জঙ্গি নাকি সন্ত্রাসীদের কাছে যাচ্ছে এসব অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র?

Send
নুরুজ্জামান লাবু
প্রকাশিত : ০২:৪৬, জুলাই ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৮, জুলাই ২৭, ২০১৯

রাজধানী ঢাকায় অত্যাধুনিক ও ভারী অস্ত্রের যোগান বাড়ছে। গত কয়েকদিনে একাধিক অভিযানে একে টুয়েন্টি-টু অটোমেটিক রাইফেলসহ বিদেশি অত্যাধুনিক অস্ত্র উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব অস্ত্রের গন্তব্য নিয়ে চিন্তিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। পেশাদার অপরাধী নাকি জঙ্গিদের কাছে যাচ্ছে এসব অস্ত্র? যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোরবানির ঈদ কেন্দ্রীক চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য এসব অস্ত্র সংগ্রহ করছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরা। সন্ত্রাসী বা জঙ্গিদের হাতে এসব অস্ত্র যাওয়ার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে অস্ত্র দিয়ে খুনোখুনির পরিমাণ কমে এসেছে। এমনকি আগের মতো এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের যেসব গ্রুপগুলো ছিল, সেসবের শীর্ষ নেতারা গ্রেফতার হয়েছে। কেউ কেউ পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতও হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি নতুন করে রাজধানীতে অবৈধ অস্ত্রের বিকিকিনি ও মজুদ বাড়ছে বলে তথ্য পাচ্ছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। আগে জঙ্গিরা শুধু বিস্ফোরক বা হাতে তৈরি বোমা ব্যবহার করলেও গত কয়েক বছর ধরে তাদের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। টার্গেট কিলিংয়ের জন্য জঙ্গিরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতো।
সম্প্রতি রাজধানীর ওয়ারী এলাকা থেকে একসঙ্গে ছয়টি অত্যাধুনিক ও বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ১২৮ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ সময় রাজু গাজী, সাখাওয়াত ও মিনহাজুল নামে তিনজনকে গ্রেফতার করা হলেও তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তারা কেউ অস্ত্রের মালিক নয়। তারা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় অস্ত্র পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেছে। মিরপুর থেকে তারা অস্ত্রগুলো যার নির্দেশে শ্যামপুর নিয়েছিল এবং যার কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছিল, পুলিশ তাদের শনাক্তের পর গ্রেফতারের চেষ্টা করছে। পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, এই অস্ত্রগুলো রাজনৈতিক ক্যাডারদের কাছে যাচ্ছিল বলে তারা ধারণা করছেন।

অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শ্যামপুর থানার এসআই মীর মোজাহারুল ইসলাম বলেন, গ্রেফতার হওয়া তিন আসামিকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে বাকি আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
শ্যামপুরের অস্ত্র উদ্ধারের আগে গত মাসের শুরুতে পুরান ঢাকা থেকে একটি একে ২২ অটোমেটিক রাইফেল হাত বদলের সময় তা উদ্ধার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট- সিটিটিসি। এসময় হাতেনাতে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় নেতৃত্ব দেওয়া কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা জানান, অস্ত্রটি চট্টগ্রামের বাবুল ও সাদেক নামে দুই সন্ত্রাসীর কাছ থেকে হাত বদল হয়ে কুমিল্লার হাসিব ও কিবরিয়া নামে দুই ব্যক্তিকে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। একইভাবে গত ছয় মাসে আরও তিনটি একে ২২ অটোমেটিক রাইফেল হাত বদল হয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৬ সালে হলি আর্টিজান বেকারিতে যে একে ২২ রাইফেল ব্যবহার করেছিল জঙ্গিরা, পুরান ঢাকা থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রটি একই। এছাড়া ওই বছরের ২৬ জুলাই কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানাতেও অভিযানের পর পুলিশ কর্মকর্তারা জানতে পারেন, একটি একে ২২ অটোমেটিক রাইফেল নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল এক জঙ্গি।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, চলতি বছরের মার্চ মাসেই একটি ডাকাত চক্রের ১২ সদস্যকে গ্রেফতারের পর তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য দিয়ে রামপুরায় অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে হাফিজ ওরফে খালিদ ওরফে ইব্রাহীম গাজী এবং মামুনুর রশিদ ওরফে বাচ্চু মোল্লা নামে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী- বাংলাদেশ (হুজিবি) এর দুই সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে গোয়েন্দা পুলিশ একটি অত্যাধুনিক একে ২২ অটোমেটিক রাইফেল, একটি পাইপগান, ৪১ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছিল।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত যেসব একে ২২ অটোমেটিক রাইফেল উদ্ধার করা হয়েছে, সেগুলোর সব প্রায় একই রকম। এসব রাইফেল থেকে একসঙ্গে ৩০ রাউন্ড গুলি বের হয়। ব্রাশ ফায়ারের পাশাপাশি একটি করে গুলিও বের হয়। ডাকাতি বা চাঁদাবাজি কাজে সাধারণ অপরাধীদের এসব অস্ত্র ব্যবহার করার কথা নয়।

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা জানান, একে ২২ রাইফেলগুলো সাধারণত পার্বত্য অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে। পাহাড়ের সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর হাতেও এসব অস্ত্র হরহামেশাই দেখা যায়। আর ছোট অস্ত্রগুলো ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে আগে অহরহ বিস্ফোরক ও আগ্নেয়াস্ত্র আসতো। ২০১৬ সালের পর থেকে সীমান্তগুলোতে কড়াকড়ির কারণে অস্ত্র-বিস্ফোরকের চালান কম আসতো। এখন আবার যশোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকার কয়েকটি স্পট দিয়ে এসব অস্ত্র আসছে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রাজধানী ও এর আশেপাশের এলাকাগুলোতে গরুর হাটের ইজারা নিয়ে পেশিশক্তির প্রদর্শন হয়ে থাকে। এ কারণেও সন্ত্রাসীরা অস্ত্র মজুদ করে থাকতে পারে। এছাড়া আগের মতো শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আধিপত্য না থাকলেও এখন রাজনৈতিক দলের ক্যাডারদের উৎপাত রয়েছে। এদের অনেকেই নিজ নিজ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয়। তবে অটোমেটিক রাইফেলগুলো উদ্ধার করা নিয়ে তারা কিছুটা চিন্তিত। এসব অস্ত্র কোনওভাবেই রাজনৈতিক ক্যাডারদের ব্যবহার করার কথা নয়।
কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘একে টুয়েন্টি টু রাইফেলগুলোর উৎস এবং হাত বদল হয়ে যাদের কাছে যাওয়ার কথা ছিল তাদের আমরা শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। এসব অস্ত্র পেশাদার সন্ত্রাসী নাকি জঙ্গিরা সংগ্রহ করছে তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

/এআর/

লাইভ

টপ