দীর্ঘ দুই যুগ আগে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে খুনসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলাগুলো এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। এরমধ্যে ১৯৮৬ সালে দায়ের করা মামলাও রয়েছে। এসব মামলার কোনও কোনও আসামি দেশেই কারাবন্দি। অনেকেই মামলা থেকে বাঁচতে দেশের বাইরে পালিয়ে গেছে। পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই, জার্মানি ও ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে বলে জানা গেছে। তাদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য সরকার পুরস্কারও ঘোষণা করেছে। এছাড়া পলাতক আসামিদের মধ্যে কারও কারও নাম আছে ইন্টারপোলের সন্ত্রাসী তালিকায়ও। তবে, দুই যুগেও এসব মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ার জন্য সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে প্রসিকিউশনের ব্যর্থতাকেই দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
মার্চের (২০১৮) প্রথম সপ্তাহে কারা অধিদফতর থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, কয়েকজন ছাড়া বেশিরভাগ সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো বিচারাধীন। বছরের পর বছর এসব মামলা বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফ আছে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। মোহাম্মদপুর থানার ৯৬ সালের একটি হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাভোগ করছে এই সন্ত্রাসী। আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী হাবিবুর রহমান তাজ আছে কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে। তার বিরুদ্ধে ২০০৪, ২০০৬, ২০০৭ ও ২০০৮ সালে মিরপুর, কাফরুল ও পল্লবী থানায় দায়ের হওয়া ৯টি মামলা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, দায়রা জজ আদালত, জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী দমন ট্রাইব্যুনাল, অতিরিক্ত চিপ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। তাজও একটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি।
কারাগারে থাকা আর কোনও শীর্ষ সন্ত্রাসীর এখনও কোনও মামলায় সাজা হয়নি। বাকি সব মামলাই বিচারাধীন। শীর্ষ সন্ত্রাসী আক্তার আছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। তার বিরুদ্ধে ৯৮ ও ৯৯ সালে গুলশান থানায় দায়ের হওয়া তিনটি মামলা দ্রুত বিচার আদালত ও অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। সানজিদুল হাসান ইমন আছে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১-এ। তার বিরুদ্ধে ১৯৯৭ ও ২০০৬ সালে তেজগাঁও এবং শাহবাগ থানায় দায়ের হওয়া দু’টি মামলা ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ ও মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন।
শীর্ষ সন্ত্রাসী বিপ্লব রহমান ওরফে লম্বু সেলিম আছে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১-এ। তার বিরুদ্ধে ৯৮, ৯৯ ও ২০১৭ সালে গুলশান ও শ্যামপুর থানায় দায়ের হওয়া তিনটি মামলা ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও দ্রুত বিচার আদালতে বিচারাধীন। শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহজাদা আছে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ। ২০০৪, ২০০৭, ২০০৮, ২০০৯ ও ২০১০ সালে রামপুরা, খিলগাঁও, বাড্ডা ও রামপুরা থানায় দায়ের হওয়া ছয়টি মামলা ঢাকার বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন। মাকসেদ আলী মুকসা আছে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ। তার বিরুদ্ধে ১৯৯৫, ১৯৯৮, ১৯৯৯, ২০০১ ও ২০০৩ সালে ডেমরা ও সুত্রাপুর থানায় দায়ের হওয়া আটটি মামলা ঢাকার বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
শীর্ষ সন্ত্রাসী কিলার আব্বাস আছে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ। তার বিরুদ্ধে ১৯৯৯, ২০০১ ও ২০০২ সালে কাফরুল, ক্যান্টনমেন্ট, উত্তরা ও কাফরুল থানায় দায়ের হওয়া পাঁচটি মামলা বিচারাধীন ঢাকার বিভিন্ন আদালতে। ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্ছি হেলালও আছে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ। ১৯৯৭, ২০০০ ও ২০০৪ সালে মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের হওয়া তিনটি মামলা বিচারাধীন। খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন আছে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ। ১৯৮৬, ১৯৯৫, ১৯৯৯ ও ২০০২ সালে যশোরের কতোয়ালী, ঢাকার কাফরুল ও ধানমন্ডি থানায় দায়ের হওয়া চারটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
শীর্ষ সন্ত্রাসী শেখ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম আছে কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে। তার বিরুদ্ধে ১৯৯৭ সালে তেজগাঁও থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলা ঢাকার বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। একই কারাগারে আছে শীর্ষ সন্ত্রাসী খোরশেদ আলম রাসু। ১৯৯৩ সালে রমনা থানায় তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একটি মামলা বিচারাধীন আছে ঢাকার বিশেষ যুগ্ম জেলা জজ আদালতে।
হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী এস এম আরমান। ১৯৯৭ ও ২০০৩ সালে তেজগাঁও এবং মতিঝিল থানায় তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া দু’টি মামলা বিচারাধীন আছে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল ও বিশেষ দায়রা জজ আদালতে। সোহেল রানা চৌধুরী ওরফে ফ্রিডম সোহেলও আছে একই কারাগারে। ১৯৮৯ সালে ধানমন্ডি থানায় তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া দু’টি মামলা বিচারাধীন।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়, ২০০১ সালে সরকার ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করলেও পরে আরও অনেকেরই নাম শীর্ষসন্ত্রাসীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এদিকে, ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর একজন পিচ্ছি হান্নান র্যাবের সঙ্গে ক্রসফায়ারে ও আলা উদ্দিন হাতিরঝিল এলাকায় গণপিটুনিতে নিহত হয়। কালা জাহাঙ্গীরের কোনও হদিস নেই। আন্তঃকোন্দলে তারও মৃত্যু হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই, জার্মানি ও ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে। তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে ধরিয়ে দেওয়ার পুরস্কারও। শাহাদাত হোসেন, সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদ, খন্দকার তানভীরুল ইসলাম জয়, হারিস আহমেদ হারেস, নবী হোসেন, রফিকুল ইসলাম, ইমাম হোসেন, প্রকাশ কুমার বিশ্বাস, বিকাশ কুমার বিশ্বাস, আব্দুল জব্বার মুন্না, শামীম আহমেদ ওরফে আগা শামীম, জাফর আহমেদ মানিক ওরফে মানিক, আমিন রসুল সাগর ওরফে টোকাই সাগর, জিসান, লেদার লিটন, কামরুজ্জামান ও ওমর ফারুক কচি পালিয়ে আছেন।
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে যাদের নাম ইন্টারপোলের রেড নোটিশে রফিকুল ইসলাম, হারিস আহমেদ, নবী হোসেন, প্রকাশ কুমার বিশ্বাস, জাফর আহমেদ মানিক, জিসান, টোকাই সাগর, আবদুল জব্বার মুন্না ও শাহাদাত হোসেনসহ অনেকের নামই রয়েছে। পলাতকদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর সর্বশেষ অবস্থা জানা যায়নি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের জনসংযোগ শাখার উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ সব সন্ত্রাসীর ব্যাপারেই পুলিশের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। আর তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো আদালতে বিচারাধীন।’ বিচারাধীন মামলার ব্যাপারে পুলিশের করণীয় কিছু নেই বলেও তিনি জানান।
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মামলার বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার কারণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকার দ্রুত বিচার আদালত-১-এর বিশেষ পিপি মো. আবু আব্দুল্লাহ ভূঞা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাক্ষী না আসা ও উচ্চ আদালতে স্থগিতাদেশসহ নানা কারণে মামলার কার্যক্রম বিলম্বিত হয়। এছাড়া সন্ত্রাসীদের মামলায় সাধারণত সাক্ষীরা আসতে চান না। তবে প্রসিকিউশন চায়, মামলার কার্যক্রম দ্রুত শেষ হোক।’








