গুজব ছড়িয়ে কতো টাকা হাতিয়ে নিলো ব্যবসায়ীরা

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ০৪:২০, নভেম্বর ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৪:৪৬, নভেম্বর ২০, ২০১৯

লবণ (ছবি, সংগৃহীত)দেশে লবণের সংকট রয়েছে, এমন গুজব ছড়িয়ে একদিনেই বিশাল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন মাধ্যমে এই গুজব ছড়িয়ে দেওয়ার পর সাধারণ মানুষ লবণের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। চাহিদার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি লবণ কিনতে থাকে তারা। সকাল থেকে নগরীর পাড়া-মহল্লায় এমন চিত্র দেখা যায়। এর আগেও একবার এমন গুজব ছড়ানো হয়। দোকানিরা বলছেন, ব্যবসায়ীরা এমন গুজব ছড়িয়ে মজুত থাকা লবণ বিক্রি করার জন্যই এই পাঁয়তারা করেছেন। এর মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি দোকানিদের।

রাজধানীর শুক্রাবাদের চাঁদ জেনারেল স্টোরের ম্যানেজার আসাদুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘লবণের সংকট রয়েছে বলে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর দোকানে যত লবণ ছিল সব বিক্রি শেষ। পরিচিতি জনরা ফোন করে বলে সবার জন্য তিন-চার কেজি করে লবণ রাখতে। দোকানে ৮০ কেজি ছিল। বেলা ১১টার মধ্যে সব বিক্রি হয়ে গেছে। পরে আরও এক বস্তা এনেছি সেগুলোও শেষ হওয়ার পথে। আমি নির্ধারিত দামেই লবণ বিক্রি করছি। তবে অনেকেই এই সুযোগে বেশি দামে বিক্রি করেছেন।’ আগেও একবার এমন গুজব ছড়ানো হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

এই দোকানির দাবি, যারা লবণ নিয়ে ব্যবসা করেন তারাই এমন কথা বাজারে ছড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে পেঁয়াজের মতো লবণেও কষ্ট হবে সেই চিন্তায় ক্রেতারা চাহিদার বেশি কিনতে থাকেন। এ কারণে দোকানে লবণ নেই। আমার মনে হয় আজ কয়েক কোটি টাকার লবণ বিক্রি হয়েছে। সরকারের উচিত হবে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া।   

পাশের ফারিয়া স্টোরের বিক্রেতা আরমান উদ্দিন বলেন, সব গুজব। মানুষ এসে শুধু লবণ চায়। যারা বেশি দামে লবণ বিক্রি করছে তাদের জরিমানা করা উচিত। আর যারা এই গুজব ছড়িয়েছে তাদের চিহ্নিত করে জেল দেওয়া উচিত।

ওই দোকানে লবণ কিনতে আসা কেফায়েত উল্যাহ বলেন, ‘মানুষের কাছ থেকে শুনতেছি লবণের নাকি সংকট দেখা দিয়েছে। তাই কিনতে এসেছি। পেঁয়াজের মতো যদি লবণেও একই অবস্থা হয় তাহলে তো কষ্ট হবে। তাই একসঙ্গে ৪ কেজি কিনে নিয়েছি। এখন শুনতেছি এটা নাকি গুজব।’

শুক্রাবাদ এলাকার আজাদ রাইস স্টোরের বিক্রেতা ইব্রাহিম বলেন, ‘কয়েক ঘণ্টায় আমার দোকানে সব লবণ শেষ হয়ে গেছে। একের পর এক মানুষ এসে শুধু লবণ চাইছে। অন্যান্য দিনে ১০-১৫ কেজি লবণ বিক্রি হলেও মঙ্গলবার দুপুরের মধ্যে ১০০ কেজি লবণ বিক্রি হয়ে গেছে।’ এখন আর তার দোকানে লবণ নেই বলে জানান ইব্রাহিম।

তিনি বলেন, দোকানদারদের কেউ কেউ রেশনিং শুরু করেছেন। এক কেজির বেশি লবণ বিক্রি করছেন না অনেক দোকানদার, যদি পরবর্তীতে দাম বাড়ে এই আশায়।

একই কথা জানান মা এন্টারপ্রাইজের বিক্রেতা নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এসিআই লবণ এক কেজি ৩৫ টাকা করে আমরা বিক্রি করতাম। দিনে বিক্রি হতো ৮-১০ কেজি। আজ ১৫০ কেজির বেশি লবণ বিক্রি হয়ে গেছে। একেকজন এসে ৪-৫ কেজি করে লবণ কিনতে চাচ্ছে। তবে আমি একেকজনের কাছে এক কেজির বেশি বিক্রি করছি না।’

ফার্মগেটের আসমা স্টোরের ম্যানেজার মো. হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, লবণ শেষ। এক মাসে যা বিক্রি করতে পারিনি আজ তিন ঘণ্টায় তার চেয়েও বেশি বিক্রি হয়েছে। মানুষ গুজবে বিশ্বাসী। আসলে লবণের সংকট নেই। ব্যবসায়ীরা এসব কথা ছড়িয়ে দিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছেন।

এদিকে লবণের সংকট রয়েছে এমন গুজবে অনেক দোকানি বেশি দামে লবণ বিক্রি করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কোথাও ৩৫ টাকা কেজির লবণ ১০০ টাকাও বিক্রি হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। মুদি দোকানদারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকে লবণের প্যাকেটের গায়ে লেখা দামে পণ্য বিক্রি করলেও বেশিরভাগই গুজবের সুযোগ নিয়েছেন। হুজুগে ক্রেতাদের কাছে হুজুগে দাম হাঁকিয়ে কয়েক ঘণ্টার ব্যবসা বানিয়ে নিয়েছেন তারা। এর সঙ্গে লবণ উৎপাদক কোম্পানি, ডিলার, পাইকারি ব্যবসায়ী, খুচরা দোকানদার সবাই জড়িত। আর ঠকেছেন কেবল হুজুগে মেতে ওঠা ক্রেতারাই।  মঙ্গলবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই হুজুগেই এসব ব্যবসায়ীর পকেটে উঠে গেছে কয়েক কোটি টাকা। তবে এর সঠিক পরিসংখ্যান নেই কারও কাছেই।

জানতে চাইলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পেঁয়াজের সরবরাহ কম থাকার কারণে দাম বেড়েছে। কিন্তু লবণের সরবাহ কম বলে গুজব ছড়িয়ে দাম বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও একটা অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে ব্যবসায়ীরা ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। মূলত সরকার ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণে বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সরকার যদি অতি দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নেয় তাহলে এই পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না।  

এদিকে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক  সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, একটি মহল পরিকল্পিতভাবে দেশে গুজব ছড়ানোতে লিপ্ত রয়েছে। সম্প্রতি দেশে লবণের প্রাপ্যতা নিয়েও গুজব ছড়ানোর একটি অপচেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে গণমাধ্যমে জানানো হয়েছে, দেশে লবণের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং ডিসেম্বর মাসেই দেশে নতুন লবণ উৎপাদিত হয়ে বাজারে আসবে। বর্তমান মজুতের সঙ্গে যোগ হবে নতুন উৎপাদিত লবণ। ফলে দেশে লবণের কোনও সংকট নেই বা এমন কোনও আশঙ্কাও নেই। লবণ নিয়ে কিংবা অন্য কোনও বিষয়ে কোনও ব্যক্তি বা মহল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা অন্য যে কোনোভাবে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 

 

 

 

/এসএস/ওআর/টিএন/

লাইভ

টপ