চিড়িয়াখানায় ১৭ প্রাণীর নিঃসঙ্গ জীবন

আসাদ আবেদীন জয়
০৭ আগস্ট ২০২৫, ১০:০০আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৫, ১১:১৬

‘কাঞ্চি’র জীবন যেন নিঃসঙ্গতার উপাখ্যান! সঙ্গীকে হারিয়ে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নিঃসঙ্গ জীবন কাটছে তার। শুধু কাঞ্চি নয়, রাজধানীর মিরপুরে জাতীয় চিড়িয়াখানার বিভিন্ন খাঁচায় আরও ১৬টি প্রাণী বছরের পর বছর সঙ্গীহীন জীবন কাটাচ্ছে।

২০১১ সালে আফ্রিকা থেকে কাঞ্চিসহ আরেকটি পুরুষ গন্ডার আনা হয় মিরপুর চিড়িয়াখানায়। তখন দুজনেরই বয়স ছিল তিন বছর। কিন্তু মাত্র দুই বছরের মাথায় অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে পুরুষ গন্ডারটি মারা যায়। সেই থেকে শুরু হয় কাঞ্চির একাকী জীবনের যাত্রা। যদিও ‘বাংলাদেশ চিড়িয়াখানা আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী চিড়িয়াখানার প্রাণীর নিঃসঙ্গ জীবন আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

বৈচিত্র্যময় প্রাণী দেখতে পরিবার ও বন্ধু নিয়ে দলবেঁধে চিড়িয়াখানায় আসেন দর্শনার্থীরা। খাঁচার বাইরে দাঁড়িয়ে প্রাণীদের ছবি তোলেন, ভিডিও করেন কেউ কেউ। তাতে দর্শনার্থীরা আনন্দিত হন, আয় হয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষেরও। কিন্তু কাঞ্চিদের জীবনের দীর্ঘ নীরবতায় কোনও ছেদ পড়ে না। 

গন্ডার

একটি গন্ডারের গড় আয়ু ৩৫ থেকে ৪০ বছর। স্ত্রী গন্ডার ছয় থেকে সাত বছরে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়। ১৬ থেকে ১৮ মাস গর্ভধারণের পর একটি বাচ্চা দেয়। এই হিসাব ধরেই বলা যায় কাঞ্চি বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার আগে নিঃসঙ্গ জীবন শুরু হয়, যা মধ্য বয়সেও চলমান।

সঙ্গীহীন জীবনের কারণ প্রকল্পের ফাঁদ

চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, পুরুষ গন্ডারটি মারা যাওয়ার পর থেকে কাঞ্চি একা হয়ে পড়ে। খাওয়া-দাওয়াও ছেড়ে দেয়। অস্বাভাবিক আচরণ করে। একাকিত্ব দূর করতে তার খাঁচায় একটি ভেড়া দেওয়া হয়। পরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে সরিয়ে নেওয়া হয় ভেড়াটি।  

কেন সঙ্গী আনা হচ্ছে না জানতে চাইলে চিড়িয়াখানার পরিচালক ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, চিড়িয়াখানার জন্য একটা মাস্টারপ্ল্যান তৈরি হয়েছে এবং সেটি অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। আমরা আশা করছি এই অর্থবছরেই আমরা মাস্টারপ্ল্যানের কাজটা শুরু করতে পারবো। ইতোমধ্যে আমাদের এডিপিতে কিছু সংস্থানও রাখা হয়েছে মাস্টারপ্ল্যানের অর্থ বরাদ্দ রাখার জন্য। সে ক্ষেত্রে আমরা চিন্তা করছি, যেহেতু গন্ডারের জন্য বিশেষভাবে বাসস্থান তৈরি হবে, সেই সময় আমরা গন্ডারটা আনবো।

ওয়াইল্ডিবিস্ট

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে এই প্রতিবেদককে গন্ডার আনার পরিকল্পনা নিয়ে মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেছিলেন, আমাদের এখানে ভবিষ্যতে গন্ডার আনার পরিকল্পনা আছে, তবে সেটি আমাদের চিড়িয়াখানা ঢেলে সাজানোর যে পরিকল্পনা রয়েছে তা বাস্তবায়নের পর। আমাদের পরিকল্পনাটি ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে এবং বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পটি সাবমিট করেছি। প্রকল্প অনুমোদন হলেই বাস্তবায়ন শুরু হবে। সে ক্ষেত্রে আমরা গন্ডারের বাসস্থানটি নতুন করে রিমডেলিং করবো, তারপর নতুন গন্ডার আনবো। এর আগে আনার কোনও পরিকল্পনা নেই।

১৬ বছর ধরে একা কেশোয়ারী

২০০৯ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের আগস্ট মাস। দীর্ঘ এই ১৬ বছর খাঁচার ভেতর কোনও সঙ্গী ছাড়াই জীবন কাটাচ্ছে কেশোয়ারী নামে পাখিটি। খাঁচার সামনে থাকা তথ্যমতে, আবদ্ধ অবস্থায় কেশোয়ারীর আয়ুষ্কাল ১৮-২০ বছর। তাহলে বলা যায়, চিড়িয়াখানায় থাকা এই পাখিটির প্রায় গোটা জীবনই কেটে যাচ্ছে একাকী; কেবল দর্শনার্থীদের বিনোদন দিতে দিতে।

চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, কেশোয়ারীটির জন্ম ১৯৯১ সালের ২ জুলাইয়ে। তবে কবে তাকে চিড়িয়াখানায় আনা হয় তা জানা যায়নি। তারা জানায়, পাখিটি দীর্ঘ আয়ু পেয়েছে।

কমন ইল্যান্ড

কেবল গন্ডার বা কেশোয়ারী না, চিড়িয়াখানায় আরও ১৫ প্রাণীর জীবন কাটছে নিঃসঙ্গতায়। এই প্রাণীগুলোর মধ্যে কোনও কোনোটা সংখ্যায় একাধিক কিন্তু সেগুলো একই লিঙ্গের। নেই বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গী। চিড়িয়াখানার সঙ্গীহীন অন্য প্রাণীগুলো হলো– হামাদ্রিয়াস বেবুন, উল্লুক, হনুমান লেঙ্গুর, কুলু বানর, মার্স কুমির, আফ্রিকান সাদা সিংহ, আফ্রিকান সিংহ (ডেইজি ও মুক্তা), লোনা পানির কুমির, চিত্রা হায়েনা, আফ্রিকান গন্ডার, কমন ইল্যান্ড, ওয়াইল্ডিবিস্ট, ক্যাংগারু, সালফার ক্রেস্টেড কাকাতুয়া ও ইন্ডিয়ান সারসক্রেন।

প্রাণীগুলোর মধ্যে কেশোয়ারী ২০০৯ সালের আগস্ট থেকে, আফ্রিকান গন্ডার ২০১৩ সালের মে থেকে, চিত্রা হায়েনা ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে, আফ্রিকান সিংহ (মুক্তা) ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে, আফ্রিকান সিংহ (ডেইজি) ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে, আফ্রিকান সাদা সিংহ ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে, হামাদ্রিয়াস বেবুন ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে, উল্লুক ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে, সালফার ক্রেস্টেড কাকাতুয়া ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে, ক্যাংগারু ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে, হনুমান লেঙ্গুর ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে এবং মার্স কুমির ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করছে।

নিঃসঙ্গ সিংহ

এছাড়াও চলতি বছরের মার্চ থেকে কুলু বানর ও ইন্ডিয়ান সারসক্রেন, এপ্রিল থেকে কমন ইল্যান্ড এবং মে থেকে লোনা পানির কুমির সঙ্গীহীন জীবন শুরু করেছে। আর ওয়াইল্ডিবিস্ট কতদিন ধরে সঙ্গীহীন রয়েছে তা জানাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। তবে পরিচর্যাকারীদের মতে, আনুমানিক দুই বছর ধরে সঙ্গী ছাড়া রয়েছে এই প্রাণীটি।

এসব প্রাণীর সঙ্গী আনার প্রসঙ্গে রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা কিন্তু ধাপে ধাপে এই প্রাণীগুলোকে সঙ্গী দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। আমরা আগামী ছয় মাসের মধ্যে উল্লুক, কেশোয়ারীর আর ওয়াইল্ডি বিস্টের জন্য সঙ্গী আনবো।  

তিনি বলেন, পশু-পাখিদের নিঃসঙ্গতা দূর করতে পশু-পাখি সংগ্রহের জন্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে আগামী ৫ বছরের একটি পরিকল্পনা নিয়েছে। সে জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

তবে চিড়িয়াখানার পরিচালক বলেন, দ্রুত এই প্রাণীদের নিঃসঙ্গতা দূর করতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত বাজেট এবং প্রাণী আনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বন বিভাগের দ্রুত অনুমোদন। 

আইন কী বলে?

বাংলাদেশ চিড়িয়াখানা আইন, ২০২৩-এ উল্লেখ রয়েছে, চিড়িয়াখানাতে কোনও নির্দিষ্ট কারণ ছাড়া কোনও অবস্থাতেই কেবল একই প্রজাতির একই লিঙ্গের একটি প্রাণী রাখা যাইবে না।

আইন অমান্যের বিষয়ে পরিচালক বলেন, আমরা আইন মানার চেষ্টা করছি। কিন্তু আইন অমান্য হচ্ছে।

উল্লুক

যা বলছেন প্রাণী বিশেষজ্ঞরা

সঙ্গী ছাড়া থাকার ফলে পরিবর্তন আসছে প্রাণীগুলোর জীবনাচরণে। এ ক্ষেত্রে কমে আসে তাদের আয়ুও; এমনটাই বলেছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও দুবাই সাফারি পার্কের প্রাক্তন প্রিন্সিপাল ওয়াইল্ডলাইফ স্পেশালিস্ট ড. মোহাম্মদ আলী রেজা খান।

তিনি বলেন, প্রাণীকে সঙ্গীহীন রাখা হলে তারা একঘেয়েমি ও বিষণ্নতায় ভোগে। হয় খাবারের প্রতি আসক্তি কমে যায় অথবা তা বিপুল পরিমাণে বেড়ে যায়। যার ফলে প্রাণী ক্ষীণ বা স্থুলও হয়ে যায়। দুই ক্ষেত্রেই প্রাণীর আয়ু কমে আসে।

দীর্ঘদিন একা থাকার পর নতুন সঙ্গী আনলে তার সঙ্গে কতটা মানিয়ে থাকতে পারে? নাকি নতুন সঙ্গীর সঙ্গে মানিয়ে উঠতে পারে না- এমনটা জানতে চাইলে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, নতুন আসা প্রাণীর সঙ্গে সে সহজে খাপ খাওয়াতে পারে না। প্রথমে সে জানে না নতুন সঙ্গীর সঙ্গে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে। যেহেতু সে একা থেকে গিভ অ্যান্ড টেইক সিস্টেম ভুলে যায়। একাকী থাকার কারণে তারা দারুণ নিঃসঙ্গতায় ভোগে।

কুলু বানর

জাতীয় এই চিড়িয়াখানা প্রাণীদের জন্য পরিবেশগত ও অবকাঠামোগতভাবে কতোটা মানসম্পন্ন এমন প্রশ্নে রেজা খান বলেন, এটা শূন্য মানসম্পন্ন। 

প্রাণীদের নিঃসঙ্গতা দূর করতে এই মুহূর্তে করণীয় এবং চিড়িয়াখানাকে প্রাণীদের জন্য পরিবেশগত ও অবকাঠামোভাবে অনুকূলে রাখতে কর্তৃপক্ষ কী করতে পারে প্রশ্নে তিনি বলেন, বিশ্বের অন্য দেশগুলাতে প্রাণীবিদরা ম্যানেজ করে চিড়িয়াখানা। সেখানে পশুচিকিৎসক, পুষ্টিবিদ ও অন্যরাও থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে এটা হয় না। আমাদের দেশের ভেটেরিনারি বা পশুচিকিৎসকরা চিড়িয়াখানা ম্যানেজ করে। আর আমাদের দেশের প্রাণীর কল্যাণের চেয়ে বিভিন্ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরিতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, চিড়িয়াখানাগুলোতে প্রাণীর যত্নে একক প্রাণীর কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তাদের উপযুক্ত আবাসস্থলে স্থানান্তর করা, সামঞ্জস্যপূর্ণ সঙ্গীর সঙ্গে জুটিবাঁধা, অথবা যদি তাদের পুনর্বাসন করা সম্ভব না হয় তবে বিশেষ যত্ন নেওয়ার মতো বিকল্প বিবেচনা করা উচিত।

ছবি: প্রতিবেদক

/আরকে/এমওএফ/
সম্পর্কিত
নিজের বিড়ালকে আলিঙ্গন করার দিন আজ
মাজারের কুমিরটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিবিড় পর্যবেক্ষণে
মাজারের দিঘির কুমিরকে নেওয়া হচ্ছে পুনর্বাসন কেন্দ্রে
সর্বশেষ খবর
পাবনায় কিশোরীকে হত্যা: কথিত প্রেমিকসহ ৩ জন গ্রেফতার
পাবনায় কিশোরীকে হত্যা: কথিত প্রেমিকসহ ৩ জন গ্রেফতার
গৌরীই কি তবে আমির খানের জীবনের বনলতা সেন?
গৌরীই কি তবে আমির খানের জীবনের বনলতা সেন?
নতুন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত ইসরায়েল-লেবানন: হিজবুল্লাহমুক্ত জোন গঠনের সিদ্ধান্ত
নতুন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত ইসরায়েল-লেবানন: হিজবুল্লাহমুক্ত জোন গঠনের সিদ্ধান্ত
বিশ্ব অর্থনীতির সামনে দুই কঠিন পথ, নেপথ্যে ইরান যুদ্ধ ও এআই সংকট
বিশ্ব অর্থনীতির সামনে দুই কঠিন পথ, নেপথ্যে ইরান যুদ্ধ ও এআই সংকট
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম