বাংলায় আদালতের রায় পেতে দরকার সম্মিলিত উদ্যোগ

Send
বাহাউদ্দিন ইমরান
প্রকাশিত : ০৭:৫৯, মার্চ ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৫৯, মার্চ ০৪, ২০১৯

সুপ্রিম কোর্ট

মাতৃভাষা বাংলাকে সব ক্ষেত্রে চালুর জন্য হাইকোর্টের দেওয়া রায় প্রায় ছয় বছর ধরে উপেক্ষিত। এই দীর্ঘ সময়ে নিম্ন আদালতের অধিকাংশ আদেশ কিংবা রায় বাংলায় লেখা হলেও সুপ্রিম কোর্টের (আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগ) ক্ষেত্রে আগের চিত্রই বহাল। তবে আইন-আদালতসহ সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা থাকলে দেশের সুপ্রিম কোর্টেও বাংলায় রায় পাওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। 

২০১৪ সালের ২৯ এপ্রিল দেশের সব অফিস-আদালতসহ সব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা প্রচলনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে বাংলা পত্রিকায় বাংলায় বিজ্ঞাপন দিতে এবং ইংরেজি পত্রিকায় ইংরেজিতে বিজ্ঞাপন দেওয়া যাবে বলেও আদেশে বলা হয়। এছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে যেমন, দোকানের সাইনবোর্ড, গাড়ির নম্বর প্লেট, ভবনের নামফলক, পণ্যের নাম ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা প্রচলনে পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বিচারপতি কাজী রেজাউল হক ও বিচারপতি এ বি এম আলতাফ হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টে বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

এ বিষয়ে রিটকারী আইনজীবী ইউনুস আলী আকন্দ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন - ১৯৮৭’-এর ৩ নং ধারায় বলা হয়েছে, দেশের সব অফিস-আদালতে বাংলা ভাষার প্রচলন করা হবে। কিন্তু তার বাস্তবায়ন করা হয়নি। এমনকী আদালতের আদেশটিও দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত হয়ে আসছে।”

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন নিয়মিত বাংলায় রায় দেন। বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম মাঝে মাঝে এবং বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল নিয়মিত বাংলায় রায় ও আদেশ লিখে থাকেন। বিভিন্ন সময়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ও সাবেক বিচারপতি হামিদুল হক মাঝে মাঝে বাংলায় আদেশ দিতেন।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষা। তাই অবশ্যই সব বিচারকের উচিত বাংলায় রায় লেখা।’

গত ২১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে আদালতের বিচারকদের বাংলায় রায় লেখার আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রীর এ আহ্বান সাধারণ মানুষের মনের প্রতিফলন বলে মনে করেন আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের স্বাধীনতা ও সংস্কৃতির কথা চিন্তা করলে দেখা যাবে সব কিছুরই মূল সোপান ছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। এরপর ছয় দফা দাবি ও স্বাধীনতা এসেছে। সেসব বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী যে আহ্বান জানিয়েছেন তা আমাদের সাধারণ মানুষদের মনের প্রতিফলন। তাই প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় প্রতিফলনের জন্য আমরা প্রস্তুত। ’ জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী বলেন, ‘এখন আমরা বিচারপতি ও আইনজীবীরা যদি সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করি, সবাই মিলে কিছু সময়ের ব্যবধানে আমরা এ উদ্যোগকে সফল করতে পারবো।’

২০০৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলায় রায় লেখা শুরু করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। এরপর তার বিচারিক জীবনের প্রায় শতভাগ মামলার রায় তিনি বাংলাতেই দিয়েছেন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘বাংলায় রায় লেখা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুবই ভালো কথা বলেছেন। অনেক আগে থেকে আমরাও একই কথা বলে আসছি। এখন প্রধানমন্ত্রী বলায় হয়তো বিষয়টি আরও অগ্রসর হবে।’   

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. জাহিদ চৌধুরী বলেন, ‘আইনাঙ্গনের অনেক ইংরেজি শব্দের বাংলা রয়েছে যেগুলো বেশ কঠিন। তাই যারা ভাষারীতি নিয়ে চর্চা করেন তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে বলে আমি মনে করি। তাহলে বিচারক ও আইনজীবীদের প্রচেষ্টায় আমরা আমাদের মাতৃভাষায় রায় পেতে পারবো এবং আইনের প্রতি মানুষের আগ্রহও বৃদ্ধি পাবে।’

বাংলায় রায় লেখার বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় থেকে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হবে কিনা, জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘বিচার বিভাগ স্বাধীন। সুপ্রিম কোর্ট স্বাধীন। তাই মন্ত্রণালয় থেকে কোনও উদ্যোগ নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। তবে কথা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী যেহেতু সরকার প্রধান সেহেতু তিনি কথাটি (বাংলায় রায় লিখতে) বলতেই পারেন। আমি মনে করি, সুপ্রিম কোর্টও এই কথাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন।’

 

/এইচআই/

লাইভ

টপ