সময়টা ১৯৭১ সাল। মুক্তিযুদ্ধ সবে শুরু হয়েছে। রাজধানীর শাজাহানপুর এলাকাতেও যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এলাকার অন্য বাসিন্দাদের মতো শাজাহানপুরের বাসায় স্বামী-সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটছিল জোসনা বেগমের। সেদিন রাতে বাইরে ভীষণ গোলাগুলি হচ্ছিল। গুলির শব্দে ঘুমাতে না পেরে জোসনা ও তার স্বামী বোরহানুল্লাহ বিছানায় বসেছিলেন। ভোর হয়ে এসেছে। ঠিক সেসময় খড়ের চাল ভেদ করে গুলি এসে লাগে তার বুকে। চিৎকার দিয়ে ওঠেন জোসনা। স্বামীও ভয় পেয়ে যান। মাকে হারানোর আশঙ্কায় সন্তানরা কান্নাকাটি শুরু করে। কিন্তু সে যাত্রায় মৃত্যু তাকে আলিঙ্গন করতে পারেনি। গুলি খেয়েও বেঁচে যান জোসনা।
জোসনা এখন ৮০ বছরের বৃদ্ধা। হাসতে হাসতেই বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘তখন মরণ আছিল না, তাই হয়নিকো। বুকে গুলি লাগার পর আমাক ধরি বাড়ির লোকেরা মিটফোর্ড হাসপাতালে লইয়া (নিয়ে) যায়। সেখানকার ডাক্তাররা আমাক পরীক্ষা করি একটা গুলি বার করে। তারপর বাড়িত চলে আসি।’
জোসনা বলেন, ‘পরে যখন ব্যথা ওঠে ডাক্তার আলমের কাছে নিয়ে যায় আমার স্বামী। সেই ডাক্তার ৩০টা ইনজেকশন দেয়। এরপর আমার কোনও অসুবিধা হয়নি। এখন তো ডাক্তার আলম মারা গ্যাছে।’
তিনি বলেন, ‘গুলি হাড্ডির মধ্যে গিয়া পড়ছিল। এমনি কোনও অসুবিধা নাই, ব্যথা হয় না। ব্যথা করলে বাড়ির লোককে বলতে পারতাম। এতদিন কিচ্ছু বুঝি নাই।’
জোসনার পুত্রবধূ হোসনে আরা বলেন, ‘গত দুই দিন ধরে একটু একটু কাশি হচ্ছে। সোমবার (২২ জানুয়ারি) কাশির সঙ্গে খুব রক্ত গেছে। কালকে থেকে উনি কাহিল হয়ে গেছেন। রক্ত দেখে ভয়ে পেয়ে আমরা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছি।’ তিনি বলেন, ‘ তার দেহের ভেতরে যে গুলি আছে আগে কোনোদিন এই কথা শুনিনি। কখনও শরীরে ব্যথা হয়েছে বললে প্যারাসিটামল খেতে দিতাম। ব্যথার ওষুধ খেয়ে ভালোই থাকতো।’
হোসনে আরা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার শাশুড়ির কেবল গুলিই লাগেনি, সে সময় তিনি হারিয়েও গিয়েছিলেন। তখন দেশের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। আমার শ্বশুর সে সময় স্ত্রীকে হারিয়ে পাগল হয়ে যান। আমার ননদের মুখে শুনেছি, মিটফোর্ড হাসপাতালে চার/পাঁচজন ডাক্তার মিলে তার শরীর থেকে একটা গুলিও বের করেছে। তখন বোধহয় আরেকটা গুলি বের করতে পারেনি। সেটাই এতদিন পর এক্সরেতে ধরা পড়লো।’
জামাতা জালাল বলেন, ‘আমার স্ত্রী তাদের বড় মেয়ে। তার কাছে শুনেছি, শাশুড়িকে হারিয়ে আমার শ্বশুর পাগল হয়ে গিয়েছিল। পরে যখন জানতে পারেন যে, তিনি (শাশুড়ি জোসনা) ভৈরবে তার বাবা-মায়ের বাড়িতে আছেন, সেখান থেকে তাকে বাড়িতে ফেরত নিয়ে আসেন।’
পুত্রবধূ হোসনে আরা বলেন, ‘৬৯৯/১ নম্বরের এই বাড়িতেই আমরা থাকি। আগে দেইটা খড়ের চালের ঘর ছিল, দেয়াল ছিল মাটির। এখন সেগুলোতে ইটের দেয়াল হয়েছে।’
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে জোসনা বলেন, ‘যখন গণ্ডগোল লাগছিল,তখন গুলি পড়ছে। তখন ঘরের চাল দিয়ে গুলি এসে আমার বুকে লাগে। এত বছর কোনও অসুবিধা করেনি। কাল কেবল বেদনা করলো। তখন গোলাগুলিতে মানুষও পাগল হয়্যা গেছে। ঘর থেকে বের হয়ে গ্যাছে। কত মানুষ যে দৌড়ঝাঁপ করছে তখন।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিবারে কোনও খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা নেই। কোনও রাজাকারও ছিল না। বিদেশিরা আইস্যা আমাগোর ওপর গুলি করছিল। তারাই এখানকার মানুষরে মারসে।’
বর্তমানে বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ১৪/১৫ নম্বর ওয়ার্ডের ৩১ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন আছেন জোসনা। বুধবার (২৪ জানুয়ারি) বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ডা. ফাতেহ আকরাম দোলন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জোসনা ঝুঁকিমুক্ত। তবে তার শারীরিক অবস্থা ভালোভাবে বোঝার জন্য আজ মেডিক্যাল বোর্ড বসেছিল। বোর্ডে আমার সিনিয়ররা রোগীর সিটি স্ক্যান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেটি কয়েকদিনের মধ্যে করা হতে পারে।’ তিনি বলেন,‘ এখানকার স্যাররা মনে করছেন, বয়সের কারণে তার অপারেশন করা যাবে না। তবে তার চিকিৎসার ব্যাপারে সব রকম চেষ্টা করা হবে।’
জোসনার স্বামী বোরহানুল্লাহ সাত বছর আগে মারা গেছেন। তাদের এক মেয়ে ও তিন ছেলে। সন্তানরা সবাই নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। সংসারে নাতি-নাতনির সংখ্যা ৯ জন। মেয়ে জোবেদা গৃহিণী। বড় ছেলে ইউসুফ খান চট্টগ্রামে একটি ব্যাংকে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে চাকরি করেন। মেজ ছেলে ইসমাইল খান অসুস্থ। ছোট ছেলে ওসমান বাংলাদেশ টেলিভিশনে ড্রাইভিং সেকশনে কাজ করেন।
সরকারের কাছে নিজের চিকিৎসার সহায়তা চান কিনা জানতে চাইলে জোসনা বলেন, ‘সরকারের কাছে কিছু চাই না। বাংলাদেশের সরকারের কাছে কিছু চাইলে দেয় না।’ পুত্রবধূ হোসনে আরা ও জামাতা জালাল বলেন, ‘গতকাল থেকে প্রায় তিন হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। ওনার অবস্থা খুবই খারাপ। শ্বশুর খালি বাড়িটাই রেখে গেছেন। ওনার কোনও ব্যাংক-ব্যালেন্স নাই।’
আরও পড়ুন:
পুলিশের সঙ্গে মারামারি, ঢাকা মেডিক্যালের ৫৯ আনসার সদস্য প্রত্যাহার








