‘পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় মন্ত্রীকে রাত জেগে পাহারা দিতে হয়, তাহলে সরকারি চাকরির কোনও পরীক্ষাই সুষ্ঠুভাবে হওয়া সম্ভব না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন, তাহলে কীভাবে সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা হওয়ার আশা করা যায়?’ যুব উন্নয়ন অধিদফতরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় বাতিল হওয়া পরীক্ষা পুনরায় অনুষ্ঠিত হওয়ার পর কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে এমন প্রশ্ন তুলেছেন পরীক্ষার্থীরা।
তাদের অভিযোগ, একবার পরীক্ষায় বসার পর প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) আবারও একই পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে তাদের। এতে আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির পাশাপাশি পরীক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন ফাঁসের আশঙ্কাও রয়ে গেছে। তাদের মতে, সরকারি চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এ প্রবণতা কমবে না।
নরসিংদীর শফিকুর রহমান যুব উন্নয়ন অধিদফতরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের পরীক্ষা দিয়ে রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের বনশ্রী শাখা থেকে বের হচ্ছিলেন। সেখানে কথা হয় তার সঙ্গে।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমি একজন পরীক্ষার্থী হিসেবে বলবো, গত সপ্তাহে আমরা এটা ফ্রেশ মাইন্ডে পরীক্ষা দিতে আসলাম। কেন্দ্রেও ঢুকলাম। হঠাৎই বলা হলো আমাদের পরীক্ষা বাতিল। সেই সময় একজন পরীক্ষার্থী হিসেবে কেমন লেগেছে, এটা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। এরপর আবারও পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা হলো। সেই দিনের মনমানসিকতা আর আজকের মানসিকতা এক থাকবে? আমরা আজও তো টেনশনে ছিলাম, পরীক্ষা হয় কি না?’
তিনি বলেন, ‘শুনলাম মন্ত্রী নাকি পরীক্ষার প্রশ্ন পাহারা দিয়েছেন, এটা কি একটা দেশে হতে পারে? তাহলে বুঝতে হবে সমস্যা কোথায়? এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। তাহলে এ প্রবণতা কমবে?’
চাকরিপ্রার্থী শাকিলার ক্ষোভও একই রকম। তিনি বলেন, ‘একবার করে ফাঁস হবে, আমরা চলে যাবো, রাস্তায় নামবো, আন্দোলন করবো, আরেকবার ডেট দেবে, আবার আসবো; এগুলো তামাশা ছাড়া কিছুই নয়।’
তিনি বলেন, ‘যে দেশে মন্ত্রীরা পরীক্ষার প্রশ্ন পাহারা দেন, সেই দেশের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কতটা সৎ, সেটার কি আবার প্রমাণ দিতে হবে?’
শাকিলা আরও বলেন, ‘আমরা ছাত্র বারবার আসতে তো টাকাও লাগে। এই টাকা কি সরকার দেয়? যে কোনও পরীক্ষারই প্রশ্ন ফাঁস হওয়া কোনওভাবেই কাম্য নয়। এই চক্রকে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। ফাঁস হলে তো মেধার মূল্যায়ন হলো না। আমরা মেধার মূল্যায়নের জন্যই তো এত ত্যাগ স্বীকার করলাম। তাহলে পরিবর্তনটা হলো কোথায়?’
পরীক্ষার্থী আবির হোসেন বলেন, ‘কেন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হবে? তাহলে আমরা কি বুঝবো, প্রথমে তারা এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি? যখন বিষয়টি সবাই সরব হলো, তখন সরকার কঠোর হলো। এমনকি মন্ত্রী নাকি পরীক্ষার প্রশ্ন পাহারা দিয়েছেন। এটা কেন হবে? আমরা কি আর কোনও দিন ভালো হব না? যারা এর সঙ্গে জড়িত, তাদের শাস্তি চাই। আর কিছু বলার নাই।’
প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় গ্রেফতার ৭
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে গত ১০ অক্টোবর লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পরীক্ষা বাতিল করা হয়। এ নিয়ে পরীক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে আন্দোলনও করেন। পরে কর্তৃপক্ষ শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) পুনরায় পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করে। সেই অনুযায়ী রাজধানীর ৯৬টি কেন্দ্রে কয়েক হাজার পরীক্ষার্থী এ পদের পরীক্ষায় অংশ নেন।
প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় সাতজনকে গ্রেফতার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন পরিবেশ অধিদফতরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম (৩৩), চাকরিপ্রত্যাশী মো. মফিজুল ইসলাম (২৩), মো. হাসিনুর রহমান সুজন (৩২), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) কর্মরত কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫), প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩), এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০) এবং এনবিআরে কর্মরত কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর (৩৮)।
শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।
তিনি বলেন, চক্রটির সদস্যদের কাছ থেকে ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প, ৫০ টাকার চারটি স্ট্যাম্প, প্রশ্নপত্রের এক সেট, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ১৯ পাতা, ১০টি সনদপত্র, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা ও একটি ব্যাংক চেক, আটটি মোবাইল ফোন, বিভিন্ন ক্যাটাগরির ১৫টি সনদপত্র, ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং নগদ চার হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে।
তবে প্রশ্নপত্রের মূল উৎস এখনও শনাক্ত করা যায়নি। গ্রেফতার ব্যক্তিরা ফেসবুকের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র পাওয়ার দাবি করলেও এ বিষয়ে সন্তোষজনক তথ্য দিতে পারেননি। প্রশ্ন ফাঁসের মূল উৎস খুঁজে বের করতে তদন্ত চলছে।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদফতরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের ২৪২টি শূন্যপদে নিয়োগের বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এই পরীক্ষায় মোট ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী আবেদন করেন। বেলা ১১টায় পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও ওই দিন সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এসআরবি ছায়া তদন্ত শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনায় গত ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদফতরের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, গত ১৪ অক্টোবর মতিঝিল এলাকা থেকে রুবেল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান সুজনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরখান এলাকা থেকে ইমদাদুল ইসলাম এবং এসআরবি-৪-এর সহায়তায় মিরপুর-১০ এলাকা থেকে আসাদুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের কথোপকথন ও চ্যাট পর্যালোচনা করে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৫ অক্টোবর সাভার এলাকা থেকে নূর মোহাম্মদকে গ্রেফতার করে এসআরবি-৪। পরে তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে ১৬ অক্টোবর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে জাহাঙ্গীরকে গ্রেফতার করা হয়।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন বলেন, গ্রেফতার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের চ্যাট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নূর মোহাম্মদ ১০ অক্টোবর প্রথমে ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে একটি সূত্রের মাধ্যমে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে জাহাঙ্গীর তাকে প্রশ্নপত্রের একটি স্পষ্ট ছবি পাঠান। এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নের উত্তর প্রস্তুত করে জাহাঙ্গীর ও ইমদাদুলকে পাঠান। পরে চক্রের সদস্য ও তাদের সঙ্গে যুক্ত পরীক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নপত্র ও উত্তর পৌঁছে দেওয়া হয়। এ কাজে আসাদুল, রুবেল, মফিজুল ও সুজন যুক্ত ছিলেন।
চক্রটি হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতো বলে জানিয়েছে এসআরবি।
সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নপত্রের মূল উৎস সম্পর্কে লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন বলেন, নূর মোহাম্মদকে সকালে যে প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়েছিল, সেটি কে দিয়েছিল, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি।
তিনি বলেন, নূর মোহাম্মদ ও জাহাঙ্গীর দাবি করছেন, তারা ফেসবুকের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র পেয়েছেন। তবে তাদের দেওয়া তথ্যকে এখনো নির্ভরযোগ্য বলে মনে করছে না তদন্ত দল। ফেসবুকের যেসব গ্রুপ ও আইডির কথা তারা বলেছেন, সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করব, মূল যে জায়গা থেকে এই প্রশ্নটা ফাঁস হয়েছে, সেই তথ্যটা বের করে নিয়ে আসার জন্য।’
তিনি আরও বলেন, তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। প্রশ্নপত্রের মূল উৎস এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে অনুসন্ধান চলছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কোনও কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক বলেন, এখন পর্যন্ত যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কারও সম্পৃক্ততা সরাসরি পাওয়া যায়নি। তবে অন্যান্য সরকারি অধিদফতরের কর্মচারীদের এ ঘটনায় জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তে আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক বলেন, চক্রের একজন সদস্যের কাছ থেকে প্রতারিত হওয়ার পর মফিজুল ইসলাম আরও বেশি অর্থ উপার্জনের আশায় চক্রটির সঙ্গে যুক্ত হন। এ ছাড়া ভর্তি-বাণিজ্যসংক্রান্ত অর্থ লেনদেনের তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।
ফল প্রকাশ পর্যন্ত তদারকির ঘোষণা প্রতিমন্ত্রীর
এদিকে শুক্রবার বিকালে মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। এ সময় এ দফায় নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ফল প্রকাশ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া তদারকির ঘোষণা দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি আরও জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের ছয় সদস্যকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনায় জড়িত অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সবাইকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে আগের পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার পর এবার এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। প্রশ্নপত্র তৈরি থেকে শুরু করে প্রতিটি কেন্দ্রে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সচিবালয়ে রাত জেগে নিজে উপস্থিত থেকে তদারকি করেছেন তিনি।
আমিনুল হক জানান, কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা শুরু হয়েছে এবং তা সুন্দরভাবে সম্পন্ন হওয়ার পথে রয়েছে। শুক্রবারের প্রাথমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর শনিবারের মধ্যে ফল প্রকাশের চেষ্টা চলছে।
পরবর্তী সময়ে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার ২৪২টি পদসহ অন্যান্য শূন্যপদে নিয়োগ প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।