বনানীতে দুই তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত অন্যতম আসামি সাফাত আহমেদের বাবা আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ। তিনি এই ঘটনাকে ব্লাকমেইল হিসেবে অভিযোগ করে বলেন, ‘ঘটনার পেছনে তার ছেলের সাবেক স্ত্রীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। তার ষড়যন্ত্রেই সবকিছু হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে আমরা মানহানীর মামলা করবো।’ প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন , ‘ধর্ষণ মামলা কি একমাস পর হয়?’ কেউ পাপ করলে তার শাস্তি হওয়া দরকার বলেও মন্তব্য করেন দিলদার আহমেদ।
রবিবার সন্ধ্যায় দিলদার আহমেদের কাছে তার ছেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোবাইল ফোনে এসব কথা বলেন তিনি।
দিলদার আহমেদ বলেন, ‘দুই বছর আগে সাফাত প্রেম করে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সংবাদ উপস্থাপিকাকে বিয়ে করে। মেয়েটির চরিত্র ভালো ছিল না। আমি বিয়েটি মেনে নেইনি। দুমাস আগে ওই মেয়ের সঙ্গে সাফাতের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। সেই মেয়েটি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এই ষড়যন্ত্র করেছে। সে-ই দুটি মেয়েকে নিয়ে বনানী থানায় গেছে। নিজেকে ওই মেয়েদের খালাতো বোন বলে পরিচয় দিয়েছে।’
ঘটনার সময় সাফাতের সাবেক স্ত্রী হোটেলে ছিল কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ঘটনার সময় সে ছিল না। কিন্তু সে থানায় মেয়েদের নিয়ে মামলা করতে গেছে।’ তিনি উল্টো প্রশ্ন করেন, ‘ধর্ষণ মামলা হয় ২৪ ঘণ্টায়। ধর্ষণ মামলা কি একমাস পর হয়?’
তিনি আরও বলেন, ‘একজন লোক পাপ করলে তার শাস্তি হওয়া উচিৎ। কিন্তু পাপ না করলে শাস্তি হওয়া উচিৎ না। ঘটনাটি পুলিশ তদন্ত করছে, মেয়েদের ডাক্তারি পরীক্ষা হচ্ছে। সকল তদন্ত শেষ হলেই আসল জিনিস ভেসে ওঠবে। প্রমাণিত হলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ হবে। আর তা নাহলে আমরা মানহানির মামলা করবো। একটা মেয়েকে কি ধর্ষণ করা যায়? ধর্ষণ হলেও মামলা হবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে।’
ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে পুলিশকে টাকা দিয়েছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি কেন থানায় টাকা দেবো? গণমাধ্যমে বিষয়টি ভরে গেছে। পুলিশ টাকা খাবে নাকি? আমি কোনও টাকা দেইনি।’
দিলদার আহমেদ বলেন, ‘আমি একজন বাবা হিসেবে এটুকু বলতে পারি, যেহেতু আমার সন্তান, আমি ছেলের পক্ষেই বলবো। তবে তদন্তে যা হবে আমি তা মেনে নেবো। কিন্তু আমি জানি, আমার ছেলে এর সঙ্গে জড়িত না। সে ব্লাকমেইলের শিকার হয়েছে। আমার সম্পত্তি লুটপাট করার জন্য আমার ছেলের সাবেক স্ত্রী এই ষড়যন্ত্র করছে। তারা আমার পরিবারটিকে ধ্বংস করার জন্য এসব করেছে।’
ছেলের সাবেক স্ত্রীর সঙ্গে এই দুই তরুণীর কোনও আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে কিনা? এর জবাবে আপন জুয়েলার্সের মালিক বলেন, ‘তার সঙ্গে এই মেয়েদের কোনও আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। থানায় গিয়ে বলেছে সে ওই মেয়েদের খালাতো বোন।’
সাফাতের সাবেক স্ত্রী যে বনানী থানায় গিয়েছিল, তা আপনি কীভাবে নিশ্চিত হলেন? এর উত্তরে এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘আরে থানা থেকে। আমিতো ছেলের বাবা। আমার ছেলে কিছু করলে, সেটা আমার কানে আসবে। মানুষ আমাকে ফোন দেবে।এটাইতো স্বাভাবিক।’
গত ২৮ মার্চ বনানীর রেইনট্রি হোটেলে একটি পার্টিতে দুই তরুণী ধর্ষণের শিকার হন। এই ঘটনার একমাস পর বনানী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন এক তরুণী।
মামলার এজাহারে বলা হয়, সাদমান সফিক তাদের পূর্ব পরিচিত। প্রায় দুই বছর থেকে তার সঙ্গে পরিচয় রয়েছে। ঘটনার ১০-১৫ দিন আগে গুলশান-২ নম্বরের ৬২ নম্বর রোডের দুই নম্বর বাড়ির বাসিন্দা দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদের সঙ্গে পরিচয় হয় তাদের। এরপর জন্মদিনের দাওয়াত দিয়ে গত ২৮ মার্চ সাফাত আহমেদ তার গাড়ি পাঠিয়ে ড্রাইভার ও বডিগার্ডের মাধ্যমে তরুণীদের নিজ নিজ বাসা থেকে বনানীর রেইনট্রি হোটেলের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়।
এজাহারে আরও বলা হয়, সেখানে অনেক লোক থাকবে এবং অনুষ্ঠানটি হবে হোটেলের ছাদে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর কোনও ভদ্র লোককে আমরা দেখতে পাইনি। সাফাত, নাঈম ও সফিক ছাড়াও সেখানে আরও দু’জন মেয়ে ছিল। তাদের ওই হোটেলে নিয়ে যাওয়ার পর আগে থেকে সেখানে থাকা অন্য দু’টো মেয়েকে সাফাত ও নাঈম বার বার নিচে নিয়ে যাচ্ছিল। সেখানকার পরিবেশ ভালো না লাগায় আমরা চলে যেতে চাচ্ছিলাম। এক পর্যায়ে তাদের দু’জনকে একটি কক্ষে নিয়ে জোরপূর্বক মদ্যপান করিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়। এ সময় সাফাত তার ড্রাইভার বিল্লালকে ধর্ষণের ভিডিও করতে নির্দেশ দেয়। তখন ড্রাইভার বিল্লাল ধর্ষণের দৃশ্য ভিডিও করে। পরবর্তীতে সাফাত তার দেহরক্ষীকে তরুণীদের বাসায় পাঠিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে ও ভয়ভীতি দেখায়। তাদের হুমকি ও লোকলজ্জার ভয়ে এক পর্যায়ে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন তারা। যে কারণে মামলা করতে বিলম্ব হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
শনিবার বিকালে তরুণীরা বনানী থানায় হাজির হয়ে ধর্ষকদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার আসামিরা হচ্ছেন, সাফাত আহমেদ, নাঈম আশরাফ, সাদমান সফিক, ড্রাইভার বিল্লাল, সাফাত আহমেদের বডিগার্ড (অজ্ঞাত)।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান জোনের এডিসি আব্দুল আহাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ধর্ষণ ঘটনায় জড়িতদের ধরতে পুলিশের একাধিক টিম বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে। তবে এখনও কোনও আসামি ধরা পড়েনি।’ রেইনট্রি হোটেলের ওই দিনকার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হোটেল কর্তৃপক্ষ সর্বশেষ একমাসের ফুটেজ সংরক্ষণ করে থাকে। তাই ধর্ষণের ঘটনার কোনও ফুটেজ পাওয়া যায়নি।’
/এআরআর/ এপিএইচ/








