মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প

হেরোইনের নতুন স্পট ঘিরে ফের সংঘর্ষ

আরমান ভূঁইয়া
১২ আগস্ট ২০২৫, ২৩:০৫ আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৫, ২৩:০৫

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে আধিপত্য ও মাদক কারবার নিয়ে ফের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। নতুন করে একটি হেরোইন স্পট বসানোকে কেন্দ্র করে চলমান এই সংঘর্ষে সোমবার (১১ আগস্ট) দুপুরে শাহ আলম (২২) নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

এ ঘটনায় পুলিশ, র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর অভিযানে ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য, দেশীয় অস্ত্র ও সংঘর্ষে ব্যবহৃত হেলমেট।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পের শুরু থেকেই সেখানে মাদক বাণিজ্য বিস্তার লাভ করে। মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পে কয়েকটি গ্রুপ তৈরি হয়। গাঁজা, হেরোইন ও ইয়াবার এই ক্যাম্পে প্রকাশ্যেই বেচাকেনা হয়। আর এর নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে নিয়মিত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ১৬ বছর ধরে এখানে একক আধিপত্য বজায় রেখেছিল ‘ভূঁইয়া সোহেল’ ওরফে ‘বুনিয়া সোহেল’ গ্রুপ। তবে গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি-সমর্থিত ‘সেলিম আশরাফি’ ওরফে ‘চুয়া সেলিম’ গ্রুপ তাদের আধিপত্য জানান দিতে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

আধিপত্যের দ্বন্দ্ব গত বছরের আগস্ট থেকে শুরু হয়ে অক্টোবর পর্যন্ত চলে। সংঘর্ষে ককটেল বিস্ফোরণ থেকে শুরু করে দেশীয় অস্ত্র ও বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারে শিশুসহ অন্তত সাত জনের মৃত্যু হয়। এরপর পুলিশ, র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে শতাধিক মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এর মধ্যে দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী বুনিয়া সোহেল ও চুয়া সেলিমও ছিলেন।

ক্যাম্পে মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত একজন পরিচয় গোপন করে এই প্রতিবেদককে জানান, দুই মাস আগে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে বুনিয়া সোহেল ও চুয়া সেলিম গ্রুপের সদস্যরা। ক্যাম্পের উত্তর-পূর্ব কর্নারে আগে থেকেই বুনিয়া সোহেলের দুটি হেরোইনের স্পট ছিল। কিন্তু গত দুই মাসে বাবর রোডের ‘ময়লার গলিতে’ চুয়া সেলিম গ্রুপের সদস্য গাল কাটা মনু, ইমতিয়াজ ও শাহ আলম নতুন করে একটি হেরোইন স্পট বসায়। এতে পুরোনো গ্রাহক হারিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে বুনিয়া সোহেল ও তার গ্রুপের সদস্যরা।

তিনি আরও জানান, গত শুক্রবার (৮ আগস্ট) সকালে বুনিয়া সোহেল নিজে নতুন স্পটে গিয়ে মাদক বিক্রি বন্ধের চেষ্টা করেন, যা থেকে সংঘর্ষ শুরু হয়। সেদিন ককটেল বিস্ফোরণও ঘটে। পরে দুদিন ধরে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়, যার জেরে সোমবার (১১ আগস্ট) দুপুরে শাহ আলমকে হত্যা করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর সোমবার বিকাল থেকে পুলিশ, র‌্যাব ও সেনাবাহিনী যৌথভাবে ক্যাম্পে অভিযান চালায়। ধারাবাহিক অভিযানে ১৬ জন গ্রেফতার হয়। মঙ্গলবার (১২ আগস্ট) দুপুরে সেনাবাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের যৌথ অভিযানে হুমায়ুন রোড ও আশপাশের গলি থেকে মাদক, দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। তবে এ সময় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি তারা। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ক্যাম্পে আবার প্রকাশ্যে গাঁজা, ইয়াবা ও হেরোইন বিক্রি শুরু হয়।

মঙ্গলবার (১২ আগস্ট) সরেজমিন দেখা যায়, ১২-১৩ বছরের কিশোররাও হাতে গাঁজার প্যাকেট নিয়ে ক্রেতাদের ডাকছে। মাদকদ্রব্যের দাম নিয়েও তাদের সঙ্গে ক্রেতাদের বাগবিতণ্ডা হচ্ছে। অভিযান চলাকালে দৃশ্যত মাদক বিক্রি বন্ধ থাকে, কিন্তু বাহিনী চলে যেতেই ক্যাম্পের বিভিন্ন গলিতে মাদকের হাট বসে যায়। বাবর রোডের মসজিদ গলির মুখ, বোবার বিরিয়ানির দোকান সংলগ্ন এলাকা, হুমায়ুন রোডের গলিতে একই চিত্র দেখা যায়। সেখানে অনেকটা খোলামেলা মাদক বিক্রি হচ্ছে।

অভিযানের বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ঢাকা মেট্রো কার্যালয়ের (উত্তর)  সহকারী পরিচালক মো. মেহেদী হাসান জানান, সেনাবাহিনীর সঙ্গে যৌথ অভিযানে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে এবং তাদের পরিচয় যাচাই-বাছাই চলছে। মামলা হলে বিস্তারিত জানানো হবে।

মোহাম্মদপুর থানার ওসি আলী ইফতেখার হাসান বলেন, শাহ আলম হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে ফয়সাল (২৫) ও সেলিম (২৪) নামে দুই সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে দুটি ধারালো চাপাতি উদ্ধার করা হয়েছে। এরপর যৌথ বাহিনীর অভিযানে আরও ১৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের এডিসি জুয়েল রানা বলেন, “এই ক্যাম্পে মাদক নিয়ে সংঘর্ষ নতুন কিছু নয়। তবে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। চারপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও দুটি মোবাইল টিম কাজ করছে।”

স্থানীয়রা বলছেন, যতদিন ক্যাম্পে মাদক কারবার চলবে, ততদিন এই সংঘর্ষ বন্ধ হবে না। বাহিনীর অভিযান চলে, কিন্তু মাদক চক্রের শেকড় অক্ষত থেকে যাওয়ায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ব্যবসা আবার শুরু হয়ে যায়।

/এমএস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
আওয়ামী লীগকে ‘পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চোরের দল’ বললেন স্পিকার
নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষ নতুন চাকরিতে যোগ দিয়ে বাড়ি ফেরা হলো না আনোয়ারের
‘ঘুম ভাঙলো বিকট শব্দে, চোখ খুলেই দেখি পাশে চার লাশ’
সর্বশেষ খবর
ইশরাকের কাজের উদ্দেশ্য ভালো হলেও হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়াটা ঠিক হয়নি: স্পিকার
ইশরাকের কাজের উদ্দেশ্য ভালো হলেও হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়াটা ঠিক হয়নি: স্পিকার
স্পেনের যে গুহায় পাথরের গায়ে আদিম মানুষের শিল্পকর্ম
স্পেনের যে গুহায় পাথরের গায়ে আদিম মানুষের শিল্পকর্ম
এসআইয়ের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির মামলা, ৯৯৯-এ ফোনে উদ্ধার ভুক্তভোগী
এসআইয়ের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির মামলা, ৯৯৯-এ ফোনে উদ্ধার ভুক্তভোগী
ঘুষ দাবির অভিযোগে থানা থেকে এএসআই প্রত্যাহার
ঘুষ দাবির অভিযোগে থানা থেকে এএসআই প্রত্যাহার
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পানাম নগরী ঘুরে দেখলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, নকশিকাঁথা-জামদানি দেখে মুগ্ধ
পানাম নগরী ঘুরে দেখলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, নকশিকাঁথা-জামদানি দেখে মুগ্ধ