মিলেনিয়ালের চোখে বৈশ্বিক অস্থিরতা

তাহমিদ হাসিব খান
০২ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:৪২আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:৪২

মিলেনিয়াল হিসেবে আমাদের প্রাপ্তবয়স্ক জীবন যেন ক্রমাগত সংকটের ছায়ায় আচ্ছন্ন। শুধু স্থানীয় বিঘ্ন নয়, বরং একের পর এক বৈশ্বিক সংকট—যেগুলো কয়েক মাসের মধ্যেই অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়, প্রতিষ্ঠানগুলোকে নড়বড়ে করে ফেলে এবং লাখ লাখ মানুষকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়।

আফগানিস্তান ও ইরাকের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে এনেছিল। তবুও ২০০০-এর দশকের শুরুতে বিশ্বজুড়ে এক ধরনের আশাবাদ ছিল। যুগের মোড়ে মনে হচ্ছিল স্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক সংযোগ ও উন্নয়নের এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে—যদিও ৯/১১-এর ঘটনা সেই আশার ওপর গভীর ছায়া ফেলেছিল।

দুই দশক পরে এসে সেই আশাবাদ ক্রমেই ভঙ্গুর হয়ে উঠেছে।

মার্চের শেষ দিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, দেশজুড়ে জ্বালানির সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলেও হঠাৎ বেড়ে যাওয়া চাহিদা ও আতঙ্কজনিত কেনাকাটার কারণে পাম্পগুলোতে অস্বাভাবিক দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। তিনি জনগণকে অপ্রয়োজনীয় মজুত না করার আহ্বান জানান।

অপরদিকে, কিছু জ্বালানি পাম্পে রেশনিং শুরু হয়েছে এবং গ্যাস সাশ্রয়ের জন্য কয়েকটি সার কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

ঢাকার বিভিন্ন পাম্পে দীর্ঘ লাইনের এই দৃশ্য নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—আমরা কি আরেকটি বৈশ্বিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছি?

আরও বড় প্রশ্ন হলো, কেন এই বৈশ্বিক সংকটগুলো এত ঘন ঘন ঘটছে?

২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট এবং ২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারির পর ২০২৬ সালে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট—এই ধারাবাহিকতা যদি সত্যিই তৈরি হয়ে থাকে, তবে স্পষ্টই বোঝা যায় যে বড় সংকটগুলোর মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই কমে আসছে। এটি বিশ্বের জন্য উদ্বেগজনক ইঙ্গিত।

প্রতিটি বৈশ্বিক সংকট মানুষের জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। মিলেনিয়ালদের জন্য ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট ছিল প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের প্রথম বড় ধাক্কা। যুক্তরাষ্ট্রে মর্টগেজ-সমর্থিত সিকিউরিটিজের ধস থেকেই এই সংকটের সূত্রপাত। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বাজারে ছড়িয়ে পড়া এসব আর্থিক পণ্যের পেছনে ছিল অতিরিক্ত উত্তপ্ত আবাসন বাজার।

ফলে হাউজিং বাজার ভেঙে পড়ে, বেকারত্ব বেড়ে যায় এবং অসংখ্য পরিবার তাদের সঞ্চয় হারায়। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই লক্ষ লক্ষ বাড়ি নিলামে যায়, গৃহহীনতার হারও বেড়ে যায়।

এর প্রভাব অর্থনীতির বাইরেও ছড়ায়—খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে, শিশু কুপুষ্টি বৃদ্ধি পায়। একই চিত্র বিশ্বজুড়েই দেখা যায়।

এর ১২ বছর পর আসে ২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারি। এটি শুধু স্বাস্থ্য সংকট নয়, একইসঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটও ছিল। বাংলাদেশে লকডাউনের কারণে কর্মসংস্থান ব্যাহত হয়, আয় কমে যায় এবং লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মুখে পড়ে। স্বাস্থ্য খাত পড়ে নজিরবিহীন চাপে, আর ব্যবসাগুলো দীর্ঘদিন স্থবির অবস্থার সঙ্গে লড়াই করে।

বিশ্ব যখন সেই ধাক্কা সামলানোর চেষ্টা করছে, তখনই আসে আরেকটি বড় আঘাত।

২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের ফলে বৈশ্বিক তেল, গ্যাস ও খাদ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো—যেমন বাংলাদেশ—এর সরাসরি প্রভাব অনুভব করে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে, জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যায় সরকার ও ভোক্তা—উভয়ের জন্যই।

আসলে আর্থিক সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি আবাসন ও জনস্বাস্থ্যের সংকটও। আবার মহামারিও শুধু স্বাস্থ্য সংকট নয়, এটি অর্থনীতিকেও নাড়িয়ে দেয়। এই সংকটগুলোর সীমানা তাই আলাদা করে টানা যায় না।

স্বাস্থ্যগত দৃষ্টিকোণ থেকে, সংকট শুধু মৃত্যুহার বাড়ায় না—মানুষের জীবনমানও কমিয়ে দেয়। রোগ, দারিদ্র্য ও সামাজিক অস্থিরতা মিলিয়ে মানুষের জীবনকাল ও জীবনমান—দুটোকেই প্রভাবিত করে।

এই আন্তঃসংযুক্ত বাস্তবতার কারণে বর্তমান জ্বালানি সংকট আরও উদ্বেগজনক। প্রশ্ন উঠছে—বড় বৈশ্বিক বিঘ্নগুলোর মধ্যকার ব্যবধান কি সত্যিই কমছে? আর এর সঙ্গে সঙ্গে কি মানুষের জীবনমানও দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?

বাংলাদেশ তার তরল জ্বালানির বড় অংশ আমদানি করে, যার বেশিরভাগই নির্ভর করে হরমুজ প্রণালীর ওপর। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিয়েছে, এলএনজির দাম বাড়িয়েছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন চালিয়ে যেতে বাংলাদেশকে ব্যয়বহুল স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য করছে।

এর প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান—রেশনিং নিয়ে আলোচনা, গ্যাস সরবরাহ কমে আসা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে সার কারখানা বন্ধ রাখা।

এ পরিস্থিতি কি খাদ্য সংকটে রূপ নেবে—সার ঘাটতি বা কৃষি উৎপাদনে ব্যাঘাতের কারণে? পানির সংকট কি তীব্র হবে—জলবায়ু পরিবর্তন ও নগরায়ণের চাপে? নাকি ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও জটিল পরিস্থিতি তৈরি করবে?

এই লেখাটি কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বরং গত দুই দশকের অভিজ্ঞতার আলোকে একটি ভাবনা।

সংকটের ধরন বদলাতে পারে, কিন্তু মানুষের অস্থিরতার অভিজ্ঞতা একই থাকে। যদি বৈশ্বিক ধাক্কা সত্যিই ঘন ঘন আসতে থাকে, তবে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশকে আরও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।

শক্তির উৎস বৈচিত্র্য করা, পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে অংশীদারিত্ব জোরদার করা, সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা—এসব আর বিকল্প নয়, বরং সময়ের দাবি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখনই ভাবার সময়—পরবর্তী সংকট আসবে কি না, তা নয়; বরং সেটি এলে আমরা কতটা প্রস্তুত থাকব।

লেখক: জনস্বাস্থ্য গবেষক ও কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজিস্ট, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্বাস্থ্য সেবা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কাজ করছেন

/এম/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
সীমান্তে কঠোর বিজিবি, ১০ পুশ-ইন চেষ্টা প্রতিহত
সীমান্তে কঠোর বিজিবি, ১০ পুশ-ইন চেষ্টা প্রতিহত
যুবদলের ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন
যুবদলের ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: সবচেয়ে বেশি চাপে মধ্যবিত্ত
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: সবচেয়ে বেশি চাপে মধ্যবিত্ত
দেশে ফিরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
দেশে ফিরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম