জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া গ্রাফিতি জনআকাঙ্ক্ষার দৃশ্যমান প্রকাশ হয়ে উঠেছিল। তবে সময়ের সঙ্গে শ্রমজীবী, আদিবাসী, শিশু ও নিম্নবর্গের অভিজ্ঞতা ও ইতিহাস মূলধারার বয়ান থেকে অদৃশ্য হয়ে পড়ছে। গ্রাফিতি মুছে ফেলা বা ছিঁড়ে ফেলার মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থানের বহুমাত্রিক জনআকাঙ্ক্ষাকেও আড়াল করা হয়েছে।
শনিবার (৩ সেপ্টেম্বর) আয়োজকদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ‘গণঅভ্যুত্থানের জনআকাঙ্ক্ষা ও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সাংবিধানিক বহুত্ববাদ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা। আইপিনিউজ বিডির উপদেষ্টা সম্পাদক সতেজ চাকমার সঞ্চালনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ।
মূল প্রবন্ধে পাভেল পার্থ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে শুধু সরকার বা শাসন পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে না দেখে দীর্ঘদিনের বৈষম্য, উপনিবেশিক কাঠামো ও কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে চলমান প্রতিরোধের অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, কাপ্তাই বাঁধ, মধুপুর ও ফুলবাড়ীসহ বিভিন্ন গণপ্রতিরোধের ধারাবাহিকতার সঙ্গে জুলাইয়ের যোগসূত্র রয়েছে।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের গ্রাফিতিতে আদিবাসী আত্মপরিচয়, আদিবাসী-বাঙালি সংহতি, ভূমি ও পরিবেশ রক্ষার দাবি এবং সামরিকায়নের প্রশ্ন উঠে এসেছে। কল্পনা চাকমার নিখোঁজ, আদিবাসী নিপীড়ন ও বিচারহীনতার বিষয়ও বিভিন্ন গ্রাফিতিতে প্রতিফলিত হয়েছে। ‘কল্পনা চাকমা কোথায়’, ‘জাস্টিস ফর কল্পনা চাকমা’, ‘ইনডিজেনাস লাইভস ম্যাটার’, ‘পাহাড়ে কবে মুক্তি মিলবে’ ও ‘পরাধীন পাহাড়’-এর মতো বার্তায় অধিকার, স্বীকৃতি, বৈষম্য ও বঞ্চনার বিষয়গুলো সামনে এসেছে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন এখনো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি নারীসহ সব মেহনতি মানুষের অধিকারের কথা সংসদে তুলে ধরেছিলেন। জুলাই সনদে বহুত্ববাদের কথা বলা হলেও বৈষম্য কীভাবে দূর করা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রমেও আদিবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি।
ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদ বলেন, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম বা নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীর অধিকার নয়, বিভিন্ন জাতিসত্তা, অধিকারহীন জনগোষ্ঠী ও মেহনতি মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন। আজ বাংলাদেশে বহুত্ববাদের যে আলোচনা হচ্ছে, লারমা ১৯৭২ সালেই সেই কথা বলেছিলেন।
কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, বহুত্ববাদের কথা অনেক সময় মুখের কথাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। বিভিন্ন কমিশনে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব না থাকা এবং আদিবাসীদের বাঙালি হিসেবে পরিচিত করার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি জাতির পরিচয় নির্ধারণ করে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির লক্ষ্য অনুযায়ী আদিবাসীদের অধিকার, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভাষা সংরক্ষণের বিষয়টিও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য দীপায়ন খীসা বলেন, জুলাই সনদে বাংলাদেশকে বহুজাতি, বহুধর্মী ও বহুভাষী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। তবে বহুত্ববাদ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়ে আরও সুস্পষ্ট আলোচনা প্রয়োজন। একটি জনগোষ্ঠীর জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় তারা নিজেরাই নির্ধারণ করবে এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই পরিচয়কে স্বীকৃতি ও সম্মান করা।
কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক সাখাওয়াত টিপু বলেন, রাষ্ট্রের সব জনগোষ্ঠী ভালো না থাকলে সেই রাষ্ট্রও প্রকৃত অর্থে ভালো থাকতে পারে না। সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর মানুষ নিরাপদে, শান্তিতে ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারলেই রাষ্ট্রের প্রকৃত চরিত্র বোঝা যায়।
বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ফাল্গুনী ত্রিপুরা বলেন, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা গরিব, মেহনতি মানুষ, বেদে, জেলে ও নারীদের অধিকারের কথা বলেছেন। তাঁর দর্শনে নারী-পুরুষ, কৃষক-শ্রমিকসহ সমাজের সব মানুষের অধিকার ও সমতার বিষয়টি ছিল। আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সাংবিধানিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিশ্চিত না হলে প্রকৃত বহুত্ববাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, জুলাইয়ের বহুত্ববাদ, অন্তর্ভুক্তি ও জাতিগত সংহতির জনআকাঙ্ক্ষাকে কার্যকর রাখতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও কণ্ঠকে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি।