‘সেহেরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম সবাই। ফ্রিজ খুলতেই ধোঁয়া। ভেবেছিলাম ফ্রিজে কোনও সমস্যা হলো কিনা। পরে দেখি আগুনের কুণ্ডুলী। যত সময় যাচ্ছিল, ধোঁয়াও বাড়ছিল।’ শুক্রবার ভোররাতে রাজধানীর আরমানিটোলায় মুসা মেনশনে আগুন লাগার সময় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ছয়তলায় ছিলেন মোহাম্মদ ইউসুফ হোসেন।
ধৈর্য ধরা ও আতঙ্কে দিশেহারা হননি তিনি ও তার পরিবার। আর এ কারণেই নিজেদের বাঁচাতে পেরেছেন বলে বিশ্বাস তার। কিন্তু যে ট্রমার ভেতর দিয়ে তার বাবা-মা পার হয়েছেন তা কিভাবে কাটাবেন তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন ইউসুফ। কারণ বৃদ্ধ বাবা-মা এখনও মানসিকভাবে ঠিক হতে পারেনি।
শনিবার ভবনটির সামনে দাঁড়িয়ে আগের দিন রাতের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে ইউসুফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অবস্থা এমন হয়েছিল যে দম বন্ধ করে রাখা যাচ্ছিল না, নেওয়াও যাচ্ছিল না। দরজাও খুলতে পারছিলাম না। রুমগুলো কালো ধোঁয়ায় ভরে গিয়েছিল। শ্বাস নিতে পারছিলাম না। রুমের এক কোনায় এসে জানালার গ্লাস ভেঙে কিছুটা শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করি। সেখানেও প্রচুর ধোঁয়া ছিল।’
‘বাবা-মা বয়স্ক। তাদের নিয়ে শঙ্কায় ছিলাম। ফায়ার সার্ভিসকে ফোন দিলাম ট্রিপল নাইন থেকে। তাদের আসা পর্যন্ত আমাদের শান্ত থাকতে হবে এমনটাই ভাবছিলাম আমরা। এ সময় কাঁথা ভিজিয়ে দরজা-জানালা বন্ধ করে দেই। মেঝেতে ভেজা কাঁথা বিছিয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। যতোটা সম্ভব কম অক্সিজেন নিয়ে থাকা যায় সেই চেষ্টা করেছি। তিনটা থেকে ফজরের আজান পর্যন্ত এভাবে কেটেছে। এক দুঃসহ যন্ত্রণায় কেটেছে প্রতিটি মিনিট। এমন অস্থিরতা আর আতঙ্কের কথা জীবনেও ভুলবো না। বাইরে থেকে আমার এক ভাই টর্চ জ্বালিয়ে ধরে রেখেছিল। আমাদের বাঁচানোর পথ খুঁজছিলেন তিনি। সাহস যোগাচ্ছিলেন একটু পর পর। একপর্যায়ে রুম থেকে সবাই বারান্দায় চলে আসি। সেখানেও শ্বাস নেওয়া দায়।’
সদ্য এলজিইডিতে চাকরি পাওয়া মো. ইউসুফ হোসেন ছয়তলার ২০১৪ সাল থেকেই পরিবারের সঙ্গে ছিলেন এই ভবনে। বাবা-মা, তিন ভাই ও ভাবীসহ বাসাটিতে থাকতেন তারা। বাবা-মা এখন সুস্থ। কিন্তু মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।
‘যখন আমাদের ক্রেন দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নামান, তখন মা জ্ঞান হারান। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তারপর পাশের এক আন্টির বাসায় বাবা-মাকে রেখে আসি।’
‘এর মাঝেও যে কিভাবে সবাই রক্ষা পেয়েছি সেটা আল্লাহই ভালো জানেন। একেবারে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলাম বলা যায়। এসব অবস্থায় আগুনের চেয়ে আগুনের বিষাক্ত ধোঁয়াই বেশি সমস্যা তৈরি করে। এটাও বুঝতে পেরেছি।’
ইউসুফ জানালেন, ‘তবে আমরা যদি আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে যেতাম, তবে হয়তো এ যাত্রা রক্ষা পেতাম না । এখন অন্য কোথাও বাসা খুঁজছি। এই বিপদ মাথায় নিয়ে এখানে আর থাকা সম্ভব নয়।’








