২০০২ সালে সর্বশেষ মোহামেডান প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জিতেছিল। এরপর থেকে লক্ষ্যহীন একসময়ের ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি। পেশাদার যুগে ফুটবল প্রবেশ করলেও মোহামেডানে তেমন কোনও পরিবর্তন আসেনি। এখন পর্যন্ত লিগ শিরোপা অধরাই রয়ে গেছে। শুধু ফুটবল নয়, ক্রিকেট, হকিসহ অন্য খেলাতেও তাদের সাফল্য কমই বলতে হবে। কিন্তু মাঠের প্রতিযোগিতায় মোহামেডানের ধীরে ধীরে পতন হলেও মদ-জুয়া থেকে শুরু করে ক্যাসিনো বসিয়ে রীতিমতো সেখানে অবৈধ কর্মকাণ্ডের আখড়ায় পরিণত করা হয়েছিল। এসবের নেপথ্যে ছিল ক্লাবটির ডিরেক্টর ইনচার্জ লোকমান হোসেন ভূঁইয়া। গত কয়েক বছরে তার উত্থানও চোখে পড়ার মতো!
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নব্বইয়ের দশকে মোসাদ্দেক আলী ফালুর হাত ধরে লোকমান হোসেন ভূঁইয়ার মোহামেডান ক্লাবে অনুপ্রবেশ ঘটে। ধীরে ধীরে ক্লাবটির বড় পদে জায়গা করে নেন লোকমান। একপর্যায়ে ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক পদটি দখল করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। তারপর ২০১২ সালে লিমিটেড হওয়ার পর ডিরেক্টর ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এরইমধ্যে লোকমান বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অ্যাডহক কমিটিতে সদস্য হিসেবে জায়গা করে নেন। এরপর তো পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তার এই উত্থানের নেপথ্যে থেকে সহযোগিতা করেছেন বিসিবির একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তি। তার সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকায় লোকমান একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও এখন আওয়ামী লীগার বনে গেছেন।
সেই সূত্র আরও জানিয়েছে, নিজে বিভিন্ন জায়গায় পদ পদবি নিলেও মোহামেডান ক্লাবের উন্নতির প্রতি তেমন জোর দেননি লোকমান হোসেন। ফুটবল, ক্রিকেট ও হকি ছাড়াও অন্য খেলাগুলোতে ক্লাবটির অবস্থান বেশ নাজুক। তার আমলে খেলোয়াড় ও কোচরা ঠিকমতো বেতন পেতেন না। কিন্তু ভাউচার জালিয়াতি করে অর্থ হাতিয়ে নিতেন লোকমান নিজেই। অবৈধভাবে বাড়তি অর্থ আদায়ের জন্য ক্লাবে বসানো হয়েছিল ক্যাসিনো। ক্লাবের হাউজি ও ক্যাসিনোসহ বিভিন্ন আয়ের উৎস থেকে প্রায় পুরো অংশই যেতো লোকমানের পকেটে। খেলাধুলার প্রতি লোকমানের উৎসাহ কম ছিল। কীভাবে ক্লাবকে পুঁজি করে টাকা কামাবেন, সেদিকে তার নজর ছিল বেশি। ক্লাবে তার একক আধিপত্য ছিল।
এই দুরবস্থা নিয়ে ক্লাবটির সাবেক তারকা খেলোয়াড় ও কোচ গোলাম সারওয়ার টিপু ক্ষোভের সঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘মোহামেডান ক্লাবের অবনতি শুরু হয়েছে আগেই। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এত খারাপ অবস্থা তা কল্পনাও করিনি। ক্যাসিনো পর্যন্ত চলে এসেছে ক্লাবে। এটি চিন্তা করতেই খারাপ লাগছে। আর ক্যাসিনো থেকে এত টাকা যদি আয় হয়, তাহলে সেই টাকা গেল কোথায়? মাঠে মোহামেডানের পারফরম্যান্স একদম খারাপ। কোন ডিসিপ্লিনে তেমন সাফল্য নেই। এদিকে কারও মনোযোগও নেই। নিশ্চয়ই যারা ক্লাব চালিয়েছে তাদের দায় বেশি।’
মোহামেডান ক্লাবের একজন হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জা বোধ করেন টিপু, ‘আমি যে ক্লাবে একসময় খেলেছি, কোচিং করিয়েছি, যে ক্লাবকে আমার দ্বিতীয় হোম হিসেবে দেখি, সেই ক্লাবের এত অধঃপতন!কিছুতেই মানা যায় না। এখন তো এই ক্লাবের নাম শুনলেই সবাই আঁতকে উঠছেন। আমার নিজেরই তো ভয় লাগছে। লোকমান গং ক্লাবকে কোন পর্যায়ে নিয়ে গেছে তা চিন্তা করলেই এখন অনেক খারাপ লাগে। মোহামেডানের পতন তার সময় থেকে শুরু। আজ দেড় যুগের বেশি সময় হলো মোহামেডান লিগ শিরোপায় নেই। সে ক্লাব ভালোবাসে এমন কাউকে দলে ভিড়তে দেয়নি। সালাম-বাদলরা তার সামনে টিকতে পারেনি। নিজের মতো কিছু লোক নিয়ে কমিটি করে ক্লাব চালিয়ে আসছে।’
৮০ দশকে মোহামেডানে খেলা আরেক সাবেক তারকা খেলোয়াড় আব্দুল গাফফারের ক্ষোভ কম নয়, ‘দীর্ঘদিন ধরে মোহামেডানে কোনও সাফল্য নেই। আগের যারা পরীক্ষিত সংগঠক ছিলেন তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। বলতে পারেন তাদের একরকম বিতাড়িত করা হয়েছে। এ অবস্থার পেছনে লোকমান গং দায়ী। প্রকৃত সংগঠকরা আসলে দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। মাঝে ক্লাব লিমিটেড হলো। কিন্তু কোনও এজিএম কিংবা নির্বাচন হয়নি। নিজের জায়গা ধরে রাখতে লোকমান গং যা করার তা-ই করেছে। কুক্ষিগত করে রেখেছে।’
সাদা-কালো দলটির সাবেক ফুটবলার ও ম্যানেজার ইমতিয়াজ সুলতান জনি মোহামেডানের এমন পরিস্থিতি দেখে ভীষণ ব্যথিত,‘অনেক কষ্টের বিষয়। এটা অনেক খারাপ খবর। মোহামেডানের সম্মান ধুলোয় মিশে গেছে। আমরা ১৫ বছর আগেই বলেছিলাম, লোকমানদের হাতে ক্লাব ভালো করতে পারবে না। সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। মাঝে বহুতল বিল্ডিং করার পরিকল্পনা করে স্বপ্ন দেখালো। সেটাও হয়নি। স্পোর্টিং ক্লাবে এখন ক্যাসিনো ব্যবসা, এটা শুনলেই বড় ধাক্কা খেতে হয়। ক্লাব তো কারও নিজস্ব সম্পত্তি হতে পারে না।’
আরেক সাবেক তারকা বাদল রায় বলেছেন,‘লোকমান সাহেব ক্লাবকে পুঁজি করে নিজের আখের গুছিয়েছেন। অথচ দীর্ঘদিন ধরে ক্লাবের কোনও সাফল্য নেই। আসলে লোকমান গং ক্লাবকে ভালোবাসেননি। নিজের স্বার্থ দেখেছেন।’
মোহামেডানের প্রসঙ্গ ফিফা পর্যন্তও গড়িয়েছিল। একসময় মোহামেডানে খেলে গেছেন নাইজেরিয়ান এমেকা ইউজিগো। মাঝে কোচ হয়ে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু ক্লাব থেকে তার পাওনা না দেওয়ায় ফিফার দ্বারস্থ হলে শেষ পর্যন্ত তা দিতে বাধ্য হয়েছেন লোকমান হোসেন ভূঁইয়া। এমেকা তখন সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন,‘মোহামেডান হলো লোকমানের আয়ের দোকান। এই ক্লাব দিয়েই তার ব্যবসা বাণিজ্য হয়ে থাকে। ক্লাবের প্রতি তার বিন্দুমাত্র ভালোবাসা নেই।’







