X
রবিবার, ২৬ মে ২০২৪
১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
আলাপচারিতায় ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম ও মানস ঘোষ

মুজিবনগরে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও সংবাদ সংগ্রহ

মোস্তফা হোসেইন
১৭ এপ্রিল ২০২৪, ১৯:৪৯আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ২১:৩৬

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার ২১ দিন পর শপথগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। যদিও ১০ এপ্রিল মুজিবনগরে গঠিত হয়েছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার। নবনির্বাচিত সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ১৭ এপ্রিল ’৭১, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠের কারণেও ইতিহাসখ্যাত হয়ে আছে। এই ইতিহাসের কুশীলবদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম সংসদের হুইপ ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম। যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেরও লেখক। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের সংবাদ সংগ্রহের জন্য দেশি-বিদেশি বহু সাংবাদিক এসেছিলেন মুজিবনগরে। তাদের কলকাতা থেকে মুজিবনগরে নিয়ে আসাসহ এতদ্বসংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালন করেছিলেন ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম। সংবাদ সংগ্রহকারীদের একজন ছিলেন ভারতীয় পত্রিকা স্টেটসমেন-এর প্রতিবেদক ও পরবর্তীকালে সম্পাদক মানস ঘোষ।

মানস ঘোষ ২০২২ সালে ঢাকা সফরে এলে ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম ও শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনকারী তৎকালীন পাবনার ডিসি মোহাম্মদ নুরুল কাদেরের সহধর্মিণী এবং শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের প্রত্যক্ষদর্শী রোকেয়া কাদের ও ব্যারিস্টার তানিয়া আমীরকে নিয়ে আলাপচারিতার সুযোগ হয়েছিল আমার। ভিডিওতে ধারণকৃত আলাপচারিতার মুজিবনগর প্রসঙ্গটুকু গ্রন্থিত হলো।

মোস্তফা হোসেইন: মুজিবনগরে প্রথম বাংলাদেশ সরকার শপথগ্রহণ করবে, বিষয়টি সাংবাদিকদের কীভাবে অবহিত করা হয়?

ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম: বিষয়টি গোপন রাখা হয়। প্রেস ক্লাবে (কলকাতা) বলেছি, আমাদের একটা মেসেজ আছে কালকে। আপনারা কালকে সকালবেলা থাকবেন। ফিরে এসে নীহাররঞ্জন বাবুকে বললাম গাড়ির ব্যবস্থা করতে। উনি এখনও আমার দাদা, কলকাতা গেলে তার বাড়িতে খেতেই হবে।

মানস ঘোষ: হি ইজ অ্যাবাউট নাইনটি সিক্স।

ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম: বিএসএফকে বললাম, ওসমানী সাহেবের জন্য মিলিটারি ইউনিফর্মের ব্যবস্থা করা যায় কিনা। তারা ব্যবস্থা করলো। কিন্তু একটাও (কাজে) লাগাতে পারলাম না। বললাম, বড়বাজারে যাও টেইলরকে দিয়ে বানাও। দর্জিকে দিয়ে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে ওসমানী সাহেবের ইউনিফরম বানানো হলো। আপনারা টেলিভিশনে দেখে থাকতে পারেন, ওসমানী সাহেবের ইউনিফরম কিন্তু তার শরীরের সঙ্গে ম্যাচ করে না।

মোস্তফা হোসেইন: মন্ত্রীরাও কি জানতেন না কোথায় শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানটি হবে?

ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম: ইট ওয়াজ ওথ। ইন্টারন্যাশনাল প্রেসকে জানানোর জন্য এই ড্রামাটা করা হলো। মন্ত্রিপরিষদের অধিকাংশই জানতেন না কোথায় হতে যাচ্ছে (ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম অন্যত্র বলেছিলেন—তাজউদ্দীন আহমদ, গোলক মজুমদার এবং তিনিই শুধু জানতেন কোথায় শপথ অনুষ্ঠানটি হবে। অত্যন্ত গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়েছিল চুয়াডাঙ্গার অভিজ্ঞতার কারণে)।

মোস্তফা হোসেইন: চুয়াডাঙ্গায় তো হওয়ার কথা ছিল।

ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম: ওই যে চুয়াডাঙ্গার হেবা ডাক্তার কিন্তু চুয়াডাঙ্গায় শপথ অনুষ্ঠানের কথাটি প্রকাশ করে দেন। বিএসএফ-এর গোলক মজুমদার বললেন, সেখানে অনুষ্ঠান করা যাবে না। নিরাপদ হবে না।

মানস ঘোষ: চুয়াডাঙ্গা ফার্স্ট ক্যাপিটাল অব বাংলাদেশ।

ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম: আমি কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলাম। আর হেবা ডাক্তার ছিলেন চুয়াডাঙ্গা মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি। আমি দিল্লি থেকে ফেরার পর হেবা ডাক্তারকে বলেছিলাম, ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার শপথ নেবে। তিনি সেটা বলে দিয়েছিলেন। ফল হলো খারাপ। চুয়াডাঙ্গায় পাকিস্তানি বাহিনী ইপিআর দফতরে ব্যাপক বোমা হামলা করে। সুতরাং, ওখানে আর শপথ অনুষ্ঠানের চিন্তা করা গেলো না।

মোস্তফা হোসেইন: শপথ নেওয়ার সংবাদ সংগ্রহ করা হলো কীভাবে?

মানস ঘোষ: সেখানে আমরা পৌঁছালাম অ্যারাউন্ড সাড়ে ১০টা বা ১১টায়। গাড়িতে যেতে যেতে কল্যাণীতে একটা ব্রেক হয়েছিল। এটা মনে আছে। দেখি, গাড়িতে তিনি বসে আছেন। খুব মনোযোগ দিয়ে তিনি একটা কিছু পড়ছিলেন।

মোস্তফা হোসেইন: কে? ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম?

মানস ঘোষ: গোলক বাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি (ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম) কী পড়ছেন? তিনি বললেন, এটাই পড়া হবে সেখানে। ওখানে গেলে দেখবেন। পৌঁছানোর পর বিদেশি সাংবাদিকরা তো ক্ষিপ্ত। তখন আম ধরেছে মাত্র। তাদের বলা হলো ওয়েট ওয়েট। যারা গার্ড অব অনার দেবে তাদের ইউনিফরমগুলো ছিল বেমানান। গ্রাম্য চৌকিদার টাইপের কিছু লোককে ধরে আনা হলো।

ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম: এসপি মাহবুব ছিলেন।

রোকেয়া কাদের: তৌফিক ই ইলাহী চৌধুরীও।

মানস ঘোষ: বড় বড় দুটো চৌকির ব্যবস্থা করা হলো। গোলক মজুমদার এবং রোস্তমজি কিন্তু বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকলেন না। বোথ অব দেম ওয়ার দেয়ার। এই বর্ডার এই তো অনুষ্ঠানের জায়গা। বিএসএফ কমান্ডোরা রেডি হয়েই ছিল। অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গান নিয়ে তারা সতর্ক অবস্থায়।

বিরাট বিরাট গাছ, লোকেরা জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দিচ্ছে। ওপারে গেলাম, সেখানে আমার সোনার বাংলা গানের রিহার্সাল হচ্ছে। গোলক মজুমদার বললেন, এই রে হারমোনিয়াম নেই? তিনি গ্রামের লোকজনকে জিজ্ঞেস করলেন—এই গ্রামে গানবাজনা করে কেউ আছে কি? একজন বললো, হ্যাঁ আছে। গোলক বাবু সেই হারমোনিয়ামের ব্যবস্থা করলেন। ভাঙা মতো হারমোনিয়াম। তবলচিও পাওয়া গেলো। ইউসুফ আলী সাহেব ডিক্লারেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্স অব বাংলাদেশ পড়লেন।

বাঁ থেকে মোস্তফা হোসেইন, ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম, মানস ঘোষ, ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর ও রোকেয়া কাদের মোস্তফা হোসেইন: কে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র লিখেছেন সেটা কি জানতে পেরেছেন তখনও?

মানস ঘোষ: না, তখনও জানিনি। পরে জেনেছি অবশ্য।

ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম: ইউসুফ আলী সাহেব ছিলেন চিফ হুইপ। আমি দেখলাম যে প্রটোকল অনুযায়ী সেটা ইউসুফ আলী সাহেবেরই পড়ার কথা।

মোস্তফা হোসেইন: ঘোষণাপত্রটা আগেই লিখে রেখেছিলেন, মানে ১৭ তারিখের আগে?

ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম: এটা ১০ এপ্রিলের আগে লেখা ছিল।

ব্যারিস্টার তানিয়া আমির: ওটা কি বাংলায় ট্রান্সলেশন করা লেখা হয়েছিল না?

ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম: ওখানে বসে বসে বাংলায় ট্রান্সলেট করে দিলাম। সেই স্ক্রিপ্টই পড়া হলো। গোপনীয়তার প্রসঙ্গে বলি—তাজউদ্দীন আহমদ আমাকে প্রথম দিকে বলেছিলেন, আমরা এমনভাবে কাজ করবো—যাতে ইতিহাস আমাদের খুঁজে বের করে। আমরা ইতিহাসের পেছনে দৌড়াবো না।

মোস্তফা হোসেইন: দাদা আপনার কাছে আসি। নিউজটা কীভাবে করলেন?

মানস ঘোষ: পরের দিন তো সাড়া পড়ে গেলো। দ্যাট ওয়াজ দ্য টার্নিং পয়েন্ট। ব্যাসিক্যালি দ্যাট ওয়াজ দ্য টার্নিং পয়েন্ট। বাংলাদেশ যে লিবারেটেড হবে সেদিনেই প্রমাণ হয়ে গেলো।

ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। ১০ এপ্রিল সরকার গঠন হলো।১৭ এপ্রিল সরকার শপথগ্রহণ করে।

রোকেয়া কাদের: ১৭ এপ্রিল আমাদের রিপাবলিক ডে হওয়া উচিত।

ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর: এটা ১০ এপ্রিল হওয়া উচিত। কারণ, সেদিন সরকার গঠন হয়েছিল।

রোকেয়া কাদের: ভারতের রিপাবলিক ডে আছে। পাকিস্তানের আছে, আমাদের হওয়া দরকার।

ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম: ১০ এপ্রিল হওয়া উচিত।

মোস্তফা হোসেইন: আপনার কি মনে আছে, আপনার পত্রিকাসহ অন্যরা সংবাদটি কীভাবে কভার করেছিল?

মানস ঘোষ: ডিটেইলে ডিটেইলে। পেইজ ওয়ান ভেতরে প্রকাশ হলো। তখন বাংলাদেশ বিকেম অল ইন্ডিয়ান ইস্যু। শুধু বাংলা পত্রিকা নয়, হিন্দি, ইংরেজি আঞ্চলিক পত্রিকাগুলো প্রথম পৃষ্ঠাতেই শুধু নয়, ভেতরেও বিস্তারিত সংবাদ প্রচার করে।

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
বাংলা ট্রিবিউনকে সাক্ষাৎকারনিষেধাজ্ঞায় ‘বিস্মিত’ জেনারেল আজিজ, বললেন ‘এতে লাভ নেই’
মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনে লিফট স্থাপনের সুপারিশ
বাংলা ট্রিবিউনকে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনপ্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ছে, পিছিয়ে থাকতে চায় না বাংলাদেশ
সর্বশেষ খবর
ভারতের রাজকোটে খেলার স্থানে আগুন, নিহত ২৭
ভারতের রাজকোটে খেলার স্থানে আগুন, নিহত ২৭
ঘূর্ণিঝড় রিমাল: চট্টগ্রামে যত প্রস্তুতি
ঘূর্ণিঝড় রিমাল: চট্টগ্রামে যত প্রস্তুতি
উপকূলে ‘মে আতঙ্ক’
উপকূলে ‘মে আতঙ্ক’
টিভিতে আজকের খেলা (২৬ মে, ২০২৪)
টিভিতে আজকের খেলা (২৬ মে, ২০২৪)
সর্বাধিক পঠিত
ব্যক্তি পর্যায়ের কর হার বাড়বে
ব্যক্তি পর্যায়ের কর হার বাড়বে
‘তুফান’র গানে প্রীতম, আছেন পর্দায়ও!
‘তুফান’র গানে প্রীতম, আছেন পর্দায়ও!
এমপি আনার হত্যা: কে এই সিলিস্তা রহমান?
এমপি আনার হত্যা: কে এই সিলিস্তা রহমান?
রঙমিস্ত্রি থেকে যেভাবে এমপি আনার হত্যায় জড়ায় জিহাদ
রঙমিস্ত্রি থেকে যেভাবে এমপি আনার হত্যায় জড়ায় জিহাদ
সর্বজনীন পেনশন স্কিমে যুক্ত হলেন কেএসআরএমের ১ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী
সর্বজনীন পেনশন স্কিমে যুক্ত হলেন কেএসআরএমের ১ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী