‘আমি জীবিত, আমাকে হেল্প করুন’

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ২০:০৫, নভেম্বর ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৪৬, নভেম্বর ১৩, ২০১৯

পপপপপ‘সৈকত প্রায় চার ঘণ্টার মতো ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতাল মর্গে লাশের সারিতে পড়েছিল। জ্ঞান ফিরলে বলছিল, “আমি জীবিত আছি, আমাকে হেল্প করুন।” হয়তো গলার স্বর এত ক্ষীণ ছিল যে কেউ খেয়াল করেনি। আর সেদিন সেখানকার পরিস্থিতিও তো খুব খারাপ ছিল রোগীদের নিয়ে। তাই হয়তো ডেডবডির দিকে কেউ খেয়াল করেনি’—বলছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত সৈকতের ছোট চাচা জাহিদ হাসান। বুধবার (১৩ নভেম্বর) সকালে কথা হয় তার সঙ্গে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের পুরাতন ভবনের একটি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন সৈকত। এ প্রতিবেদক যখন সেখানে যান তখন সৈকতকে সিটিস্ক্যান করার জন্য নেওয়া হয়েছে। সৈকতের বেডের পাশে দাঁড়িয়েই কথা হয় চাচা জাহিদ ও বাবা শহীদুল্লাহর সঙ্গে।

সেদিন সৈকতকে মৃত ভেবে চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে জাহিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘লাশের সারিতে মর্গে পড়ে থাকা অবস্থার কথা জানিয়ে সৈকত বলেন, “মাথা-নাক-মুখ দিয়ে অনবরত রক্ত ঝরছিল। ওরা বারবার বলছিল, এখানে একটা ডেডবডি আছে। আমি শুনতে পাচ্ছি, আমাকে তারা ডেডবডি বলছে। কিন্তু কিছু বলতে পারছিলাম না। তখন আমার তো জ্ঞান ফেরে আবার জ্ঞান হারাই এমন অবস্থা। কিন্তু কিছু বলার মতো শক্তি বা অবস্থা কোনোটাই ছিল না আমার।” ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে, থেমে থেমে এসব কথা জানান সৈকত। সবাই ভেবেছিলেন সৈকত মারা গেছে, তাই তার দিকে কেউ খেয়াল করেননি। পরে কোনও রকমে সাহস করে নিজের শার্টের হাতা ছিঁড়ে মাথায় বেঁধে নিজেই গেছে একজনের কাছে। গিয়ে বলেছেন, আমাকে বাঁচান, আমার পরিবারকে জানান অ্যাক্সিডেন্টের কথা।’

রিররজাহিদ বলেন, ‘এত রক্ত ঝরেছে, শার্ট প্যান্ট সব ভিজে শুকিয়ে শরীরের সঙ্গে শক্ত হয়ে গেছে। আমি নিজে সেসব গা থেকে খোলার জন্য কাঁচি দিয়ে কেটেছি। সৈকত কেবল একটা কথাই বারবার আমাকে বলছিল, “কাকা আমি যুদ্ধ করে এ পর্যন্ত এসেছি, নিজে বেঁচেছি”।’

সৈকতের আঘাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ওর মুখের ভেতরের দুই পাশের চোয়াল ভেঙেছে। একটা দাঁতও ঠিক নেই, কথা বলতে গেলে ভেতরের মাড়ি উঠে আসে। মুখের ভেতরের পুরোটাই ভাঙা, আছে মাথায় আঘাত, কোমরে ব্যথা আছে। রক্ত দেওয়া হয়েছে তিনব্যাগ, আরও রেডি করে রাখতে বলেছেন চিকিৎসক।’

এরই ভেতরে সৈকতকে ট্রলিতে করে নিয়ে আসেন তার ভাই সাকিবসহ অন্যরা। সবাই মিলে ধরাধরি করে তাকে শোয়ানো হয় বেডে। বাবা শহীদুল্লাহ পরম মমতায় ছেলের গায়ে চাদর টেনে দেন। ছেলের মুখের কাছে গিয়ে জানতে চান, ‘কষ্ট হচ্ছে বাবা?’ সৈকত কিছু বলেন না, কেবল মাথা নেড়ে ‘না’ করেন।

সৈকতের বেডের পাশে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়েছিলেন বাবা। গ্রামের বাড়িতে কাঠমিস্ত্রির কাজ করা ৬৫ বছরের শহীদুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সেদিন ভোররাতের দিকে সৈকতের ফোন থেকেই তার কাছে একটি কল আসে। অসময়ে ফোন আসায় কিছুটা অবাক হন তিনি। কিছুটা বিরক্তি নিয়েই ঘুমচোখেই কল রিসিভ করেন। কিন্তু যখন ওপাশ থেকে বলা হয়, ‘আপনার ছেলে সৈকত ট্রেন অ্যাক্সিডেন্টে মারাত্মক আহত হয়েছে’, তখন তার ঘুম উড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আরেক ছেলে সাকিবকে জানান তিনি। সাকিব তখন সৈকতের নম্বরে কল-ব্যাক করলে জানানো হয়, সৈকত ব্রাহ্মণবাড়িয়া হাসপাতালে আছে, তারা যেন দ্রুত হাসপাতালে চলে আসেন।

‘নোয়াখালীর দুর্গাপুরে সৈকতদের বাড়ি। তিনি পুরান ঢাকায় বোরকা তৈরির কাজ করেন। কয়েকদিন আগে তিনি সিলেট যান। দুর্ঘটনার দিন জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসে সিলেট থেকে বাড়ি আসছিলেন, ফেনীতে নামার কথা ছিল। কিন্তু বাড়িতে আর আসা হয়নি, তার বদলে এখন আমরা সবাই হাসপাতালে,’ বললেন জাহিদ। 

কককঢামেকে ভর্তি আরও দুজন

ট্রেন দুর্ঘটনায় আহত সৈকত ছাড়া আরও দুজন ভর্তি আছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। তারা হলেন– মুন্না ও নিজাম। দুজনই আছেন আরেকটি ওয়ার্ডের বারান্দার বেডে। মুন্নার মা জানান, ১১ বছর আগে তিন ছেলে রেখে মুন্নার বাবা মারা গেছেন, শায়েস্তাগঞ্জে বাড়ি। ‘ছেলেদের মুখের দিকে তাকিয়ে আর নিজের জন্য ভাবিনি। ওদের নিয়েই জীবনটা পার করে দিলাম।’ নিচু স্বরে কথাগুলো বলেন মুন্নার মা মাজেদা বেগম সীমা।

তিনি আরও বলেন, ‘ছেলে তিনটা হলেও ছোট ছেলে মুন্নাই যেন আমার সবকিছু। এটা ওর দুই ভাইও জানে। এত বড় হলেও আমি মুন্নাকে ছাড়া আর মুন্না আমাকে ছাড়া কোথাও যায়নি। এই প্রথম আমাকে জানালো বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে যাবে। আমি যেতে দিলাম। কিন্তু এখন ভাবছি, কেন সেদিন নিষেধ করিনি। তাহলে ছেলেটার আজ এই অবস্থা হতো না।’

সেদিনের কথা বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘সেদিন রাত ৩টার দিকে মোবাইল ফোনে কল আসে। আমি তো অপেক্ষা করছিলাম ছেলে পৌঁছে আমাকে ফোন করবে, তারপর আমি ঘুমাবো। ফোনের আওয়াজ শুনে তাড়াহুড়ো করে ধরলাম। কিন্তু ওপাশ থেকে কেউ একজন বললো, ‘আপনার ছেলে অ্যাক্সিডেন্ট করেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া হাসপাতালে আছে। তারপর দুই দেবরসহ অন্যরা সেখানে যায়, পরে এখানে নিয়ে আসে।’ তিনি জানালেন, মুন্নার পাঁচ বন্ধুর একজন রুবেল ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন। মুন্নার ডান পা তিন টুকরো হয়েছে।

এই ওয়ার্ডের বারান্দাতেই আছেন আরেক রোগী নিজাম উদ্দীন। তার বাঁ-হাত ভেঙে গেছে। বোন হালিমা জানান, নরসিংদীতে চাকরি করেন নিজাম। কয়েকদিন আগে ছুটি নিয়ে বাড়ি যান। সেখান থেকে চট্টগ্রামে ছোট বোনের শ্বশুরবাড়িতে তাকে দেখতে যান নিজাম। আর সেদিন চট্টগ্রাম থেকেই বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। দুর্ঘটনার পরদিন সকালে নিজামই কল দিয়ে জানান ট্রেন অ্যাক্সিডেন্টে আহত হওয়ার কথা। পরে তাকে প্রথমে পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে এখানে নিয়ে আসেন তিনি।

নিজাম কথা বলতে পারেন কিনা– জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কথা বলতে পারেন না, মাথায় আঘাত পেয়েছেন। এজন্য উল্টাপাল্টা কথা কয়।’

/জেএ/এমএএ/

লাইভ

টপ