বৃষ্টিতে আলু ও পেঁয়াজের ব্যাপক ক্ষতি, লোকসানের শঙ্কায় কৃষকরা

শফিকুল ইসলাম
২৩ মার্চ ২০২৬, ২১:০১ আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২৬, ০৯:০৭

অসময়ের বৃষ্টিতে মাঠে থাকা হালি পেঁয়াজ পচে যাওয়া কৃষকদের জন্য একটি বড় বিপর্যয়। এ বৃষ্টি মুখি পেঁয়াজ ও হালি পেঁয়াজ উভয়ের ক্ষেত্রেই মারাত্মক ক্ষতি সৃষ্টি করেছে। অতিরিক্ত আর্দ্রতায় ছত্রাকজনিত রোগ এবং শিকড় পচে মাঠেই নষ্ট হচ্ছে পেঁয়াজ। এছাড়া চলতি মৌসুমে আলুর বাম্পার ফলন হলেও দামের ভয়াবহ ধসে চাষিদের কপালে ভাঁজ পড়েছে। এ কারণে চলতি মৌসুম শেষে দেশে আলু ও পেঁয়াজের সরবরাহে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে বাজারে সৃষ্টি হতে পারে অস্থিরতা। ব্যবসায়ী ও কৃষকের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানিয়েছে, মৌসুমের আকস্মিক শিলাবৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে পেঁয়াজের পাতা এবং কন্দ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আগা মরা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এর ফলে পাতা শুকিয়ে গাছ মরে যাচ্ছে। একইসঙ্গে বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় প্রতি মণ পেঁয়াজের দাম এক হাজার ১০০ টাকায় নেমে এসেছে। মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হতো দুই হাজার ১০০ থেকে দুই হাজার ২০০ টাকায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মৌসুমের শুরুতে শিলাবৃষ্টি হওয়ায় পেঁয়াজের কদমের (বীজ) ফুল ঝরে যাওয়ায় আগামী মৌসুমে বীজের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ অনুযায়ী, পেঁয়াজ সংগ্রহের পর ভালোভাবে শুকানো এবং রোগাক্রান্ত জমি থেকে তোলা পেঁয়াজগুলো দূরে রাখতে পারলে ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানিয়েছে, সম্প্রতি মৌসুমের শুরুতে হওয়া বৃষ্টির নেতিবাচক প্রভাব থেকে কৃষকদের বাঁচাতে পেঁয়াজের জমি থেকে দ্রুত পানি নিষ্কাশন, আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা এবং ছত্রাকনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে এর ক্ষতির প্রভাব কিছুটা কমানো যেতে পারে। পচা বা আক্রান্ত গাছগুলো তুলে ফেলে সুস্থ গাছগুলোকে রক্ষা করতে হবে। যদি সম্ভব হয়, পচা চারার জায়গায় নতুন চারা রোপণ করা যেতে পারে, যদিও এতে সময় বেশি লাগবে।
 
এদিকে চলতি মৌসুমে বাংলাদেশে আলুর বাম্পার ফলন হলেও বাজারদর উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় চাষিরা চরম বিপাকে পড়েছেন। মাঠ পর্যায়ে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ ১৭ থেকে ১৮ টাকা হলেও বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৪ থেকে ১০ টাকায়। যার ফলে উৎপাদন খরচের অর্ধেকও উঠছে না। হিমাগারের অভাব ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় অনেক কৃষক লোকসান এড়াতে মাঠেই আলু ফেলে রাখছেন বা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
 
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাম্পার ফলন সত্ত্বেও বাজারদর কম থাকায় কৃষকরা পুঁজি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। এমনকি, আগামীতে আলু চাষে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন চাষিরা। হিমাগারে জায়গা না পাওয়ায় বা বেশি ভাড়ার কারণে আলু সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না, ফলে পচন ধরছে। এর ফলেও লোকসানের কবলে পড়ছেন কৃষকরা। এর সঙ্গে কিছু এলাকায় আলু পরিবহনে সিন্ডিকেটের প্রভাবতো রয়েছেই।

কৃষকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, তারা চায় সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত বাজার নিয়ন্ত্রণ ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা হোক। হিমাগার সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি আলু রফতানির সুযোগ তৈরি করার দাবিও জানিয়েছেন তারা। কৃষকরা জানিয়েছেন, গত বছরও একই ধরনের পরিস্থিতি হওয়ায় কৃষকরা এবার দ্বিগুণ লোকসানের শিকার হচ্ছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানিয়েছে, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি জমিতে আলু চাষ হওয়ায় এবং বাম্পার ফলন পাওয়ায় বাজারে দাম কমে গেছে। অধিদফতরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম বলেন, “আলু অধ্যুষিত জেলার বাইরেও দেশের বিভিন্ন স্থানের কৃষকেরা আলু চাষ করেছেন। ফলনও ভালো হয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম পড়ে গেছে। এতে কৃষকরা লোকসানের আশঙ্কা করছেন। তবে সংরক্ষণ করতে পারলে বছর শেষে ভালো দাম পাবেন কৃষকরা। এর ফলে তারা লাভবানই হবেন। হতাশ হওয়ার কিছু নাই।”
 
তিনি আরও বলেন, “কৃষকরা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করতে পারে সে বিষয়টি সরকারের নজর রয়েছে। এক্ষেত্রে হিমাগার মালিকরা যাতে কোনও প্রকার সিন্ডিকেট করতে না পারে সে দিকেও সরকারের নজর রয়েছে।”
  দিনাজপুরের আলু ক্ষেতে কাজ করছে একজন। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন
জানতে চাইলে মুন্সিগঞ্জের আলু চাষি আমজাদ হোসেন ফকির বলেন, “ফলন ভালো পেয়েছিলাম। কিন্তু দাম না পাওয়ায় লোকসানের প্রহর গুনছি। হিমাগারগুলো যদি সিন্ডিকেট করে বেশি ভাড়া চায় তাহলে আমাদের মরে যাওয়া ছাড়া কোনও পথ খোলা থাকবে না।”

পাবনার পেঁয়াজ চাষি মো. শাহীন মিয়া বলেন, “এ বছর মুখি ও হালি উভয় জাতের পেঁয়াজের উৎপাদন ভালো হয়েছে। এতে আমরা সুখের দিনের অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু মৌসুমের আগাম বৃষ্টি উভয় জাতের পেঁয়াজের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে। আমরা এ থেকে বাঁচার উপায় খুঁজছি। আগামী কয়েকদিন যদি বৃষ্টি না হয় তাহলে আমরা এ বছরের মতো উৎরে যেতে পারবো।”
    
রাজধানী শ্যামবাজারের পেঁয়াজ ও আলুর পাইকারি ব্যবসায়ী তোবারক হোসেন বলেন, “সরবরাহ ভালো। তবে চাহিদা কম থাকায় বাজার নিম্নমুখী। বৃষ্টিতে পেঁয়াজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আলুর পরিস্থিতি আগে থেকেই ভালো না। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে কোনও ধরণের উদ্যোগ না নিলে সামনে বিপদ হতে পারে। কোনও কারণে আলু ও পেঁয়াজের সংকট সৃষ্টি হলে বাজার কিন্তু অস্থির হয়ে উঠবে।”
 
জানতে চাইলে কৃষিমন্ত্রী মোহম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, “বিষয়টি সরকারের নজরে আছে। আমরা এটি নিয়ে চিন্তাভাবনা করছি। আশা করছি, উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু হবে না।”
 
উল্লেখ্য, দেশে মানুষের খাওয়া ও বীজ হিসেবে মোট আলুর চাহিদা প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ লাখ টন। ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ মৌসুমে আলুর উৎপাদন এক কোটি চার লাখ থেকে এক কোটি ৩০ লাখ টনে পৌঁছেছে, যা দেশের ইতিহাসে রেকর্ড। অপরদিকে দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ লাখ টন। গত মৌসুমে প্রায় ৪২ লাখ ৪৫ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন করা হয়েছে।

/এসআই/এবিএম/
সম্পর্কিত
বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপের শঙ্কা, যেসব অঞ্চলে বৃষ্টির পূর্বাভাস
রাজধানীতে বৃষ্টি, কালো মেঘে ঢেকে আছে পুরো আকাশ 
৮ বিভাগেই বৃষ্টির পূর্বাভাস, ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই বিদায় নিচ্ছে মৌসুমি বায়ু
সর্বশেষ খবর
পরাজিত শক্তির কালো টাকা দিয়ে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির চক্রান্ত চলছে: রিজভী
পরাজিত শক্তির কালো টাকা দিয়ে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির চক্রান্ত চলছে: রিজভী
যে কারণে এআইকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে নিষেধ করলেন মাক্রোসফটের সিইও
যে কারণে এআইকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে নিষেধ করলেন মাক্রোসফটের সিইও
বিরোধী দলকে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের আহ্বান ডেপুটি স্পিকারের
বিরোধী দলকে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের আহ্বান ডেপুটি স্পিকারের
আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে আলোচনার চেষ্টা চলছে: প্রতিমন্ত্রী
আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে আলোচনার চেষ্টা চলছে: প্রতিমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
লাখ টাকায় আইফোন কিনে বাড়িতে নেওয়ার পরই গেলো পুলিশ
লাখ টাকায় আইফোন কিনে বাড়িতে নেওয়ার পরই গেলো পুলিশ
আগুন কখন নিয়ন্ত্রণে আসবে নিশ্চিত নয়: ফায়ার সার্ভিস
আগুন কখন নিয়ন্ত্রণে আসবে নিশ্চিত নয়: ফায়ার সার্ভিস
ড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠান ‘কর ফাঁকি দেওয়ার একটি ধ্রুপদি উদাহরণ’: হাইকোর্ট
ড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠান ‘কর ফাঁকি দেওয়ার একটি ধ্রুপদি উদাহরণ’: হাইকোর্ট
আরও ১৮ ফ্লাইট বাতিল, শাহজালাল বিমানবন্দরে আটকা ৪৮৫১ যাত্রী
আরও ১৮ ফ্লাইট বাতিল, শাহজালাল বিমানবন্দরে আটকা ৪৮৫১ যাত্রী
ইন্ডিয়া জোটের পদযাত্রায় হাজার হাজার বিক্ষোভকারী, অনড় রাহুল গান্ধী
ইন্ডিয়া জোটের পদযাত্রায় হাজার হাজার বিক্ষোভকারী, অনড় রাহুল গান্ধী