মাত্র ১৩ সেকেন্ডের কথোপকথন ও করমর্দন, এরপর ৪০ সেকেন্ডের মধ্যে রাজধানীর লালমাটিয়ার একটি সড়ক থেকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় কুমিল্লার তিতাস উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা পারভেজ হোসেন সরকারকে। তাকে অপহরণের জন্য অপহরণকারীরা নিয়ে এসেছিল বিলাসবহুল একটি গাড়ি। দিনদুপুরে পথচারীদের সামনে এমন অপহরণের সময় কেউ এগিয়ে গিয়ে প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি। কারণ, অপহরণকারীদের সঙ্গে ছিল অস্ত্র।
স্থানীয় থানা পুলিশ সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে ৭/৮ জন অপহরণকারীকে চিহ্নিত করেছে। তবে ফুটেজে চেহারা অস্পষ্ট থাকায় তাদের পরিচয় নিশ্চিত হতে পারেনি।
শুক্রবার (২৭ জুলাই) লালমাটিয়ার সি-ব্লকের মসজিদ থেকে জুমার নামাজ শেষে বেলা পৌনে ২টার দিকে বাসায় ফিরছিলেন পারভেজ হোসেন সরকার। তখন তাকে জোর করে তুলে নেওয়া হয়।
সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, বেলা পৌনে ২টার দিকে এক ব্যক্তি তার বাসার সামনে কুশল বিনিময়ের জন্য হাত বাড়িয়ে দেন। পারভেজ মোবাইলের দিকে তাকাতে তাকাতে হাত মেলান। এরপর দুজনের মধ্যে একটু কথা হয়। এর মধ্যেই লম্বা চুলওয়ালা অপর এক ব্যক্তি পারভেজের পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। তাদের মধ্যে ১৩ সেকেন্ড কথা হয়। এরপরই দুজন মিলে পারভেজকে টেনেহিচড়ে নিয়ে যায়। ৪০ সেকেন্ডের মধ্যেই তাকে একটি কালো বিলাসবহুল গাড়িতে তুলে নেয় অপহরণকারীরা। এরপর দ্রুত তারা ওই এলাকা থেকে চলে যায়।
ঘটনার পরপরই অপহরণের খবর পায় পারভেজের পরিবার। তারা ছুটে যায় মোহাম্মদপুর থানায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে এসেই সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে। পরিবারের অভিযোগ নিজ দলের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও প্রতিপক্ষ এই অপহরণের সঙ্গে জড়িত। একজন ভাইস চেয়ারম্যানের নামও উল্লেখ করেছেন তারা। তবে পুলিশ সবকিছু মাথায় রেখেই তদন্ত করছে বলে জানিয়েছে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন মীর।
তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর পারভেজ হোসেনের সরকারের স্ত্রী একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। আমরা তার আগেই তদন্ত শুরু করেছি। ওই এলাকার সব সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছি। সিসি ক্যামেরার দৃশ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সন্দেহভাজন গাড়িও শনাক্ত করা হয়েছে। আমরা সবকিছু মাথায় রেখেই তদন্ত করছি।’
তবে পারভেজের বিরুদ্ধে থানায় কোনও মামলা নেই। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেনি বলেও নিশ্চিত করেন ওসি জামাল উদ্দিন মীর। অন্য কোনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেফতার করছে কিনা তা ওসির জানা নেই।
পারভেজ হোসেনের খালাতো ভাই ফাহাদ মোহাম্মদ জানান, জুমার নামাজ শেষে তিনি লালমাটিয়া মসজিদ থেকে বের হয়ে বাসার দিকে আসছিলেন। এ সময় একজনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কুশল বিনিময় করেন। এরপরই একটি কালো রঙের জিপ গাড়ি আসে এবং দুজন মিলে জোরপূর্বক তাকে নিয়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘এই ঘটনাটি দ্রুত মোহাম্মদপুর থানায় জানানো হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করেন। সেখানে দেখা গেছে, একটি কালো রঙের গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-গ-১৪২৫৭৭) বাসার সামনে এসে থামে এবং দুজন লোক জোর করে পারভেজকে ওই গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়।’
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তিতাসের বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান সোহেল শিকদারের সঙ্গে অনেক দিন ধরেই রাজনৈতিক ঝামেলা চলছে পারভেজ হোসেনের। ওই এলাকায় প্রোটোকল ছাড়া পারভেজ কখনও যাতায়াত করতেন না। গত বছর ওই এলাকায় সোহেল শিকদারের লোকজন পারভেজের ওপর হামলা করেছিল।
লালমাটিয়া সি ব্লকের ৩০ নম্বর বাড়িতে দুই ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন পারভেজ। তিনি ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিতাসের উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন।
ঘটনার পর পারভেজের স্ত্রী গণমাধ্যমকে জানান, ৪৫ দিন আগে তাকে এবং সন্তানদের একা বের হতে নিষেধ করছিলেন। কোথাও গেলে যেন বাসায় সবাইকে জানিয়ে যায়। বিভিন্ন আশঙ্কার কথা বলছিলেন তিনি।
ঘটনার পর লালমাটিয়া এলাকার বিভিন্ন বাড়ির ও সড়কের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ। কয়েকটি সিসি ক্যামেরায় অপহরণকারীদের মুখমণ্ডল কিছুটা স্পষ্ট থাকলেও বেশিরভাগই অস্পষ্ট বলে জানিয়েছে পুলিশ। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ নিয়ে কাজ করছে তারা।
ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা সবকিছু মাথায় রেখেই তদন্ত করছি। তবে এখনও কোনও কিছু বোঝা যাচ্ছে না। তাকে উদ্ধারে অভিযান চলছে।’
আরও পড়ুন: তিতাস উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও আ. লীগ নেতাকে ঢাকায় অপহরণ








