয়মিত অংশগ্রহণ আইনজীবী সমাজের জানা আছে।’
আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন শুরু করতে না করতেই সংবর্ধনার মেলা ও নানাবিধ বক্তব্য প্রধান বিচারপতির মতো সর্বোচ্চ সাংবিধানিক বিচারিক পদকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি নিয়োগের পর থেকে ফুলেল শুভেচ্ছা নিতে নিতে, এক পর্যায়ে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছ থেকে ফুলেল শুভেচ্ছা গ্রহণ করেন। এর সচিত্র প্রতিবেদন গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। সুপ্রিম কোর্টের ৫২ বছরের ইতিহাসে এটি নজীরবিহীন ঘটনা এবং প্রবীণ আইনজীবীদের ভাষায় বিচার বিভাগের জন্য চরম বেদনার মুহূর্ত। শুধু তাই নয়, শপথ গ্রহণের দুই দিনের মাথায় একটি জেলা সমিতির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিতর্কিত পুলিশ অফিসার, আইনজীবী নিপীড়নকারী এবং নিয়মিত মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ডিবি হারুনের কাছ থেকে একটি বৃহদাকার ‘তলোয়ার’ উপহার হিসাবে প্রধান বিচারপতির গ্রহণ করার ছবি গণমাধ্যমে প্রচারের পর বাংলাদেশের আইনজীবী সমাজ হতাশ ও বিস্মিত হয়েছে।’
প্রধান বিচারপতি নিরপেক্ষ থাকবেন প্রত্যাশা করে জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘গত ১ অক্টোবর নেত্রকোনা স্টেডিয়ামে নেত্রকোনা জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির সভাপতিত্বে এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের সঞ্চালনায় প্রধান বিচারপতির সম্মানে সংবর্ধনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন সরকারের প্রতিমন্ত্রী, ২০১৮ সালের নিশিরাতের ভোটের সংসদ সদস্য, বিচারপতি, বিচারক, স্থানীয় আমলা, পুলিশের কর্মকর্তা ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিসহ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান আওয়ামী লীগের দলীয় সংবর্ধনা গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে প্রধান বিচারপতির মতো নিরপেক্ষ পদের মর্যাদা ও সম্মানহানি ঘটিয়েছেন। এতে বিচার বিভাগের ওপর সাধারণ মানুষের অনাস্থা আরও গভীর হচ্ছে। বিচার বিভাগ নিপতিত হবে গভীর সংকটে। এরপরও আমরা মনে করি, কোনও দলের পক্ষে নয়, বিচার বিভাগের প্রধান হিসাবে আপনার দায়িত্ব থাকবে। আপনি নিরপেক্ষ থাকবেন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখবেন।’
ইউএলএফ’র কনভেনর বলেন, ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার সমিতির এডহক কমিটি ইতোমধ্যেই বারের সদস্যদের পক্ষ থেকে আগামী ৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য আপিল বিভাগের ১ নম্বর কোর্ট রুমে প্রধান বিচারপতির কথিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠান এবং পরে বারের সদস্যদের সঙ্গে বিচারকেদের সৌজন্য সাক্ষাতের কর্মসূচি বর্জনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইউএলএফ বিচার বিভাগের মর্যাদা, সম্মান, প্রধান বিচারপতি পদের ভাব গাম্ভীর্য এবং বিচার বিভাগের ওপরে বাংলাদেশের জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আগামী ৮ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট বারের তথাকথিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বর্জনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একাত্বতা প্রকাশ করছে এবং সংবার্ধনা বর্জনের সিদ্ধান্তের সমর্থনে ওইদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট বার চত্ত্বরে বিক্ষোভ মিছিল এবং আইনজীবী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।’
বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি আইনজীবীদের এই সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করবেন আশা করে তিনি বলেন, ‘দেশে যখন ভোটাধিকার লুণ্ঠিত, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য জনগণের অবিরাম আন্দোলন চলছে, তখন আমদের প্রত্যাশিত বিচার বিভাগ নতুন করে আর কোনও বির্তকের মধ্যে না জড়িয়ে সংবিধান অর্পিত ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য দৃঢ় ভূমিকা গ্রহণ করবেন বলে আশা করছি।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও ছিলেন– ইউএলএফ’’র কো কনভেনর সিনিয়র অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, সিনিয়র অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, অ্যাডভোকেট মহসিন রশিদ প্রমুখ।








