সহকর্মীর শেষ ইচ্ছা আজও তাড়া করে ফেরে মেহেরুন নেসাকে 

আসাদ আবেদীন জয়
২১ জুলাই ২০২৬, ০৯:০০ আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ০৯:০০

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের শেষ মুহূর্তের স্মৃতি আজও তাড়া করে ফেরে শিক্ষকদের। ২১ জুলাইয়ের সেই ট্র্যাজেডি তাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হয়ে রয়ে গেছে। বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধ বিমানের ওই দুর্ঘটনায় প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে নিজের সহকর্মীকে হারান মেহেরুন নেসা। আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমার যদি বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা বলতে বলেন, খুব সংক্ষেপে বলা সম্ভব না। কারণ একেকজনের কাছে এই ঘটনা একটি স্মৃতি হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে এটি শুধু একটি স্মৃতি নয়...। প্লেন বিধ্বস্ত হওয়ার পর বাচ্চাদের নিয়ে বের হয়েছি, হাসপাতাল গেছি, লুবানায় গেছি, বার্ন ইউনিটে গেছি। সেখানে ভর্তি থাকা ৫৭ জন শিশু, শিক্ষক, অভিভাবক, আয়া, পিয়ন—প্রত্যেকের সঙ্গেই আমার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। কাকে বাদ দিয়ে কার কথা বলবো?’’

নিজের সহকর্মীর কথা মনে করে কান্না জড়ানো কণ্ঠে মেহেরুন নেসা বলেন, ‘‘আরেকজন ছিলেন আমার সহকর্মী মাসুকা বেগম। তিনি মারা গেছেন। আমি যখন তার কাছে যাই, তার চেহারা দেখে চিনতে পারছিলাম না। পরে আমি বললাম, ‘মাসুকা, আমাকে চিনতে পারছো? আমি মেহরুন মিস।’ তখন তিনি চিৎকার করে বললেন, ‘মেহরুন, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।’ আমি বললাম, ‘আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’’

তারপর তিনি (মাসুকা) জিজ্ঞেস করলেন, ‘হেডমিস আর রিফাত মিস কি আমাকে দেখতে আসবে না?’ আমি বললাম, 'আসবে।' এরপর তিনি শুধু বলছিলেন, ‘আমি সারাদিন পানি খাইনি। আমাকে একটু পানি দাও। গ্যাস্ট্রিকের ওষুধও খাইনি, ওষুধ দাও।’

আমি বললাম, ‘তোমার স্যালাইন চলছে, পানি খেতে হবে না।’ তিনি বললেন, ‘আমি ওয়াশরুমে যাবো।’ আমি বললাম, ‘তোমার ক্যাথেটার করা আছে, যেতে হবে না।’ কিন্তু তিনি শুধু বলেই যাচ্ছিলেন, ‘আমাকে পানি খাওয়াও।’

‘‘তার সেই পানির আকুতি দেখে আমার মনে হচ্ছিল, তিনি আর বাঁচবেন না। আমি তাকে সামান্য একটু পানি মুখে দিই। তখন ডাক্তার-নার্স আমাকে বলেন, এভাবে পানি দেওয়া যাবে না। পরে ডাক্তার বলেন, কটনে পানি নিয়ে শুধু ঠোঁট ভিজিয়ে দিতে। আমি বারবার তার ঠোঁট ভিজিয়ে দিচ্ছিলাম। মৃত্যুর আগে মানুষের পানির জন্য কী অসহায় আকুতি হতে পারে, আমি নিজের চোখে দেখেছি।’’

আমার তখন মনে হলো, ‘‘তিনি আর বাঁচবেন না। তাই আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি যদি মারা যাও, তোমার লাশ আমি কী করবো? তোমার কোনও অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না।’’

‘‘একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে এই প্রশ্ন করা কতটা কঠিন, সেটা ভাষায় বোঝানো যাবে না। তিনি (মাসুকা) আমাকে বললেন, ‘‘আমার একটা বোন আছে। তার নম্বর হেডমিসের কাছে আছে। যদি সে আমার লাশ নিতে অস্বীকার করে, তাহলে তুমি আমার বোন হয়ে আমাকে দাফন করে দিও।’’

মাসুকা বেগমের মৃত্যুর পরের কথা মনে করে মেহেরুন নেসা  বলেন, ‘‘তিনি (মাসুকা)  মারা গেলেন। আমি অনেক চেষ্টা করেও তার আত্মীয়স্বজনের কাউকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে এক খালাতো ভাইয়ের মাধ্যমে তার বোনের নম্বর পাই। তখন আমার মনে হয়েছিল, তারা লাশ নিতে চায়নি। পরে যখন বুঝেছে লাশ নিলে অনেক সুবিধা হবে, তখন পরদিন সকাল ১০টার দিকে আসে। এর আগে আমাদের কর্তৃপক্ষ লাশ দাফনের জন্য টাকা-পয়সা দেয়। আমি কোয়ান্টামের লোক ডেকে এনে গোসল করাই, কাফনের ব্যবস্থা করি, সব প্রস্তুত করি। যখন ফ্রিজিং ভ্যানে লাশ তোলা হয়েছে, তখন তার বোন, দুলাভাই ও ভাগ্নি এসে পৌঁছান।’’

‘‘এখন মনে হয়, যদি তখন এতটুকু বুঝতাম— তাহলে হয়তো তাদের হাতে লাশ তুলে দিতাম না। কারণ আগের রাতেও তারা আসতে চাননি। কিন্তু মাসুকা আমাকে শেষ ইচ্ছা জানিয়ে গিয়েছিলেন—তার বোন এলে যেন আমি লাশ বুঝিয়ে দিই। তাই আমি সেটাই করেছি।’’

তিনি বলেন, ‘‘আমি জানি, এখন তার অনেক আত্মীয়স্বজন আছে, কারণ টাকা-পয়সার বিষয় এসেছে। কিন্তু আমি এটাও জানি, তার নামে কোনও দিন একটি মিলাদও তারা পড়াবে না। ওর অনেক ঈদ ঢাকায় একা কেটেছে। কেউ খোঁজ নেয়নি। এমন দিনও গেছে, নিজের বাড়িতে ভাত মুখে তুলেই আবার ঢাকা ফিরে আসতে হয়েছে। নিজের ঘরেও তার জায়গা হয়নি। অথচ আজ তার টাকা-পয়সার জন্য মানুষের অভাব নেই।’’

মেহেরুন বলেন, ‘‘এখন যখন কেউ আমাকে ফোন করে বলে, ‘মাসুকা তো আমার বোন ছিল, তুমি তাকে কালেমা পড়িয়েছো’—তখন আমার সত্যিই খুব ঘৃণা লাগে। আমি সেই মানুষগুলোর ফোনও ধরতে চাই না।... আমি চাই, আপনারা অন্তত মাসুকার গল্পটা লিখুন। যেন মানুষ বুঝতে পারে, আমাদের দেশের অনেক নারী কতটা অবহেলার মধ্যে জীবন কাটান।’’

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২১ জুলাই উত্তরার দিয়াবাড়িতে অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হলে ৩৬ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ২৮ জন ছিলেন শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় প্রাণ হারান যুদ্ধবিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামও।

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
চেক-ইন লাগেজে পাওয়ার ব্যাংক, নিরাপত্তা ঝুঁকিতে উড্ডয়নের আগেই ফিরে এলো বিমান
মাঝ আকাশে ককপিটে ওমান ও ভারতের পাইলট কেন মারামারি করলেন?
কঙ্গোতে বিমান দুর্ঘটনায় দুই জেনারেলসহ নিহত ১৪
সর্বশেষ খবর
রোনালদোর ২৫৫ ইউরো জরিমানা, যা আয় করেন মাত্র কয়েক সেকেন্ডে!
রোনালদোর ২৫৫ ইউরো জরিমানা, যা আয় করেন মাত্র কয়েক সেকেন্ডে!
ভুটান থেকে ঢাকায় এসে কী বললেন ফিফা সভাপতি 
ভুটান থেকে ঢাকায় এসে কী বললেন ফিফা সভাপতি 
দলের সঙ্গে যারা মুনাফিকি করবেন তারেক রহমান তাদের ক্ষমা করবেন না: আইনমন্ত্রী
দলের সঙ্গে যারা মুনাফিকি করবেন তারেক রহমান তাদের ক্ষমা করবেন না: আইনমন্ত্রী
এসসিও বৈঠকে ইসহাক দারের উপস্থিতিতে যা বললেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী
এসসিও বৈঠকে ইসহাক দারের উপস্থিতিতে যা বললেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত