বঙ্গবাজারের মতো নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ীরাও সরকারের সহায়তা চান

কবির হোসেন
১৭ এপ্রিল ২০২৩, ০৩:০০ আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৩, ১০:৪৩

মধ্যবিত্ত থেকে নিন্মবিত্ত সবারই পছন্দ রাজধানীর নিউ মার্কেট। স্বল্প দামে চাহিদার পণ্যটি ক্রয় করতে নগরবাসী ভিড় জমায় ওই মার্কেটে। আর সেখানকার অন্যতম একটি মার্কেট নিউ সুপার মার্কেট। যেখানে রমরমা ব্যবসা ছিল। ব্যবসায়ী আর ক্রেতার আনাগোনায় মুখর ছিল। একদিনের ব্যবধানে সেখানে আজ অন্ধকার। চারদিকে পোড়া গন্ধ, কান্নার শব্দ। যেন ভূতের ঘরে পরিণত হয়েছে।

শনিবার (১৫ এপ্রিল) ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মার্কেটটির তৃতীয় তলার প্রতিটি দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এছাড়া ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে দ্বিতীয় ও নিচ তলার দোকানগুলোর।

রবিবার (১৬ এপ্রিল) পোড়া ওই ভবনের সামনে গেলে দেখা যায় অগ্নিকাণ্ডে নিঃস্ব হওয়া ব্যবসায়ীদের অনেকে আহাজারি করছেন। কেউ কেউ ছাই থেকে অবশিষ্ট কিছু আছে কি না খুঁজছেন। কয়েকজন পোড়া জিনিসপত্রের পাশেই অপলক চেয়ে বসে আছেন। কাউকে দেখা গেছে পুড়ে যাওয়া টাকা, কয়লা হওয়া ব্যাগ নিয়ে ঘুরতে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দাবি বঙ্গবাজারের মতো সরকারের পক্ষ থেকে তাদেরকেও যেন সহায়তা করা হয়।

মো. হামিদ  (৪৫)। পাকিস্তান আমলে নিউ মার্কেটে যখন টিন শেড ছিল তখন ফুটপাতে হার্ডওয়্যার ব্যবসা করতেন তার বাবা আব্দুল মালেক ব্যাপারী। বাবার ব্যবসার ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে নিজেও বিদেশ থেকে ফিরে এক সময় সেখানে ব্যবসার চিন্তা করেন। ২৫ বছর আগে কোরিয়া থেকে ফিরে স্ত্রীর ২০ ভরি স্বর্ণ বিক্রি করে নিউ সুপার মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় ‘মেঘ বৃষ্টি গার্মেন্টস’ নামে একটি দোকান ভাড়া নেন। তারপর থেকে পাইকারি-খুচরা গেঞ্জি, টি শার্ট বিক্রি করে আসছিলেন। একই তলায় তার দোকানের পাশে তার আরও দুই ভাই আমিনুল ও মমিনুল আক্কাস ফ্যাশন নামে আরেকটি দোকান করতো। অগ্নিকাণ্ডে তাদের তিন ভাইয়ের ৫০ লাখ টাকার মালামালের ক্ষতি হয়েছে।

মো. হামিদ বলেন, ‘আমার দোকানের ৩০ লাখ টাকার মাল, সবি নষ্ট হয়ে গেছে। এখন কীভাবে চলবো জানি না! আমার কিডনি রোগ আছে, রোজ ডাক্তার দেখাতে হয়। আমার একটি মেয়ে আর একটি ছেলে, তারা স্কুলে, কলেজে যায়। তাদেরকে কোনও কিছু দেওয়ার আর সামর্থ রইলো না। দোকানকে ঘিরেই আমার সব কিছু ছিল। আগুন আজ সব কেড়ে নিলো। এখন আমাদের দাবি একটাই। সরকার আমাদেরকে সহায়তা করুক। আমরা আবার যেন ঘুরে দাঁড়াতে পারি।'

নিউ সুপার মার্কেটে আগুন

দীর্ঘদিন ধরে নিউ সুপার মার্কেটের বিভিন্ন দোকানে চাকরি করেছেন নাফিজ উদ্দিন। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কেটের তিন তলায় একটি দোকান ভাড়া নিয়ে নিজেই ব্যবসা শুরু করেন। ‘লেবাস পয়েন্ট’-২ নামে ওই দোকানটিতে তিনি বিক্রি করতেন নানারকম শার্ট ও প্যান্ট। অন্যদের মতো আগুনে তিনিও সব হারিয়েছেন।

নাফিজ বলেন, ‘আট বছর অন্যের দোকানে চাকরি করেছি। বাড়ি থেকে স্বজনরা বলতো নিজে কিছু করার চেষ্টা করো। সবার উৎসাহ নিয়ে ব্যবসায় নামছিলাম। আমার ভাগ্যটা কত খারাপ। চার-পাঁচ মাস আগে ব্যবসা শুরু করি। এই ঈদটাই ছিল প্রথম মৌসুম। আর ঠিক এ সময়ে দোকানটা আগুনে পুড়ছে। স্বজনদের কাছে থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করি। এখন তাদেরকে কী জবাব দেবো। ঈদটা পার করতে পারলে কিছু টাকা ক্যাশ হতো। সরকার যদি দিকে ফিরে থাকায়। আমরা আবার ব্যবসা শুরু কর‍তে চাই।’

তিন তলার ‘টপ ম্যান’, ‘টপ পয়েন্ট’ ও ‘রিফাত পয়েন্ট’-এ তিনটি দোকানের মালিক মো. হোসেন। তিনটি দোকানেই টি শার্ট বিক্রি করতেন। প্রায় ৬০ লাখ টাকার মালামাল ছিল তার দোকানগুলোতে। সবই পুড়ে ছারখার। পুড়েছে দোকানে থাকা নগদ ৫ লাখ টাকাও। পুড়ে কয়লা হওয়া টাকা ব্যাগে করে ঘুরছেন আর মানুজনকে দেখাচ্ছেন হোসেন। সব হারিয়ে তিনি পাগলপ্রায়। এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘ঈদের বাজার, দোকান বন্ধ করে গভীর রাতে বাসায় গিয়েছিলাম। সকাল হতে না হতে আমার সব পুড়ে গেল। পাঁচ লাখ টাকা নগদ ছিল। টাকাগুলো পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। তিন দোকানে আমার ৬০ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হয়েছে। কারা এখন সাহায্য করবে, সরকার কি আমাদেরকে দেখবে। আমি কীভাবে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করবো।’ এসব বলে মাথায় হাত দিচ্ছিলেন হোসেন।

মার্কেটের আরেক ব্যবসায়ী মো. জসিম। দ্বিতীয় তলায় ২৫২ এবং ২৪৯ নং ‘আই মিস ইউ’ ও ‘মা ফ্যাশন’ নামে দুইটি দোকান ছিল তার। ছেলেদের বিভিন্ন পোশাক বিক্রি করতেন। দুইটি দোকানে প্রায় ২০ লাখ টাকার মালামাল ছিল। পানিতে ভিজে তার চার ভাগের তিন ভাগই নষ্ট হয়েছে। জসিমের মতে, ‘যা হারিয়েছি তা আল্লাহ না চাইলে আর কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না। একদিনের মধ্যে ফকির হয়ে গেলাম। আমাদের মাল প্রচুর লুটপাট হয়েছে। বের করার সময় যে যেভাবে পেরেছে সরিয়ে নিয়ে গেছে।’

নিউ সুপার মার্কেটের সাবেক সভাপতি সিরাজ উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মার্কেটটির তিন তলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু আর অবশিষ্ট নেই। দ্বিতীয় ও নিচ তলায় পানির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কেটের সকল ব্যবসায়ী আজ পথে বসেছে। ১২৪৮টি দোকান মার্কেটে। কোটি কোটি টাকার মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, 'সিটি করপোরেশনের ওভারব্রিজ ভাঙতে আসছে ভালো কথা। সেটা ঈদের আগে কেন? পরেও তো করতে পারতো। তারা কাজটা পর্যাপ্ত সিকিউরিটি নিয়ে করেনি। অনেকগুলো বিদ্যুতের তার এ ব্রিজ দিয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা এ অগ্নিকাণ্ডের পেছনে তাদেরকে দুষছে। এখন সরকার যদি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দিকে নজর দেয়। আমি তাদের পক্ষ থেকে শেষ কথা এইটাই বলবো, সরকার যেন ব্যবসায়ীদের পাশে দাড়াঁয়।’

/আরআইজে/
সম্পর্কিত
‘পূজার ছুটিতে সৈকতে ভিড়, ফাঁকা রিসোর্ট’ আগুনের ঘটনায় কতটা প্রভাব পড়েছে কক্সবাজারের পর্যটনে?
অগ্নিদুর্ঘটনা ঠেকাতে ফায়ার সার্ভিসের ১৩ নির্দেশনা
শজিমেক হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে আগুন
সর্বশেষ খবর
কেয়া গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানে এক নোটিশে ছাঁটাই ৭৩৯ শ্রমিক-কর্মচারী
কেয়া গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানে এক নোটিশে ছাঁটাই ৭৩৯ শ্রমিক-কর্মচারী
‘দোকানদাররা বলে দাম কমেছে, কিন্তু কীভাবে বা কতটুকু কমে আমরা বুঝতে পারি না’
‘দোকানদাররা বলে দাম কমেছে, কিন্তু কীভাবে বা কতটুকু কমে আমরা বুঝতে পারি না’
‘ঘুম ভাঙলো বিকট শব্দে, চোখ খুলেই দেখি পাশে চার লাশ’
‘ঘুম ভাঙলো বিকট শব্দে, চোখ খুলেই দেখি পাশে চার লাশ’
কারফিউয়ে শান্ত ফরাসি শহর, পুলিশের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কথা স্বীকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
কারফিউয়ে শান্ত ফরাসি শহর, পুলিশের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কথা স্বীকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির