গুলশান হামলার তিন বছর: বিচার কতদূর?

Send
নুরুজ্জামান লাবু
প্রকাশিত : ০০:৫০, জুলাই ০১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:২৭, জুলাই ০১, ২০১৯

হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার তিন বছর

রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার তিন বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৬ সালের ১ জুলাই এই হামলায় দেশি-বিদেশি ২০ নাগরিক, দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ মোট ২২ জন নিহত হন। দেশের ইতিহাসে প্রথম অস্ত্রধারী জঙ্গিরা রাতভর রেস্টুরেন্টে আগত সব অতিথি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জিম্মি করে রাখে। রাতভর চরম উদ্বেগ ও নাটকীয়তায় পার হওয়ার পর সকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় সেনা কমান্ডোদের ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এর মাধ্যমে জিম্মি ঘটনার অবসান হয়। সেনা কমান্ডোদের অভিযানে নিহত হয় পাঁচ জঙ্গি। আলোচিত এই ঘটনার পর এর রহস্য উন্মোচন করে জীবিত ৮ জঙ্গির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেয় তদন্ত সংস্থা কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। কিন্তু এই ঘটনার বিচার কতদূর?

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২৩ জুলাই জীবিত আট জঙ্গির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেয় পুলিশ। গত বছরের ৮ আগস্ট আদালত চার্জশিট গ্রহণ করেন। ২৬ নভেম্বর থেকে শুরু হয় এ মামলার বিচার প্রক্রিয়া। ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমানের আদালতে বর্তমানে এই মামলার বিচারকাজ চলছে।

হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে যৌথবাহিনীর অভিযানে এই পাঁচ জঙ্গিই নিহত হয়

আদালত সূত্রে জানা গেছে, আলোচিত হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা মামলার চার্জশিটে মোট ২১১ জনকে সাক্ষী করা হয়েছিল। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত মোট ৬০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৫ জুন ৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। পরবর্তী দিন ধার্য করা আছে মঙ্গলবার (২ জুলাই)। একইসঙ্গে বিচারক অভিযোগপত্রের ৫৮, ৫৯ এবং ৯২-১০০ নম্বর সাক্ষীদের প্রতি জামিন অযোগ্য ধারায় ওয়ারেন্ট ইস্যু করার আদেশ দেন।
ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তুলনামূলক দ্রুততার সঙ্গে এই মামলার বিচারকাজ চলছে। এখন পর্যন্ত ৬০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন আদালত। আরও দেড় শতাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ বাকি রয়েছে। আমরা আশা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা শেষ করে বিচার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা যাবে। আশা করি আসামিদের অবশ্যই ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট (সর্বোচ্চ শাস্তি) হবে।’

হলি আর্টিজান থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন জিম্মিরা

তিনি বলেন, ‘হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনাটি দেশ বিদেশে আলোচিত একটি বিষয়। এই ঘটনায় জাপান ও ইতালির ১৭ নাগরিকসহ মোট ২২ জন মারা গেছেন। আশা করি আদালত আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন।’

আদালত সূত্রে জানা গেছে, হলি আর্টিজান মামলায় এখন পর্যন্ত সাক্ষী দিয়েছেন−রিজন কুমার দাস (এসআই),  সমীর বাড়ৈ, গাড়িচালক আব্দুর রাজ্জাক রানা, নূরে আলম, আরিফ মো. শাওন, মুন্না দেওয়ান, আশরাফ উজ জামান, লাজরুস সরেন, তরুণ গোমেজ, মো. হোসেন, লেনিন মোল্লা, সঞ্জয় বড়ুয়া, সামিরা আহমেদ, আব্দুল হাকিম, আকাশ খান, সাদাত মেহেদী, আরিফ হোসেন, শারমিনা পারভীন, শামসুজ্জামান, মোল্লা মো. আনুয়ারুল আমিন, রেমকিম, নূরজাহান, দাউদ, ইফতেখার হাছান, শরিফুল ইসলাম, সালাউদ্দিন মিয়া, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আমান, মতিউর রহমান, আনোয়ারুল আজিম, মমতাজ পারভীন, রিনা সুলতানা, জালাল উদ্দিন, নূরুল ইসলাম, লতিফুল বারী, সাইফুল ইসলাম, সোহরাব আলী, বিল্লাহ হোসেন দুলাল, ওয়াহিদুজ্জামান (পুলিশ পরিদর্শক), ফারুক হোসেন (এসআই), সোহাগ খন্দকার (এএসআই), প্রদীপ চন্দ্র দাস (কনস্টেবল), রফিকুল ইসলাম (পরিদর্শক), কবির হোসেন (এসআই), মিজানুর রহমান (এসআই), দিদার হোসেন, দীন ইসলাম রাকিব, ইয়াছিন গাজী (পরিদর্শক), লুৎফর রহমান (এএসআই), পলাশ মিয়া (পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট পুলিশ), মো. খোরশেদ আলম (কনস্টেবল), মাহফুজুর রহমান (কনস্টেবল), সাহেদ মিয়া (এডিসি), আবু তাহের মো. আব্দুল্লাহ (এডিশনাল এসপি), অনজন সরকার (কনস্টেবল), বাদশা (কনস্টেবল), মো. আ. আহাদ (অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার), জসিম উদ্দিন (অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার), মো. ওবায়দুল হক (অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার), মাহাবুব আলম (এসআই) ও বিল্লাল ভুইয়া (এএসআই)।

হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলায় জড়িত জঙ্গিরা। (ফাইল ছবি)

বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তৈরি করা ভয়াবহ এই হামলায় মোট ২২ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। যাদের মধ্যে ৯ জন ইতালি, ৭ জন জাপান, একজন ভারতীয় এবং ৩ জন বাংলাদেশি নাগরিক। হামলার পর অভিযানে গিয়ে নিহত হন দুই পুলিশ কর্মকর্তা। রাতভর জিম্মি পরিস্থিতির অবসান ঘটে পরদিন সকালে। সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে পাঁচ হামলাকারীসহ ছয় জন নিহত হয়। পরবর্তী সময়ে নিহত অপর একজনকে হলি আর্টিজানের পিৎজা শেফ সাইফুল ইসলাম চৌকিদার হিসেবে শনাক্ত করা হয়। আলোচিত এই ঘটনায় গুলশান থানার এসআই রিপন কুমার দাস বাদী হয়ে সন্ত্রাস দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ দুই বছর তদন্ত শেষে গত বছরের ২৩ জুলাই আদালতে আলোচিত এই মামলার চার্জশিট দেয় পুলিশ। চার্জশিটে হামলায় ২১ জঙ্গির জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। জড়িত ২১ জনের মধ্যে হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া ৫ জন মারা যায় সেনা কমান্ডো অভিযানে। তারা হলো−রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সামিহ মোবাশ্বের, খায়রুল ইসলাম পায়েল, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ওরফে বিকাশ। এছাড়া হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর বিভিন্ন অভিযানে জড়িতদের মধ্যে আরও আট জন মারা যায়। তারা হলো−তামিম চৌধুরী, সরোয়ার জাহান ওরফে আব্দুর রহমান, তানভীর কাদেরী ওরফে জামসেদ, নূরুল ইসলাম মারজান, বাশারুজ্জামান চকোলেট, মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান, মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ও রায়হান কবির ওরফে তারেক।

এছাড়া চার্জশিটে জীবিত আট জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। তারা হলো−জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলামুল ইসলাম ওরফে রাশেদ ওরফে র‌্যাশ, আব্দুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজ, হাদীসুর রহমান সাগর, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, মামুনুর রশিদ রিপন ও শরীফুল ইসলাম খালিদ। এদের মধ্যে রিপন ও খালিদ পলাতক ছিল।

হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা প্রতিরোধ

চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি রাতে গাজীপুরের বোর্ডবাজার থেকে রিপনকে এবং ২৫ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল থেকে খালেদকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, আলোচিত এই মামলায় প্রথমে গ্রেফতার দেখালেও চার্জশিটে অব্যাহতি দেওয়া হয় ঘটনার রাতে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে জঙ্গিদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকা হাসনাত রেজা করিমকে। ঘটনার ৩৪ দিনের মাথায় হাসনাত করিমকে প্রথমে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট তাকে সরাসরি গুলশান মামলায় গ্রেফতার দেখায় তদন্ত কর্মকর্তা। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ঘটনার সঙ্গে হাসনাতের কোনও সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার ও সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, আমরা চার্জশিট দেওয়ার সময় বলেছিলাম পরবর্তী সময়ে যদি এই ঘটনার সঙ্গে জঙ্গিদের কারও নাম বেরিয়ে আসে তাহলে আমরা সম্পূরক চার্জশিট দেবো। কিন্তু পলাতক দুই আসামি গ্রেফতার হওয়ার পর আমরা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। কিন্তু নতুন কোনও তথ্য বা সম্পূরক চার্জশিট দেওয়ার মতো কোনও তথ্য পাইনি। যে আট জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে তাদের বিরুদ্ধেই সন্ত্রাসীবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারকাজ চলছে। আশা করছি দ্রুতই এর বিচারকাজ সম্পন্ন হয়ে আসামিরা সর্বোচ্চ শাস্তি পাবে। 

/টিএন/আপডেট-এপিএইচ/এমএমজে/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ