আক্রান্তদের ৫০ শতাংশই জানেন না তাদের ডায়াবেটিস

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ০৩:৪৬, নভেম্বর ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৪, নভেম্বর ১৪, ২০১৯





ডায়াবেটিসহোসনে আরা বেগমের বয়স ৪৩। পেট ব্যথা নিয়ে রাজধানীর একটি স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালে যান। তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কিনা চিকিৎসকরা জানতে চান। তিনি এবং পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসকদের জানান, তার ডায়াবেটিস নেই। তারপরও চিকিৎসকরা পরীক্ষা করাতে বলেন। পরীক্ষার পর জানা যায় তার সুগার লেভেল ৩৩।


চিকিৎসকরা এতটাই অবাক হন যে, ভাবেন তাদের মেশিন নষ্ট। একাধিকবার পরীক্ষা করার পর তারা নিশ্চিত হলেন হোসনে আরা বেগম আসলেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। অথচ এতদিন তিনি বিষয়টি বুঝতেই পারেননি। চিকিৎসকরা বলছেন, হোসনে আরা বেগমের মতো আমাদের দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ রোগীই জানেন না তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, অসতর্কতার কারণে মাত্রা বেশি হওয়ার পর ডায়াবেটিস ধরা পড়ছে। নিয়মিত চেক না করা, সমস্যা দেখা দিলেই চিকিৎসকের কাছে না আসা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জীবনযাপন না করা, কায়িক পরিশ্রম না করা, ডায়েট গ্রহণ না করাই এর জন্য দায়ী। অধিকাংশের ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রাথমিক লেভেল পার হয়ে খারাপ অবস্থায় গিয়ে রোগ ধরা পড়ছে। অথচ আক্রান্ত হওয়ার পর ডায়াবেটিস রোগীর জানা অত্যন্ত জরুরি যে, তিনি এই রোগে আক্রান্ত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে ১৯৮০ সালে বিশ্বে ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১১ কোটি, ২০০০ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৭ কোটিতে; যা বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ। ২০৩০ সালে এ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি।
ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশন বলছে, প্রাপ্তবয়স্ক যেসব মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশের।
ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশনের নিবন্ধন অনুযায়ী দেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ৮৪ লাখ, এর বাইরে অনেকেই আছেন, যাদের রোগ শনাক্ত করা হয়নি। আর বাংলাদেশে প্রতি ১০ জনে একজন এ রোগে আক্রান্ত। বিশ্বে ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৪০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশে রয়েছে প্রায় ৯০ লাখ, বছরে বাড়ছে আরও এক লাখ।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৫৫ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করলে রোগী নিজেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। সব বয়সের মানুষই আজ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতিবছরই দ্বিগুণ হারে বাড়ছে রোগী। সচেতনতার অভাবে অনেকেই এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ডায়াবেটিস এবং হরমোন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ইন্দ্রজিৎ প্রষাদ বলেন, ‘দেশে চার ধরনের ডায়াবেটিস লক্ষ করা যায়—টাইপ ওয়ান, টাইপ টু, অন্যান্য রোগের জন্য ডায়াবেটিস ও গর্ভকালীন ডায়াবেটিস। এর মধ্যে ৯৫ শতাংশ আক্রান্ত টাইপ টু ডায়াবেটিসে। ৫০ শতাংশের ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর কোনও লক্ষণ থাকে না। বুঝতেই পারেন না, তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। অন্য কোনও রোগ নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে জানতে পারেন তিনি আক্রান্ত হয়েছেন।’
ডা. ইন্দ্রজিৎ প্রষাদ বলেন, ‘আমরা ডায়াবেটিস নিয়ে ভুগছি, অথচ আমাদের ৫০ শতাংশ নিজেরাই জানি না যে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছি। আর এই না জানার কারণে নানা সমস্যা দেখা দেয়। বয়স ৪০ বছর পার হলে, বংশে কারও ডায়াবেটিস থাকলে ও গর্ভকালীন সময়ে ডায়াবেটিস থাকলে প্রতি তিন বছর পরপর ডায়াবেটিস পরীক্ষার পরামর্শ দিই আমরা। তবে যারা আরও বেশি ঝুঁকিতে থাকেন, তাদের ক্ষেত্রে এই সময় আরও কমিয়ে দেওয়া হয়।’
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (বাডাস)-এর সভাপতি অধ্যাপক ডা. একে আজাদ বলেন, ‘দেশে প্রতি দুজনের একজন জানেন না যে, তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এর মূল কারণ অসচেতনতা এবং চিকিৎসকের কাছে যাওয়ায় অনিহা। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ বড় কোনও অসুখে না পড়লে চিকিৎসকের কাছে যেতে চান না।’

/জেএ/আইএ/

লাইভ

টপ