দেশে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম কাঠামো গড়ে তুলতে একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনে সরকারের উদ্যোগকে ইতিবাচক বলে মনে করেন গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা। তবে কমিশন গঠনের প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যম মালিক, সম্পাদকীয় ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধি; সম্পাদক, আইন বিশেষজ্ঞ; সাংবাদিকতা বিষয়ক শিক্ষক এবং গণমাধ্যম উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রতিনিধিসহ অন্যান্য অংশীজনদের মতামত এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে এটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে বলে এক মতবিনিময় সভায় আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
শনিবার (১৩ জুন) মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) ও বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) যৌথ উদ্যোগে ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া সাপোর্ট (আইএমএস), ডেনমার্কের সহযোগিতায় আয়োজিত ‘গণমাধ্যম কমিশন: সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অংশগ্রহণকারীদের মতামত ও সুপারিশগুলো তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে।
গণমাধ্যম সংস্কারে এমআরডিআই’র পাঁচ বছর মেয়াদি (২০২৫-২০৩০) অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম পরিকল্পনার আওতায় আয়োজিত এ সভায় বক্তারা বলেন, গণমাধ্যম অংশীজন এবং নাগরিকের মতামতের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা উচিত। এই কমিশন ভবিষ্যতে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের নৈতিক মান বজায় রেখে স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার মধ্য দিয়ে দর্শক-শ্রোতা ও পাঠকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কাজ করবে। পাশাপাশি প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যম ও সংবাদ সংস্থার কর্মরত সাংবাদিকদের সাংবাদিকতার মান, কর্মপরিবেশ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
এমআরডিআই’র নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমানের সঞ্চালনায় সভায় খসড়া গণমাধ্যম কমিশন আইনের আইনি বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন। সভার শুভেচ্ছা বক্তব্যে হাসিবুর রহমান বলেন, একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম কমিশন গঠন হবে গণমাধ্যম সংস্কারের প্রথম ধাপ। বর্তমান সরকার তার নির্বাচনি ইশতেহারে একটি স্বাধীন এবং জবাবদিহিমূলক মিডিয়া রেগুলেটরি কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব করেছে এবং তার অংশ হিসেবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যেই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
স্বাধীন কমিশন আসলে কেমন হওয়া উচিত, এই আলোচনা অংশীজনদের নিয়ে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের জমা দেওয়া ‘বাংলাদেশ গণমাধ্যম কমিশন’ খসড়া অধ্যাদেশের ওপর ভিত্তি করে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত সর্বশেষ ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৬ (খসড়া)’ অনুযায়ী শুরু করা যেতে পারে বলে মতামত দেন তিনি।
সভায় খসড়া গণমাধ্যম কমিশন আইনের আইনি বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে সারা হোসেন বলেন, বাংলাদেশে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের বর্তমান কাঠামোটি খণ্ডিত এবং এর দায়িত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভক্ত। একইসঙ্গে সাংবাদিক সুরক্ষা, কর্মপরিবেশ, ডিজিটাল পরিসরে ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের ঝুঁকি এবং গণমাধ্যমের প্রতি জনআস্থার ঘাটতির মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। এ প্রেক্ষাপটে একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গণমাধ্যমের পেশাগত মান, জবাবদিহি ও স্বাধীনতা শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
খসড়া গণমাধ্যম কমিশন আইনে স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার কথা বলা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কমিশনের ভূমিকা হবে গণমাধ্যম খাতকে সহায়তা করা যাতে সাংবাদিকতা পেশা নিজস্ব নৈতিক ও পেশাগত মানদণ্ড নির্ধারণ ও অনুসরণ করতে পারে। পাশাপাশি কমিশন জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কারে ভূমিকা রাখবে।
সারা হোসেন আরও বলেন, সাংবাদিকতার নীতিমালা ও মানদণ্ড অবশ্যই পেশাদার সাংবাদিকদের উদ্যোগে, স্বাধীনভাবে এবং যেকোনও ধরনের প্রভাবমুক্ত পরিবেশে প্রণীত হতে হবে। একইসঙ্গে কমিশনকে কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা থাকতে হবে। কমিশনের সদস্য নির্বাচন প্রক্রিয়াও হতে হবে উন্মুক্ত, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক।
তার মতে, সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতার মানদণ্ড নির্ধারণের ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হলেও এ ধরনের নীতিমালা প্রণয়নের আগে সাংবাদিক, সম্পাদক, প্রকাশক, গণমাধ্যম উন্নয়ন সংস্থা এবং অন্যান্য অংশীজনদের সঙ্গে ব্যাপক পরামর্শ নিশ্চিত করা জরুরি।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান এবং দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদের মতে, অংশীজনদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এ ধরনের কমিশন তার লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে না। কমিশন কার স্বার্থ রক্ষায় গঠিত হচ্ছে, এ নিয়ে যতদিন অনিশ্চয়তা থাকবে, ততদিন উদ্বেগও থাকবে।
কামাল আহমেদ আরও বলেন, এই কমিশনকে কার্যকর করতে হলে অংশীজনদের পক্ষ থেকে নিয়মিত ও স্বপ্রণোদিত ভূমিকার পাশাপাশি গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়েও ধারাবাহিক চাপ বজায় রাখতে হবে।
তার মতে, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশমালায় কমপক্ষে এক ডজন গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব রয়েছে; যা দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। তা না হলে গণমাধ্যম খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে না এবং একটি কমিশন গঠন করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা সম্পূর্ণভাবে সম্পাদকদের হাতে থাকতে হবে, আর মালিকদের দায়িত্ব সীমিত থাকতে হবে আর্থিক ব্যবস্থাপনায়। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হবে এই খাতের মূল ভিত্তি।
প্রথম আলোর উপসম্পাদক লাজ্জাত এনাব মহছি বলেন, স্ব-নিয়ন্ত্রণ বা নীতিমালা যাই বলা হোক না কেন, সেটি অবশ্যই কার্যকরভাবে মানতে হবে তবে নামের চেয়ে বাস্তব প্রয়োগই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এ প্রেক্ষাপটে একটি স্বাধীন মিডিয়া কমিশন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কমিশনকে আর্থিকভাবে স্বাধীন হতে হবে এবং যথাযথ ক্ষমতা থাকতে হবে। কমিশনের হাতে লাইসেন্স বাতিলের ক্ষমতা না থাকলেও অন্তত কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা থাকা উচিত, যাতে এটি শুধু একটি প্রতীকী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ না থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি, যা সংবাদমাধ্যমের টিকে থাকার প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সমস্যা ও চ্যালেঞ্জগুলো আমরা সবাই জানি। একইসঙ্গে পাঠক-দর্শক ও সংবাদমাধ্যম এখন এক ধরনের মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে, যার মূল কারণ হলো পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি। বর্তমানে আমরা এক ধরনের নিয়ন্ত্রণহীন পরিস্থিতির মধ্যে আছি, যেখানে কোনও কার্যকর সমন্বয়ও নেই।
কমিশন গঠনের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, এই কমিশন কতটা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকবে, কতটা অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে এবং কতটা প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারবে সেখানে প্রশ্ন আছে তবে আমরা সবাই পরিবর্তন চাই। প্রস্তাবিত কমিশন এমনভাবে গঠন করা উচিত যাতে এটি নিয়মিতভাবে অংশীজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, তাদের প্রত্যাশা ও মতামত গ্রহণ করে এবং একটি কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু রাখে।
অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্সের (অ্যাটকো) মহাসচিব ও একুশে টেলিভিশনের সিইও আব্দুস সালাম বলেন, কমিশনের প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশনের ব্যয় নির্বাহের জন্য সব গণমাধ্যমের বার্ষিক আয়ের এক শতাংশ প্রদানের যে প্রস্তাব রয়েছে, সেটি নীতিগতভাবে ভালো উদ্যোগ হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা বাস্তবায়নযোগ্য নয় এবং এ জন্য প্রস্তাবিত হার এ হার পুনর্বিবেচনা করে তা কমিয়ে আনার সুপারিশ করেন তিনি।
দৈনিক সমকালের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী তার বক্তব্যে গণমাধ্যম খাতে স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কীভাবে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করা যায়, সে বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটন বলেন, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল যেসব ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা উচিত। তিনি প্রস্তাবিত গণমাধ্যম কমিশনের আওতায় একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল অন্তর্ভুক্ত করার দিকে গুরুত্ব আরোপ করেন; যেখানে এই প্যানেল সাংবাদিকদের জন্য যে কোনও প্রয়োজনে আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে পারে।
মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত– মাছরাঙা টিভির সাবেক প্রধান সম্পাদক রেজোয়ানুল হক রাজা; যমুনা টেলিভিশননের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফাহিম আহমেদ; ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ; আগামীর সময়ের সম্পাদক মোস্তফা মামুন; খবরের কাগজের সম্পাদক মোস্তফা কামাল; চ্যানেল আইয়ের প্রধান নির্বাহী সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ খান প্রমুখ।









