দেশের সড়ক-মহাসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়েগুলোতে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে দেদারসে চলছে ছোট ছোট যানবাহন। এছাড়া বিভিন্ন অঞ্চলে সড়ক-মহাসড়কে খানাখন্দ ও বেহাল দশা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নির্ধারিত গতিসীমা না মানা, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা কাঠামো এমন দুরবস্থার সৃষ্টি করেছে। যানবাহনের জন্য তৈরি করেছে মরণফাঁদ। ফলে প্রতিদিনই সড়কে ছোট-বড় দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানি ঘটছে।
শুক্রবার (২২ আগস্ট) দুপুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সামনে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। ওই সময় সিমেন্ট বোঝাই একটি লরির নিচে চাপা পড়ে প্রাইভেটকারে থাকা একই পরিবারের চার জন নিহত হন। একই সময়ে লরির চাপায় সিএনজি অটোরিকশার আরও দুই যাত্রী গুরুতর আহত হন।
এর আগের দিন বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় মোটরসাইকেলের ৩ আরোহী নিহত হন। একই দিন সকালে এক্সপ্রেসওয়ের ষোলঘর যাত্রী ছাউনির সামনে ঢাকামুখী লেনে প্রাইভেটকার উল্টে আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়। ওই সময় ১৭ ঘণ্টার ব্যবধানে ওই সড়কে ৬ জনের প্রাণহানি ঘটে।
সর্বশেষ শনিবার (২৩ আগস্ট) সকালে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পোনা বাসস্ট্যান্ড নামক এলাকায় যাত্রীবাহী বাস খাদে পড়ে কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন। হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, সাতক্ষীরা থেকে ছেড়ে আসা মাস্টার লাইনের একটি যাত্রীবাহী বাস ঢাকার উদ্দেশে যাচ্ছিল। বাসটি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার পোনা নামক এলাকায় পৌঁছালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের খাদে পড়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। দুর্ঘটনায় বাসটির সামনের অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কমপক্ষে ২০ জন যাত্রী আহত হন। শুধু এ ঘটনাগুলো নয়। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক-মহাসড়কে এমন দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়ক, রেল ও নৌ-পথে গত তিন মাসে সারা দেশে ১ হাজার ৭৭৪টি দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৮৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) জারি করা মোটরযান গতিসীমা সংক্রান্ত নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, এক্সপ্রেসওয়েতে প্রাইভেটকার, বাস ও মিনিবাসের গতিসীমা হবে ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার। মোটরসাইকেলের ৬০ এবং ট্রাকের গতি হবে ৫০ কিলোমিটার। তবে দেখা যাচ্ছে এর উল্টো চিত্র। চালকদের অনেকে জারি করা গতিসীমা লঙ্ঘন করেই যানবাহন চালাচ্ছেন। বেশিরভাগ চালকই আইন বা নিয়মনীতি মানতে চান না। তারা বেপরোয়া গতিতেই গাড়ি চালান।
দেশের মহাসড়কগুলোর মধ্যে ঢাকা-সিলেট এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-কুমিল্লা মহাসড়কের অবস্থা বেশি উদ্বেগজনক। খানাখন্দের কারণে এসব এলাকায় দুর্ঘটনা তো ঘটছেই। সড়কের বেহাল দশার কারণে রাত-দিন দীর্ঘ যানজটে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের।
সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, রোড পারমিটহীন ছোট ছোট যানবাহন, সড়ক-মহাসড়কে নিয়ন্ত্রণহীন চলাচল করা, আইন প্রয়োগে ধীরগতি, পর্যাপ্ত লজিস্টিক সাপোর্টের অভাব, সড়কের বেহাল দশা এবং নিয়ন্ত্রণহীন গতিসীমার কারণেই সম্প্রতি সড়ক পথে দুর্ঘটনা বেড়েছে।
এদিকে হাইওয়ে পুলিশে জানিয়েছে, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। যানজট নিয়ন্ত্রণে এবং দুর্ঘটনা কমাতে সারা দেশে সড়ক-মহাসড়কে পরিকল্পনামাফিক নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানায় হাইওয়ে পুলিশ।
যাত্রীদের মানোন্নয়ন, সড়ক-মহাসড়কে যানবাহন চলাচল নিয়ে সারা বছর কাজ করে বেসরকারি সংস্থা-যাত্রী কল্যাণ সমিতি। তাদের হিসাব অনুযায়ী চলতি বছরে মে, জুন এবং জুলাই মাসে সড়ক, রেল ও নৌ পথে ১ হাজার ৭৭৪টি দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৮৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। তিন মাসের গড় হিসাবে দেখা গেছে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হচ্ছে ২০ জনের।
এর মধ্যে মে মাসে ৫৯৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬১৪ জন নিহত এবং ১১৯৬ জন আহত হয়েছেন। পরের মাস জুনে ৬৭১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭১১ জন নিহত এবং ১৯০২ জন আহত হয়েছেন। সর্বশেষ জুলাই মাসে সংস্থাটির পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ৫০৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫২০ জন নিহত এবং আহত হয়েছেন ১৩৫৬ জন।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মহাসড়কে ছোট যানবাহন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একসময় কিছু সড়কে বাসের আধিক্য ছিল, অনেক মানুষ একসঙ্গে যাতায়াত করতে পারতেন, সম্প্রতি আমরা দেখছি সেই নেটওয়ার্কটা বন্ধ হয়ে গেছে। যার কারণে ওই সড়কগুলোতে ছোট ছোট যানবাহন প্রধান যানবাহন হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেলের রাইড শেয়ারিং, ইজিবাইক, অটোরিকশা এগুলোই বেশি দেখা যাচ্ছে। মহাসড়কে ছোট যানবাহনের চলাচল যখন বাড়ে তখন দুর্ঘটনাও বেড়ে যায়। গণপরিবহন বাড়ানোর জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার বিষয়টিকে আমলে না নিয়ে উল্টো পথে চলছে। সিএনজি-অটোরিকশা নেটওয়ার্ক বাড়ানো এবং ব্যাটারিচালিত মোটরযানকে নিবন্ধন দেওয়ার সিদ্ধান্তের আরও ভয়াবহতা দেখতে পাচ্ছি সামনে।’
তিনি বলেন, ‘বিআরটিএ-র পক্ষে থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিবন্ধন কীভাবে দেওয়া যায় অতি সম্প্রতি তার একটি সমীক্ষা রিপোর্ট দেওয়ার জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এতে করে সিএনজি অটোরিকশা ব্যবসায়ীদের মধ্যে চাঙ্গাভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ডিলারদের তৎপরতা বেড়েছে। একইসঙ্গে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বর্তমানে রাস্তায় যেসব যানবাহন চলছে তারা সেগুলোকে উচ্ছেদ করে নতুন যানবাহন নামাতে চায়। তারা বলছেন, যাত্রীর নিরাপত্তার জন্য নামাচ্ছে। কিন্তু আমরা দেখছি সেই পুরোনো আদলেই নামানো হচ্ছে। এই যানবাহনগুলোর ক্ষেত্রেও নিরাপত্তার বিষয়ে কোনও অগ্রগতি নেই। চলমান যানবাহনকে নিবন্ধন না দিয়ে নতুন যানবাহন নামানো দেখে মনে হচ্ছে আমরা আগামী দিনে একটি অচল বাংলাদেশে দিকে ধাবিত হচ্ছি। যেটা দুর্ঘটনা এবং যানজট বৃদ্ধির মাত্রা বহুলাংশেই বাড়িয়ে দেবে। আমরা ভয়াবহ সংকটের দিকে পড়তে যাচ্ছি।’
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মহাসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়েগুলোতে অনেকেই নির্দিষ্ট সীমার চেয়ে বেশি গতিতে যানবাহন চালান। যদিও গতিসীমা ৮০, তবে মিনিমাম ১০০ গতিতে যানবাহন চলে। বাসগুলো আরও বেশি গতিতে চলে। আমরা যদি গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি তাহলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হবে না। এছাড়া পুরো মহাসড়কজুড়েই স্পিড ক্যামেরা বসাতে হবে। যাতে কেউ গতিসীমার বাইরে গিয়ে গাড়ি চালালে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এখন বাসগুলোতে অনেক প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়। বাস কোম্পানিগুলো যদি চায় তার গাড়ি কত গতিতে চলছে পর্যাবেক্ষণ করবে, সেটা পারবে। সে জন্য ট্র্যাকিং করার প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি মহাসড়কে যেখানে ১০ ফিটের বেশি খাল রয়েছে সেখানে অবশ্যই রেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া ব্যাটারিচালিত যানবাহনগুলো কোনোভাবেই মহাসড়কে উঠতে দেওয়া যাবে না।’
হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি (অপারেশনস) শফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সম্প্রতি সড়ক-মহাসড়কে অটোরিকশা, সিএনজি মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে। তাদের কিছু করতে গেলে সংঘবদ্ধ হয়ে আমাদের কাজে বাধা দিচ্ছে। তবে আমরা থেমে নেই। প্রতিদিন শত শত মামলা দেওয়া হচ্ছে। আমরা এলাকাভিত্তিক বড় বড় অভিযান চালাচ্ছি যাতে এসব যানবাহন মহাসডকে উঠতে না পারে। রাষ্ট্র যখন কোনও সিদ্ধান্ত নেয়, কোনও আইন করে সেটা সবার ভালোর জন্যই করে। মহাসড়ক যানজটমুক্ত রাখতে, দুর্ঘটনা কমাতে আমরা নতুন পদ্ধতিতে কাজ করছি। জেলা পর্যায়ে সবাইকে এই কাজে যুক্ত করছি। আশা করি, মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচল বন্ধ হবেই।’
তিনি বলেন, ‘আমদেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। লজিস্টিক কিছু সক্ষমতা থাকলেও ম্যানপাওয়ারের ঘাটতি আছে। ৪ হাজার ৪২৫ কিলোমিটার সড়কে এলাকায় আমাদের ম্যানপাওয়ার মাত্র ২ হাজার ৯০০ জন। এর মধ্যে অফিসিয়াল ছুটিতে চলে যায় ২০ শতাংশ। তখন রেগুলার ওয়ার্কিং ফোর্স থাকে ২ হাজার। তাদের দিয়ে কাভার করাটা কষ্টসাধ্য।’
হাইওয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘পটুয়াখালী, বরগুনা, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং অন্যান্য স্থানে সড়কের এমন দুরবস্থা যানবাহনের জন্য মরণফাঁদ তৈরি করছে। যার ফলে প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে। এসব ভাঙাচোরা সড়কে যানবাহন উল্টে যাচ্ছে, যা স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক ও পণ্যবাহী যানবাহন চালকদের চরম ভোগান্তির কারণ হচ্ছে।’








