বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধি-সংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা সুপ্রিম কোর্ট নিয়ে নিতে চান বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেন, ‘তারা (সুপ্রিম কোর্ট) সংশোধন করে যেটা দিয়েছিলেন, সেখানে দেখা গেছে, ১১৬ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সেটা তারা নিয়ে নিতে চান। আমি কী করে সেটা দেই?’ সোমবার (৩১ জুলাই) সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ আয়োজিত সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির পরিচিতি সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
রবিবার নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণ বিধিমালা বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় যে খসড়া দেয়, সে প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, ‘তাহলে হাইকোর্ট কেন রাখবেন, হাইকোর্ট উঠিয়ে দিন।’
এই প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘ওনারা মাসদার হোসেন কেসে ডিসিপ্লিনারি রুলসের কথা বলেছেন। কেউ কিন্তু ডিসিপ্লিনারি রুলস করেনি। আমি আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পরে এ রুলসটা করেছি।’ তিনি বলেন, ‘যেহেতু সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদে বলা আছে (হাইকোর্ট বিভাগের অধঃস্তন সকল আদালত ও ট্রাইব্যুনালের ওপর উক্ত বিভাগের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা থাকিবে) যে হাইকোর্ট, নট দ্য অ্যাপিলেট ডিভিশন, বিষয়টি তাদের জানানোর জন্য এটা তাদের কাছে পাঠিয়ে ছিলাম?’
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘তারা সংশোধন করে যেটা দিয়েছিলেন, সেখানে দেখা গেছে, আমার কাছে ডকুমেন্ট আছে, ১১৬ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সেটা তারা নিয়ে নিতে চান? আমি কী করে সেটা দেই? আপনারা আমাকে রায় দিয়ে দিন, বলুন, আমি তো দিতে পারি না।’
আনিসুল হক বলেন, ‘‘আমি বললাম, আলোচনার মাধ্যমে আসুন, শেষ করে দেই। আমি একটা ড্রাফট পাঠিয়েছি। আপনারা কারেকশন করে দিয়েছেন। আমরা সেটার ওপরে সেটুকু হাত লাগিয়েছি, যেখানে রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। (সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ বলা হয়েছে, বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচারবিভাগীয় দায়িত্বপালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত থাকিবে এবং সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তাহা প্রযুক্ত হইবে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সেটা আমি শুধু বলেছি, ‘না’, এটা দেওয়া যাবে না। ওটা ফেরত পাঠিয়েছে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি তো এসে উনাকে দিয়েছি। আমিতো এমন নই, পিয়ন বা আমার সচিবকে দিয়ে উনার কাছে পাঠিয়ে দেব। আমি এসেই উনাকে দিয়েছি। বলেছি, আপনি পড়ুন আপনি দেখুন। তার পরে যদি কোনও বক্তব্য থাকে আমাকে জানান। তারপরও আলোচনা করবো। উনি এজলাসে উঠে বললেন, হাইকোর্টটা তাহলে উঠিয়ে দেন। হাইকোর্ট তো বঙ্গবন্ধু করে দিয়ে গেছেন। আমরা কী করে উঠিয়ে দেব? তাহলে এ কথা কি অপ্রাসঙ্গিক না? তিনি প্রধান বিচারপতি। তার প্রতি আমার যথেষ্ট সম্মান আছে। আমি সেই সম্মান ও অধিকার রেখে প্রধান বিচারপতিকে বলতে চাই, আমি তো হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট ওঠানোর কথা বলিনি। ডিসিপ্লিনারি রুলস দিয়ে হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্ট ওঠে না। আপনার এজলাসে বসে এগুলো বলার তো দরকার হয় না। আলাপ-আলোচনা তো আমি করবই। আমি কাল যশোরে ছিলাম। উনার কথা শুনে আমি ফোন করে বলেছি, আমি আসতেছি বৃহস্পতিবারে বসব। আমাদের সদিচ্ছা আছে।’
উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালের ০২ ডিসেম্বর মাসদার হোসেনের মামলায় (বিচার বিভাগ পৃথককরণ) ১২ দফা নির্দেশনা দিয়ে রায় দেওয়া হয়। ওই রায়ের ভিত্তিতে নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা ছিল। আপিল বিভাগের এ নির্দেশনার পর গত বছরের ০৭ মে আইন মন্ত্রণালয় একটি খসড়া শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিধি প্রস্তুত করে সুপ্রিম কোর্টে পাঠায়।
গত বছরের ২৮ আগস্ট শুনানিকালে আপিল বিভাগ খসড়ার বিষয়ে বলেন, শৃঙ্খলা বিধিমালা সংক্রান্ত সরকারের খসড়াটি ছিল ১৯৮৫ সালের সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার অনুরূপ। যা মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থী।
এরপরই সুপ্রিম কোর্ট একটি খসড়া বিধিমালা করে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠান। গত ১৬ জুলাই প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে এ সংক্রান্ত গেজেট শিগগিরই প্রস্তুত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন আইনমন্ত্রী। পরবর্তী সময়ে ফের ২৭ জুলাই বিকেলে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে খসড়াটি হস্তান্তর করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।
বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ আয়োজিত সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির পরিচিতি সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল মতিন খসরু,অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমসহ আইনজীবী নেতারা।
/এমটি/এমএনএইচ/








