এমপি লিটন হত্যা নিয়ে অনেক কথা, অনেক গল্প

Send
জামাল উদ্দিন ও জিল্লুর রহমান পলাশ, গাইবান্ধা থেকে
প্রকাশিত : ২০:৩৫, জানুয়ারি ০৫, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৫২, জানুয়ারি ০৫, ২০১৭

গাইবান্ধার এমপি মনজুরুল ইসলাম লিটনগাইবান্ধার-১ আসনের এমপি মনজুরুল ইসলাম লিটন হত্যাকাণ্ড নিয়ে যেমন চলছে তদন্ত, তেমনি বের হচ্ছে একের পর নতুন গল্প। স্থানীয়রা বলছেন নানা কথা। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা সংগ্রহ করছেন হত্যাকাণ্ডের আলামত, তথ্য-উপাত্ত ও উপাদান। বিভিন্ন সূত্র ও মাধ্যম থেকে পাওয়া সেসব তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। হত্যাকাণ্ড নিয়ে স্থানীয়রা নানামুখী কথা বললেও এ মুহূর্তে স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা ও তদন্ত সংশ্লিষ্টরা কিছুই বলতে রাজি হচ্ছেন না। এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি আতিয়ার রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শিগগিরই পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আসবেন। তারাই তদন্তের বিভিন্ন দিক গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরবেন।’

স্থানীয়রা জানান, স্বাধীনতার আগে থেকেই রাজনৈতিকভাবে সুন্দরগঞ্জ এলাকা জামায়াত অধ্যুষিত ছিল। এ এলাকায় আওয়ামী লীগ ছিল খুবই দুর্বল। বছরের পর আধিপত্য বিস্তার করে থাকলেও জামায়াতের সে দুর্গে ফাটল ধরিয়েছিলেন এমপি লিটন। ১৯৯৮ সালে বামনডাঙ্গা কলেজ মাঠে গোলাম আযমের জনসমাবেশ ঠেকানোর মাধ্যমে জামায়াতের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে লড়াই শুরু করেছিলেন তিনি। তখন থেকেই জামায়াত-শিবিরের প্রধান শত্রুতে পরিণত হন। ২০১৩ সালে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর জামায়াতকে পুরোপুরি কোণঠাসা করে ফেলেন। জামায়াত-শিবিরও তাকে একমাত্র পথের কাঁটা মনে করতো। যে কারণে বিভিন্ন সময় নানা ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি তাকে দেখে নেওয়ারও হুমকি দিয়েছিল তারা।

লিটনের মৃত্যুতে সেই জামায়াত-শিবিরই সবচেয়ে বেশি বেনিফিসিয়ারি হলো বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। এ প্রসঙ্গে সুন্দরগঞ্জের বাসিন্দা সাহিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের দিন দুপুরে স্থানীয় জামায়াত নেতা কাজী মাওলানা সাখাওয়াতের কাছে ছকিয়াল নামের এক পাওনাদার যান। পাওনার পুরো টাকা চাইলে মাওলানা সাখাওয়াত তাকে বলেন, যা দিচ্ছি নাও। পরে আর বাড়িতে আমাকে নাও পেতে পারো। যেকোনও সময় আমাকে বাড়ি ছাড়তে হবে। কয়েক ঘণ্টা পরই এমপি লিটন খুন হন। এরপরই ওই জামায়াত নেতা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান।’ 

পুরো এলাকায় জামায়াত-শিবিরের একমাত্র পথের কাঁটা এমপি লিটন বলে জানালেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বঙ্গবন্ধু প্রজন্ম লীগের সাধারণ সম্পাদক নূর আলম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,  ‘এমপি লিটন খুন হওয়ায় জামায়াত-শিবিরের সেই পথের কাঁটা সরে গেলো।’

বামনডাঙ্গা কলেজ মাঠে ১৯৯৮ সালে গোলাম আযমের জনসমাবেশ ঠেকানোর সময় লিটনের সঙ্গে ছিলেন সাহাবাজ গ্রামের বাসিন্দা শাহ আলম। ওই সময় জামায়াত-শিবিরের হামলায় তার ভেঙে যাওয়া হাত দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘যারাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটাক, তার পেছনে জামায়াত-শিবিরের হাত রয়েছে।’

একই গ্রামের বাসিন্দা সব্জি ব্যবসায়ী নান্টু মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে এমপি লিটন ছিলেন ভালো মনের মানুষ। তিনি কখনও কারও সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন না। রাত-বিরাতেও গ্রামের রাস্তায় একা চলাফেরা করতেন। খারাপ হলে তো সেটা সম্ভব হতো না। তবে তার লাইসেন্স করা অস্ত্র সঙ্গে থাকলে কেউ এমন সাহস করতো না।’ তিনিও মনে করেন, ‘জামায়াত-শিবির ছাড়া এ হত্যাকাণ্ড আর কেউ ঘটাবে না।’ পারিবারিক লোকজন জড়িত কিনা—জানতে চাইলে শাহ আলম বলেন, ‘সেটা তো জানি না। এমন কিছু হলে সেটা পুলিশ তদন্ত করে বের করবে।’

এদিকে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, জামায়াত-শিবির ও জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা এমনকি পারিবারিক ও দলীয় দিকগুলোও তদন্তের বিষয়বস্তু হিসেবে রাখা হয়েছে। সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত কাজও অনেকদূর এগিয়েছে। এখন সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। এখন আপনারা আসছেন, তদন্তের অগ্রগতি হয়েছে কিনা, তা জানতে। তদন্ত শেষ হলে আমরাই আপনাদের খুঁজে বের করে শিগগিরই ঘটনার রহস্য উন্মোচনের খবর জানাব।

দু’চার দিনের মধ্যেই পুলিশের আইজি এ কে এম শহীদুল হক ও র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা গাইবান্ধা সফর করবেন বলে জানা গেছে। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধি দলও গাইবান্ধা সফরের কথা রয়েছে বলেও তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান।

বৃহস্পতিবার দুপুরে সাহাবাজ গ্রামের বাড়িতে গেলে দেখা হয় তার ভাতিজা মনজুরুল মোর্শেদ বাপ্পির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘তদন্ত কর্মকর্তারা কেবল বলছেন, শিগগিরই এ বিষয়ে ভালো খবর দিতে পারবেন। এর বাইরে আর কিছু বলেননি।’ 

গাইবান্ধা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সার্কেল) রবিউল ইসলামের কাছে লিটন হত্যাকাণ্ডের তদন্তের ধরন ও অগ্রগতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক, পারিবারিক ও ব্যবসায়িকক দিকসহ সবদিক মাথায় রেখেই তদন্ত কাজ চলছে। সময় হলেই গণমাধ্যমকে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানানো হবে।’

আরও পড়ুন:  তদন্তের কেন্দ্রে এমপি লিটনের বাড়ি

/এমএনএইচ/

 

লাইভ

টপ