রাজধানীসহ সারা দেশেই একশ্রেণির গৃহকর্মী ভয়ংকর হয়ে উঠছে; যারা সরাসরি অপরাধচক্রের সদস্য। ভালো মানুষের ছদ্মবেশে অপরাধ কর্ম করছে তারা। এই গৃহকর্মীরা পরিকল্পিতভাবে চুরি, ডাকাতি থেকে শুরু করে নির্যাতন, মারধর এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দুশ্চিন্তা বাড়ছে গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রীদের। বাসায় রেখে যাওয়া শিশু ও বৃদ্ধরা রয়েছেন ঝুঁকিতে।
জানা গেছে, গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বাসাবাড়ির তথ্য সংগ্রহ করছে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। তাদের সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে বেশ কিছু বাসার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত দারোয়ান ও কেয়ারটেকারের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায়ে জানানোর পর নড়েচড়ে বসেছেন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতনরা। ওই সংস্থার পক্ষ থেকে বেশ কিছু সুপারিশও করা হয়েছে। সেখানেও সঠিক নাম-ঠিকানা যাচাই-বাছাই করেই গৃহকর্মী নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া বাড়ির মালিক-ভাড়াটিয়াদের পাশাপাশি গৃহকর্মীদের তথ্যও ক্রিমিনাল ইন্টারন্যাশনাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (সিআইএমএস) ইনপুট করতে হবে।
সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে চাঞ্চল্যকর মা-মেয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর সারা দেশের মানুষের মধ্যেই গৃহকর্মী নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ বলছে, ব্যস্ত ঢাকার বাসিন্দাদের বড় একটি অংশ ঘর ধোয়ামোছা, রান্নাবান্না থেকে শুরু করে সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত নানা কাজে গৃহকর্মীর ওপর নির্ভরশীল। অনেক পরিবারেই দিনের বড় একটি সময় গৃহকর্মীর হাতেই থাকে পুরো বাসার দায়িত্ব।
অথচ অতি গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়ার আগে গৃহকর্মীর পরিচয়, ঠিকানা বা আগের কাজের বিবরণ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নেই ন্যূনতম সতর্কতা। এই বিষয়ে পুলিশের কঠোর নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা মানছেন না নগরবাসী। ফলে গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে অপরাধীরা সহজেই প্রবেশ করছে ঘরে ঘরে।
মোহাম্মদপুরে মা-মেয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্থায়ী ঠিকানা যাচাই ছাড়াই তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এটি নতুন কোনও ঘটনা নয়।
এর আগে গত বছরের অক্টোবরে রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন এলাকার একটি বাসা থেকে ৫৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার চুরি করে তিন গৃহকর্মী। পার্টটাইম দুই গৃহকর্মীর নির্দেশনায় ওই বাসা থেকে দফায় দফায় স্বর্ণালঙ্কার চুরি করে স্থায়ী ১৬ বছর বয়সী গৃহকর্মী। ওই ঘটনায় তিন জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
তার আগে ২০১৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর এলিফেন্ট রোডে নিজ বাসায় খুন হন ইডেন মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মাহফুজা চৌধুরী পারভীন। ওই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই গৃহকর্মী নিয়োগে সতর্কতার বিষয়টি আলোচনায় আসে।
সর্বশেষ গত ৮ অক্টোবর রাজধানীর পল্লবী এলাকার একটি বাসা থেকে গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে ৯ ভরি স্বর্ণালঙ্কাকার এবং নগদ ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা চুরি করা হয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পল্লবী থানায় মামলা করেন। পরে মামলার তদন্ত করে শনিবার (৩ জানুয়ারি) অভিযুক্ত গৃহকর্মী শিউলী বেগম ওরফে লাকীকে (৪৬) গ্রেফতার করে পুলিশ। সেই সঙ্গে গ্রেফতার করা হয় চুরির স্বর্ণালঙ্কার কেনা আদাবর কাঁচা বাজারের একটি জুয়েলার্সের কারিগর মো. নাদিম হোসেনকে (৩১)।
পল্লবী থানার পুলিশ জানায়, সাবিহা মাহবুবা গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় শিউলীর সঙ্গে কথা বলে তাকে বাসায় কাজের জন্য নিয়োগ দেন। ৮ অক্টোবর সকাল ৭টায় কাজে যোগ দেয় শিউলী। সকাল ৯টায় সাবিহা কর্মস্থলে যাওয়ার পর বাসায় তার স্বামী-ছেলে এবং মা ছিলেন। রাত ৮টায় সাবিহা বাসায় ফিরে দেখেন তার মা অচেতন অবস্থায় শুয়ে আছেন এবং ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার খোলা। ড্রয়ার থেকে স্বর্ণালঙ্কার এবং নগদ টাকা চুরি হয়েছে। সাবিহার মা জানান, শিউলী তাকে পেঁপে ভাজি খাইয়েছিল। তারপর তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। পরে সাবিহা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় চুরির মামলা করেন।
এর আগেও কণ্ঠশিল্পী নাজমুন মুনিরা ন্যান্সির দুটি সোনার চেইন, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ডায়মন্ডের লকেটসহ মূল্যমান অলঙ্কার চুরি করে নিয়ে যান বাসার দুই গৃহকর্মীসহ তিন জন।
এদিকে গৃহকর্মী সংশ্লিষ্ট অপরাধ বাড়তে থাকায় ২০২২ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) গৃহকর্মী নিয়োগে ১৪ দফা নির্দেশনা জারি করে। পাশাপাশি আদালত থেকেও ২০২০ সালে ছয় দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। পুলিশ সূত্র জানায়, সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গৃহকর্মী সংশ্লিষ্ট অন্তত পাঁচটি গুরুতর অপরাধের ঘটনা ঘটেছে; যার মধ্যে রয়েছে খুন, চুরি ও পরিকল্পিত প্রতারণা।
ডিএমপির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, গৃহকর্মী নিয়োগের আগে জাতীয় পরিচয়পত্র, সদ্য তোলা ছবি, শনাক্তকারী ব্যক্তি ও তার পরিচয় সংগ্রহ করতে হবে। পূর্ব কর্মস্থল ও কাজ ছাড়ার কারণ যাচাই করতে হবে। সব তথ্য নিকটস্থ থানায় জমা দিয়ে ডিএমপির নির্ধারিত ‘ভাড়াটিয়া নিবন্ধন ফরম’ পূরণ করার কথা বলা হয়েছে। নিয়োগের পর গৃহকর্মীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, বাসার প্রবেশপথে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, মূল্যবান জিনিস গোপন রাখা, শিশুদের একা না রাখা, সন্দেহজনক আচরণ নজরে রাখা এবং মানবিক আচরণ নিশ্চিত করার বিষয়ে নজরদারি করতেও বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব নির্দেশনার কোনোটিই মানছেন না অধিকাংশ নগরবাসী।
২০২০ সালে মাহফুজা চৌধুরী পারভীন হত্যা মামলার রায়ে আদালত গৃহকর্মী নিয়োগে ছয় দফা নির্দেশনা দেন। এর মধ্যে রয়েছে নিয়োগের প্রথম ৯০ দিন সতর্ক পর্যবেক্ষণ, গৃহকর্মীর জীবনবৃত্তান্ত ও ছবি থানায় জমা, বাসার মূল প্রবেশপথে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, গৃহকর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্সের আওতায় আনা এবং নিবন্ধিত গৃহকর্মীদের তথ্য থানায় সংরক্ষণ। অথচ এসব নির্দেশনার বাস্তব প্রয়োগ প্রায় অনুপস্থিত।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নগরবাসী ভাড়াটিয়া নিবন্ধন ফরম পূরণ করে থানায় জমা দেন না। পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বাসাবাড়িতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। এ ছাড়া গৃহকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে।








